বাবা বসে পড়ল চেয়ারে। বাবাকে কেমন যেন হতভম্ব লাগছে।
“কী হয়েছে তোমার?” পুশকিন অবাক হল এবার, “আমি ছোটবেলায় সোনাঝুরিতে থাকতাম। কিন্তু অত ছোট ছিলাম তো! সেভাবে মনে নেই সব ঠিকমতো। আচ্ছা বাবা, তুমি তো ছোটবেলায় সোনাঝুরিতে থাকতে। জোনাক-বাড়ির কি কোনও গল্প আছে?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “তুই পেখমদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিস, আমায় বলিসনি তো!”
পুশকিন অবাক হল। অফিসের কথা ও কাউকেই বলে না। বাবাকেই বা বলবে কেন?
“পেখম কে?” নোঈ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল!
বাবা কেমন বিষণ্ণ গলায় বলল, “দীপমালা হল পেখমদির ভাল নাম। আর জোনাক-বাড়ি! হ্যাঁ, তাতে তো প্রশ্ন আছেই! কিন্তু আমি সেটা বলতে পারব না। বাবু, তুই সোনাঝুরিতে যা।”
“গিয়ে?” পুশকিন অবাক হল।
বাবা স্থির চোখে তাকাল পুশকিনের দিকে। তারপর বলল, “গিয়ে বিজনের সঙ্গে দেখা কর। বিজন সরখেল। জোনাক-বাড়ি সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে ওই লোকটাই পারবে বলতে। পেখমদির গল্পটা বিজনই সবচেয়ে ভাল জানে!”
২৫. কাজু
ঘুমের শেষে কী লেগে থাকে? অন্ধকার? আর অন্ধকারের শেষে? অন্ধকারের শেষেই কি হাহাকার লেগে থাকে? আকাশ-পাতাল গ্রাস করে নেওয়া হাহাকার!
আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই কথাটাই মনে এল কাজুর। নিজেকে কেমন যেন ভিখিরি মনে হল। মনে হল এভাবে কাউকে কাছে টেনে তারপর দূরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়! ও বেশি রোজগার করে না বলেই কি আজ এই ভাবে ওকে দূরে সরিয়ে দিতে পারল পেখম! যতই ওদের সমাজ আলাদা হোক না কেন, আজ যদি সুদর্শন মালিকের মতো বাবা থাকত ওর, যদি সম্পত্তি থাকত, তা হলে কি ওর সঙ্গে এমন করতে পারত পেখম বা ওর বাড়ির লোকেরা?
চোখটা জ্বালা করছে কাজুর। ও সহজে কাঁদে না, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে জাহাজ উলটে গেছে! আর চারদিক থেকে জলের তোড় এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে!
জোনাক-বাড়ির বড় গেটের পাশের ভেঙে যাওয়া ছোট কংক্রিটের পিলারটায় একটু ভর দিয়ে দাঁড়াল কাজু। মন ঠিক না থাকলে কিছুই ঠিক থাকে না! এই রাতের অন্ধকারে সবটাই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ওর!
আজ সন্ধে থেকে হাওয়া দিচ্ছে খুব। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কে জানে বৃষ্টি হবে কি না!
চ্যাটার্জিপাড়ায় আজ টিউশন ছিল কাজুর। ক্লাস টেনের দুটো ছেলে পড়ে ওর কাছে। পড়াতে বসেই শুনছিল বাজ পড়ছে। জানলা দিয়ে দেখেছিল বিদ্যুতে-বিদ্যুতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে আকাশ! বৃষ্টি হবে কি? ও ভেবেছিল ছাতা সঙ্গে নেই, ফেরার পথে ভিজে যাবে একেবারে। কিন্তু বৃষ্টি আসেনি এখনও।
কাজু আবার আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ করে আছে মাথার ওপরে। তারাদের দেখা যাচ্ছে না! এত হাওয়া যে, চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভাল লাগছে, কিন্তু শুধু শরীরে আটকে যাচ্ছে ভাললাগাটুকু। মনের কাছে পৌঁছতে পারছে না সেটা। এখনও চোখের সামনে ভাসছে ছোট গলি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দামি গাড়িটা। আজ তবে পেখমদের বাড়িতে এসেছিল মালিকরা। কথা কি ঠিক হয়ে গেল? কবে ঠিক হল দিন? ওর মৃত্যুদিন?
“কী রে, শরীর খারাপ?” যাদবকাকা এসে পেছন থেকে হাত দিল কাজুর পিঠে।
কাজু পেছনে ফিরল। আধো অন্ধকারে যাদবকাকাকে কেমন ভুতুড়ে লাগছে! জোনাক-বাড়ির গেটের সামনে একটা লাইটপোস্ট আছে। সেখানে খুব দুর্বল আলো জ্বলে একটা। আলোর মাথায় কালচে একটা শেড। হাওয়ায় আলোটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে!
“কী রে কাজু!” যাদবকাকা এবার সামনে এসে দাঁড়াল।
কাজু ঝাঁজালো গন্ধ পেল ঘামের। সারা দিন মিল-এ কাজ করে যাদবকাকা। বিমলদা বলে, এই যে-গন্ধ আমাদের খারাপ লাগে, আসলে তা পরিশ্রমের গন্ধ। গরিবদের মধ্যে কাজ করতে হলে অনেক কিছু মেনে নিতে হবে। বুঝতে হবে যে, জীবনের আসল গন্ধ আর স্পর্শগুলো এমনই হয়। আমরা মেকি জিনিসপত্র দিয়ে ঢেকে রাখি সব। আসলে জীবনের গন্ধ এমনই। ঝাঁজালো, কটু। ঠিক এই গরিব অসহায় মানুষগুলোর রোজকার বেঁচে থাকার মতো!
কাজু নিজেকে ঠিক করল। ওর ইচ্ছে করছে না কারও সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু ও শিখেছে যে, নিজের ইচ্ছের চেয়ে বৃহত্তর মানুষের স্বার্থ বড়। নিজের ইচ্ছেকে অমানুষ ছাড়া আর কেউ বড় করে দেখে না!
“বলো যাদবকাকা,” কাজু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সামনে তাকাল।
“আমাদের ব্যাপারটা দেখলি কিছু? আর তো সময় নেই! মালের লাস্ট ব্যাচ তৈরি হচ্ছে। আর দিনদশেকের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে। তুই জ়রা দেখ বাবু। তুঝে পতা হ্যায় না হামলোগোকা ক্যায়া হোগা! শুনলাম তুই গিয়েছিলিস মালিকের সঙ্গে কথা করতে। কিছু পজ়িটিভ হল?”
কাজু ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকাল। মনে পড়ে গেল ক্লাবের সেই সন্ধেটার কথা।
সুদর্শন মালিক লোকটা কেমন ঠান্ডা চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মুখে লেগেছিল পাতলা চিক কাগজের মতো একটা হাসি।
“বলো কাজুবাবু, তোমার কী আর্জি?”
আর্জি! কথাটা কানে কট করে লেগেছিল কাজুর। আর্জি মানে? ও কি রাজার দরবারে এসেছে নাকি? ওর মনে হয়েছিল, পা থেকে চটি খুলে লাগিয়ে দেয় লোকটার মুখে! কোনও-কোনও মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস পেয়ে গেলে এমন জানোয়ার হয়ে যায়! তার ছোট-ছোট কথার মধ্যে দিয়ে উপচে ওঠে পশুত্ব! সবাইকে নিজের অধীনে ভাবা বা সবাই তার কাছে কিছু প্রার্থনা করতে আসে, এরকম ভাবা তো একরকম পশুত্বই বটে!
