“কী হল? আমি কি চলে যাব?” নোঈ আচমকা উঠে দাঁড়াল।
“আরে!” পুশকিন অবাক হয়ে গেল।
“ঠিক আছে। আমারই ভুল হয়েছিল। আমি আসছি…” নোঈ দরজার দিকে এগোতে গেল।
পুশকিন কিছু না ভেবেই নোঈ যাতে না যায় সেই জন্য হাতটা ধরে টানল ওকে। নোঈ আর না চলে গিয়ে ওর দিকে ঘুরে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুশকিন দেখল নোঈর চশমার কাচে এক ফোঁটা, দু’ফোঁটা করে জল জমছে! কাঁদছে! পুশকিন মাথা ঝুঁকিয়ে ওর মুখটা দেখল।
চশমার আড়ালে নোঈর চোখ দুটো ছলছল করছে। পুশকিনের কী যে হল হঠাৎ ও নিজেও বুঝতে পারল না। কীসের যে টান ওকে কুহকের মতো ডাকল, ধরতেই পারল না। অনেকটা যেন নিজের অজান্তেই ও বাঁ হাত দিয়ে নোঈর কোমরটা জড়িয়ে ধরল আচমকা। ডান হাত দিয়ে খুলে নিল ওর চশমা! তারপর নোঈকে নিজের আরও কাছে টেনে ওর ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল নিজের ঠোঁট!
ছোট্ট ট্রেন চলেছে পাহাড়ের কারনিশ ঘেঁষে! পাইন বনের পাশ দিয়ে, লাল-নীল ফুল সাজানো বাড়ির উঠোন ছুঁয়ে ট্রেন এগিয়ে চলেছে ওপরের দিকে। মেঘ এসে জড়িয়ে যাচ্ছে তার চিমনিতে। জানলা দিয়ে ঢুকে এসে মেঘ থেমে থাকছে কাচের গায়ে। লাইনের পাশের জংলি গোলাপ নাড়িয়ে, সাদা ঘাস ফুল ঘেঁটে, হলুদ টোপর ফুলের শিশির ছিটকে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। ওই দূরে বরফের পাহাড়ে সূর্য এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর পরমুহূর্তে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে! মেঘের রহস্য এসে ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে পথের নির্জন বাঁক! লাল-কমলা-সবুজ-নীল মাফলার জড়িয়ে হেঁটে যাওয়া বাচ্চাদের ছাড়িয়ে, শীর্ণ লাজুক পাহাড়ি ঝোরাকে টপকে, লেপচা গ্রামের এলাচের গন্ধ বুকের মধ্যে নিয়ে ওই চলে যাচ্ছে ট্রেন। ছোট্ট টয় ট্রেন। এই জীবনের সমস্ত কষ্ট, যন্ত্রণা আর মনখারাপ থেকে দূরে, অনেক দূরে সে নিয়ে যাচ্ছে পুশকিনকে।
নোঈকে ছেড়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল পুশকিন। ওর শরীর কাঁপছে থরথর করে! এটা কী করে ফেলল ও! ও কি পাগল হয়ে গিয়েছে নাকি? এমন কেউ করে? নোঈ ওর সাব-অর্ডিনেট। এটা তো সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট! এটা কী করল ও! নোঈ কী ভাবছে ওকে? কতটা ছোটলোক ভাবল? ছিঃ ছিঃ! নিজের গায়ে থুতু দিচ্ছে ইচ্ছে করল পুশকিনের। লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না ও।
পুশকিন চোখ বন্ধ করেই ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। মাথা নিচু করে রাখল।
নোঈ সময় নিল একটু। তারপর পুশকিনের পাশে বসে নিজের চশমাটা নিয়ে চোখে দিয়ে বলল, “কী হল? এমন করছেন কেন পুশকিনদা?”
“আমি… আমি খুব সরি…” পুশকিন কীভাবে বলবে বুঝতে পারল না! লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে ও। মাঝে মাঝে মানুষকে ভূতে পায়! ও দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।
নোঈ আলতো করে পিঠে হাত দিল পুশকিনের। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “আমি খারাপ কিছু মনে করিনি, পুশকিনদা। এই আপনাকে ছুঁয়ে বলছি।”
পুশকিন মাথা তুলতে পারল না। কিন্তু বুঝল নোঈর একটা হাত ওর পিঠে আর অন্য হাতটা আলতো করে ধরে রেখেছে ওর আঙুল।
পুশকিনের আবার ইচ্ছে করল নোঈকে চুমু খেতে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে ধমক দিল ও। এসব কী ভাবছে ও! কেন ভাবছে! ছিঃ, ছিঃ! অমানুষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ!
নোঈ আবার বলল, “আমার দিকে তাকান। তাকান!”
পুশকিন চোয়াল শক্ত করে মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। দেখল, নোঈ সোজা তাকিয়ে রয়েছে ওর চোখের দিকে।
পুশকিন বলল, “আমি জানি না, আমার কী হয়েছে। আমি সরি নোঈ! তুমি আমার বিরুদ্ধে কোনও স্টেপ নিতে চাইলে নিতে পারো!”
“পাগল আপনি?” নোঈ হাসল এবার, “স্মরণের চেয়েও আপনি বেশি পাগল। বললাম তো আমি কিছু মনে করিনি। শুধু একটা প্রশ্ন।”
“কী?” পুশকিন টালুমালু চোখে তাকিয়ে রইল নোঈর দিকে।
নোঈ ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইল একটু, তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী আফটার শেভ ইউজ় করেন আপনি?”
“বাবু…”
পুশকিন কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে বাবার গলা পেল। ও নোঈর পাশ থেকে ছিটকে উঠে গিয়ে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, ওর এমন করে সরে যাওয়া দেখে নোঈ মুখে হাত দিয়ে হাসছে। পুশকিন ইঙ্গিতে ওকে চুপ করতে বলল। নোঈ চোখ বড় করল একটু, তারপর ইশারায় দেখাল পুশকিনের ঠোঁটে কিছু লেগে আছে।
বাবা পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। পুশকিন দ্রুত পাশে রাখা ড্রেসিং ইউনিটের আয়নার দিকে ঘুরল। দেখল নিজেকে। নোঈ ঠিক বলেছে। ওপরের ঠোঁটে একটু লিপস্টিকের দাগ লেগে রয়েছে! ও দ্রুত পাঞ্জাবির হাতায় সেটা মুছে নিল।
বাবা বলল, “কী করছিস এখানে? আমি সবাইকে বললাম নোঈ কী দারুণ গান গাইল! সবাই শুনতে চাইছে ওর গান। আর তুই ওকে এখানে নিয়ে বসে অফিসের কথা বলছিস নাকি?”
পুশকিন কিছু বলার আগেই নোঈ বলল, “হ্যাঁ তো। সোনাঝুরির ওই প্রোজেক্টটা নিয়ে পুশকিনদা খুব বিব্রত। সেই নিয়েই বলছিলেন। জুটমিলের সঙ্গে জোনাক-বাড়ি কেনার জন্য তো দীপমালা মালিকের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন কিছুদিন আগে। কিন্তু…”
“দীপমালা!”
পুশকিন দেখল বাবা কেমন যেন হয়ে গেল হঠাৎ।
“হ্যাঁ,” পুশকিন নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করল, “উনি বললেন, ওই বাড়ির সঙ্গে কী একটা প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। সেটার উত্তর দিতে পারলে বাড়িটা দেবেন। না হলে নয়। ভাবুন, বিজ়নেস ডিল এটা। তার মধ্যে কেউ এমন করে? এটা কি খেলা নাকি?”
