ও বসার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘন নীল পরদা উড়ছে। তার আড়ালে দাঁড়িয়ে পুশকিন শুনল গান ভেসে আসছে ঘরের ভেতর থেকে। পরদাটা সামান্য সরিয়ে ও দেখল, কয়েকজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে বসে চোখ বন্ধ করে, ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’ গাইছে নোঈ! থমকে গেল পুশকিন। আজ শাড়ি পড়েছে নোঈ! খুব সুন্দর সাতরঙের শাড়ি একটা। কপালে অনুস্বরের মতো নীল টিপ। চোখ বন্ধ ওর। আর গানের তালে মাথা নাড়ানোর সঙ্গে অল্প-অল্প করে কানের সামান্য ঝোলা দুলটা নড়ছে। পুশকিনের গলা শুকিয়ে গেল! আবার বুকের ভেতরে একটা ছোট্ট টয় ট্রেন যেন পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছে! কোথায় যাচ্ছে এই টয় ট্রেন? মেঘ পার হয়ে কোথায় গিয়ে থামবে এটা? ছোট্ট কাঠের স্টেশনে?
বাবা আর বাবার দুই বন্ধু ও তাঁদের স্ত্রী বসে রয়েছেন নোঈকে ঘিরে। গানের সঙ্গে তাঁরাও মাথা নাড়ছেন।
পুশকিনের মনে হল, ও ফিরে যায় নিজের ঘরে। এই দৃশ্যে কেন কে জানে হঠাৎ ওর নিজেকে বড্ড বেমানান লাগছে।
কিন্তু নড়তে পারল না পুশকিন। ওই পরদার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল গোটা গানটার সুর ধরে-ধরে। মনে হল, গানটা যেন না থামে। টয়-ট্রেনের স্টেশন যেন না আসে কোনওদিন!
“আরে, তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?” গান থামার পরে বাবা গলা তুলে বলল কথাটা!
পুশকিন লজ্জা পেয়ে গেল। বাবা এমন করে বলে সবার সামনে! ও অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। ও ঘরে ঢোকামাত্র নোঈ উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। কিন্তু পুশকিন দেখল বাবা নোঈকে হাত ধরে চেপে বসিয়ে দিল, উঠতে দিল না!
বাবা বলল, “ও কী, উঠছ কেন? কোন গুরুঠাকুর ও? নাকি তোমাদের স্কুলের প্রিন্সিপাল? বসে থাকো!”
সবাই সোফায় বসেছিল। ও এসে সবার থেকে একটু দূরত্ব রেখে একটা চেয়ারে বসল।
বাবা বলল, “শুনলি কেমন গাইল? তোর মা গাইত এই গানটা। মনে পড়ে তোর?”
পুশকিন হাসল। হ্যাঁ, মনে পড়ে ওর। সবটাই মনে পড়ে। কিন্তু মনে করতে চায় না আর। ওর অতীতটা কেমন যেন রং লেপটে যাওয়া ছবির মতো! সবই আছে, কিন্তু যেন কিছুই নেই!
“আমি তোকে বলেছিলাম না, নোঈকে ফোন করে ডাকতে, কিন্তু ডাকতে হয়নি। শি ইজ় মাই গুড গার্ল! দেখ, নিজেই চলে এসেছে! আর কী এনেছে দেখ!” বাবা টেবলের ওপর রাখা একটা প্যাকেটের দিকে আঙুল দেখাল।
পুশকিন এতক্ষণ লক্ষ করেনি। এবার দেখল। একটা বড় প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতর থেকে একটা ক্যাসেরোল উঁকি দিচ্ছে।
বাবা সেটা বের করল এবার। বেশ বড় একটা ক্যাসেরোল। প্যাঁচ ঘুরিয়ে খুলে ফেলল ঢাকনাটা। আর সঙ্গে-সঙ্গে মাছের গন্ধ পেল পুশকিন। দেখল ক্যাসেরোল ভর্তি ফিশ-ফ্রাই!
নিজে থেকেই ভুরু কুঁচকে গেল ওর।
বাবা সেটা দেখে বলল, “তুই ভুরু কোঁচকাচ্ছিস কেন? আমার জন্য এনেছে! নিজে ভেজেছে। বুঝলি!”
আশপাশের সবাই মাথা নেড়ে প্রশংসা করা শুরু করল। দু’জন তো হাত বাড়িয়ে তুলে নিল দুটো!
পুশকিন দেখল নোঈ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। বাবা আরও কিছু বলত, কিন্তু পরদা সরিয়ে এবার একসঙ্গে প্রায় দশজন ঢুকে এল ঘরে! পুশকিন প্রমাদ গুনল। কোন্নগর থেকে মায়ের মামারা এসে পড়েছে। এবার চিৎকার আর হইচই হবে! কানুদা নিশ্চয় দরজা আজ খুলেই রেখেছে, তাই কলিং বেল শোনা যায়নি!
বাবা সবার সঙ্গে নোঈর পরিচয় করিয়ে দিল। সামান্য দু’-চারটে কথার পরে পুশকিন উঠে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোল। এখানে আর বসে থাকা সম্ভব নয় ওর পক্ষে!
“শুনছেন!” বাইরের বড় করিডরটায় এসে পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেল পুশকিন। ঘুরে দেখল নোঈ এসে দাঁড়িয়েছে।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন আমায় ফেলে?” নোঈ মুখ ভার করে জিজ্ঞেস করল।
“তোমায় ফেলে?” পুশকিন অবাক হল।
“নয়তো কী! আমি কি আপনাদের বাড়ির লোকেদের চিনি? আপনি আমায় ফেলে হুট করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কেন? আপনি ওখানে বসতে পারলেন না? আপনার ওই বড়মামা কী মজার গল্প বলছেন। আপনি বসলেন না কেন! আর আমায় এভাবে ফেলে চলে এলেন কেন?
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না। কথা খুঁজে পাচ্ছে না যেন। নোঈকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন? ও যে ভাল করে তাকাতেও পারছে না। তাকালেই মনে হচ্ছে নোঈ সবকিছু বুঝে যাবে।
ও মাথা নামিয়ে বলল, “আমি আসলে এখন নিজের ঘরে যাচ্ছি। একটু টায়ার্ড।”
“আমি আসব আপনার সঙ্গে? আমি তো কাউকে চিনি না!” নোঈ অসহায় মুখ করে তাকাল।
পুশকিন হাসল শুধু।
পুশকিনের ঘরের দরজার কাছে থমকে দাঁড়াল নোঈ। তারপর একটু সময় নিয়ে চারিদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখল সবকিছু। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখানেই ছোটবেলা কাটিয়েছেন?”
পুশকিন হাসল আবার।
“আপনি কি রাগ করেছেন, আমি এসেছি বলে?” নোঈ এসে বিছানায় পুশকিনের পাশে বসে পড়ল। পুশকিন একটু কেঁপে গেল। বসার দুটো চেয়ার কি নোঈ মিস করল!
পুশকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল নোঈর দিকে। কী বলবে একে? কী বলতে পারে ও। এক হাতের মধ্যে মেয়েটা বসে রয়েছে। ঘরের আলো যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ! কী অদ্ভুত একটা সুগন্ধ প্রজাপতির মতো ছোট-ছোট ডানা মেলে উড়ছে চারিদিকে! কষ্ট হচ্ছে পুশকিনের। মনে হচ্ছে, দৌড়ে পালিয়ে যায়। মনে হচ্ছে কুটুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে চলে গেলেই ভাল হত।
