কুটু বলল, “দাদু বলল, আন্টি এসে গেছে, তোমায় যেন বলি!”
“আন্টি! মানে?”
কুটু হাসল। সব বুঝে গেছে এমন করে চোখ ঘুরিয়ে বলল, “ওই যে বিউটিফুল বিউটিফুল আন্টি! আমায় চকোলেট দিল একটা ইয়াব্বড় প্যাকেটে।”
পুশকিন বলল, “বেশি খেয়ো না! দাঁতে পোকা হবে!”
কুটু বলল, “ভালবেসে কেউ দিলে নিতে হয়। আর পোকা! সে না হয় একটু হোক!”
পুশকিন ড্রেসিং ইউনিটের সামনে রাখা ঘড়িটা তুলে হাতে পরল। তারপর মোবাইলটা পকেটে নিয়ে কুটুর হাত ধরে ঘরের বাইরে বেরোল। আন্টি মানে নিশ্চয়ই নোঈ!
ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখল ভাইরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুটু পুশকিনের হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে ওর মায়ের হাত ধরল।
ভাই বলল, “এলাম দাদা। চলে আসব তাড়াতাড়ি। বাবাকে বলিস যেন এই নিয়ে রাগ না করে!”
পুশকিন হাসল। রাগ! নাঃ, বাবার রাগ কমে গেছে!
ভাইরা বেরিয়ে গেলে ও ভাবল বসার ঘরে যাবে। নোঈ যদি সত্যি এসে থাকে তবে ওর যাওয়া দরকার! কিন্তু ঠিক তখনই পকেটের ফোনটা বাজল। ও বের করে দেখল। স্মরণ। এ সময় ছেলেটা ফোন করল!
“বলো!” পুশকিন ফোনটা কানে লাগাল।
“স্যার, সরি স্যার, এমন সময় ফোন করার জন্য, কিন্তু ওই মাহির বলে ছেলেটা আবার ফোন করেছিল!”
পুশকিন বলল, “তুমি বলো পুজো কেটে যাক, আমি ব্যাপারটা দেখছি!”
“আমি বলেছি স্যার। ও বলছে একাদশীর দিন ফিক্স করবে মিটিং? রিতুবাবু নাকি একটু ইমপেশেন্ট হয়ে পড়েছেন!”
“লক্ষ্মীপুজোর পরে করতে বলো। তার আগে হবে না। অফিসের একটা অন্য কাজ নিয়ে আমি একটু ব্যস্ত আছি!”
“ওকে স্যার। সরি, এমন সময় ফোন করলাম! আমি রাখছি।”
পুশকিন হেসে বলল, “তুমি ঘুরতে বেরোওনি?”
“বেরিয়েছি স্যার! প্যাঁওয়ের সঙ্গে বেরিয়েছি। আমি রাখছি তা হলে। হ্যাপি পূজা স্যার।”
ফোনটা কেটে সিলিং-এর দিকে তাকাল পুশকিন। সোনাঝুরির ব্যাপারটায় এটা একটা নতুন দিক। কী চায় রিতু বলে লোকটি? পলিটিকাল পার্টির লোক। কী ধান্দা আছে বুঝতে পারছে না। কিন্তু লোকটার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কারণ, চারিদিক দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা থেকে মনে হচ্ছে কাজটা বোধহয় ফসকে যাবে এবার! সেদিন দীপমালাদেবীর সঙ্গে দেখা করেও তো কোনও পথ খুলতে পারেনি!
কলকাতায় ক্যামাক স্ট্রিটে মালিক গ্রুপের বড় অফিস। সেখানে মাসে একদিন দীপমালাদেবী আসেন। এই খবরটা মালিক গ্রুপের ভেতর থেকেই বের করেছিল পুশকিন। সেই মতো একজনকে ম্যানেজ করে দীপমালাদেবীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল পুশকিন। লোকটি বলেছিল, ম্যাডাম এক ঘণ্টার মতো থাকেন। ও যেন দেরি না করে!
ঠিক বিকেল চারটের সময় পৌঁছে গিয়েছিল পুশকিন।
দীপমালাদেবীর ঘরটা বেশ বড়। কাঠের প্যানেল দেওয়া। পুশকিন ঢুকতেই উনি থমকে গিয়েছিলেন সামান্য। তারপর সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বলেছিলেন। পুশকিন অবাক হয়ে দেখেছিল, এই বয়সেও কী সুন্দরী আছেন উনি!
“বলুন,” দীপমালাদেবী সোজা পুশকিনের দিকে তাকিয়েছিলেন। কোনও ভণিতা করেননি।
পুশকিন বসে আর সময় নষ্ট করেনি। বলেছিল, “আমি ম্যাম কী কারণে এসেছি সেটা সরাসরি বলি?”
দীপমালাদেবী বলেছিলেন, “জুটমিল আর জমি আমি বিক্রি করতে রাজি। কিন্তু ওই জোনাক-বাড়ি আমি বিক্রি করব না।”
“ম্যাম, আপনি আমাদের প্রোপোজ়ালটা যদি কাইন্ডলি পড়ে দেখতেন! অন্যরা সব কিছু ডেমলিশ করে সেখানে হাউজ়িং করবে। আমরা ম্যাম জুটমিলটাকে রিভাইভ করব। জোনাক-বাড়িটাকে রেস্টোর করে সেখানে ফাইভ স্টার হোটেল বানাব। একটা ট্যুরিজ়ম পার্ক হবে! সামনে গঙ্গাটাকেও ইউজ় করব। জোনাক-বাড়িটা পিভটাল ফর আওয়ার প্ল্যান!”
“মিস্টার চক্রবর্তী, আমি সব শুনলাম, কিন্তু আমি পারব না ওটা দিতে। এটা টাকাপয়সার ব্যাপার নয়, আমার পারসোনাল ব্যাপার! প্লিজ়, আমায় আর রিকোয়েস্ট করবেন না! থ্যাঙ্ক ইউ।”
“কোনও উপায় নেই ম্যাম? মানে, কোনও উপায়?” পুশকিন মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করেছিল।
দীপমালাদেবী হেসেছিলেন শুধু।
ছোট্ট একটা হাসি। কিন্তু দীপমালাদেবীর হাসির মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যাতে করে পুশকিনের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই ভদ্রমহিলাকে কনভিন্স করা কারও কম্ম নয়! ও হাল ছেড়ে দিয়ে, “সরি ম্যাম!” বলে সামান্য হেসে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
“মিস্টার চক্রবর্তী, আমি জানি আপনাদের প্ল্যানটা ভাল। কিন্তু জানবেন সব কিছু তো আর বিজ়নেস নয়। আপনি জানতে চাইলেন না, কোনও উপায় আছে কি না? আছে, একটা উপায়! আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। সেটা আমায় এনে দিন। ওই বাড়িও আমি দিয়ে দেব।”
“কী প্রশ্ন ম্যাম?” পুশকিন সামান্য আলো দেখতে পেয়েছিল যেন!
দীপমালাদেবী বিষণ্ণভাবে হেসে বলেছিলেন, “সেটা আপনাকেই জানতে হবে। প্রশ্ন আর উত্তর দুটোই আপনাকে জানতে হবে। কেমন? খুঁজে পেলে, আসবেন।”
এ কেমন ধাঁধা? প্রশ্ন জানলে তবে তো উত্তর খোঁজা যায়! কিন্তু এখানে তো প্রশ্নটাও জানতে হবে!
সেদিন থেকে এই একটা ব্যাপারই পুশকিনকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে সারাক্ষণ। প্রশ্নটা কী!
পুশকিন ভাবল, এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই। ও নিজের মনে মাথা নেড়ে বসার ঘরের দিকে গেল। বাইরের প্যাসেজে কয়েকজোড়া জুতো দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে তিনটে মেয়েদের।
