স্মিতার মুখটা মনে পড়তেই কেমন একটা লাগল। আবার মনে পড়ে গেল সেই রাতটা। প্রেম করেই তো বিয়ে করেছিল ওরা। কিন্তু কোথায় ফাঁক থাকল! কী করে ফাঁকটা তৈরি হল? স্মিতা কী করে করতে পারল অমনটা! আর সেটা করেছিল বলেই কি সেই রাতে পুশকিন…
মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে ঠিক করল পুশকিন। অতীত এক অতলান্ত খাদের মতো ওকে সারাক্ষণ টানে। একবার সেই দিকে ঝুঁকে পড়লে ও গড়িয়ে, তলিয়ে যাবে সেই খাদে!
ও চোখ বন্ধ করল একবার। ঘুমের আঠা ফিরে আসছে আবার! চোখের পাতা আটকে যেতে চাইছে। ও দেখল এক দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। একলা এক পথিক বাঁশি বাজাতে বাজাতে আপনমনে হেঁটে চলেছে! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পুশকিনের। এই স্বপ্নটা কী অদ্ভুত!
ছোটবেলায় একটা কবিতা পড়েছিল পুশকিন। রবি ঠাকুরের ‘ফাল্গুন’! শুধু শেষের কয়েকটা লাইন মাথার মধ্যে সারাক্ষণ আজকাল পাক খায়। নিজের মনেই কখনও কখনও ও গুনগুন করে, “খেয়াঘাটে ওঠে গান / অশ্বত্থতলে, / পান্থ বাজায়ে বাঁশি / আনমনে চলে। / ধায় সে বংশীরব / বহুদূর গাঁয়, / জনহীন প্রান্তর / পার হয়ে যায়। / দূরে কোন শয্যায় একা কোন ছেলে / বংশীর ধ্বনি শুনে / ভাবে চোখ মেলে— / যেন কোন যাত্রী সে, / রাত্রি অগাধ, / জ্যোৎস্নাসমুদ্রের/ তরী যেন চাঁদ। / চলে যায় চাঁদে চ’ড়ে / সারা রাত ধরি, / মেঘেদের ঘাটে ঘাটে/ ছুঁয়ে যায় তরী।”
আজ স্বপ্নে এটাই যেন ফিরে এসেছিল। ছোটবেলায় এই কবিতাটার পাশে একটা ছবি ছিল। বাচ্চা একটা ছেলে, আধশোয়া হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আর দূরে, বহু দূরে এক পথিক বাঁশি বাজাতে-বাজাতে চলেছে মাঠের মধ্যে দিয়ে! আর সবকিছুর ওপর নিটোল চাঁদ তার জ্যোৎস্নার ওড়না মেলে বসে রয়েছে!
আজ স্বপ্নে সেই ছবিটাই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল! খুব অবাক লাগছে পুশকিনের! সেই কবেকার ছোটবেলায় সাত-আট বছর বয়সের পুশকিন যে-ছবিটা দেখেছিল, আজ সেটাই জীবন্ত হয়ে উঠল! বুকের মধ্যে কেমন একটা ‘পেয়ে হারালাম’ ধরনের শূন্যতা টের পাচ্ছে আজ। সেই কবিতাটা পড়ার সময় মা, ঠাকুরদা, পিসেমশাই, পিসি আরও কত-কত মানুষ ঘিরে থাকত ওর জীবন। পুশকিনের নিজেকে মনে হত ওই বাচ্চা ছেলেটার মতো। মনে হত, ও নিজেই জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখছে জ্যোৎস্নার রাত্রে ফাঁকা মাঠ দিয়ে দূরে কোনও এক বাঁশিওয়ালা আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে! তার মনখারাপ করা সুর ভেসে আছে আকাশে! আর আজ এত বছর পরে, এতটা পথ হেঁটে আসতে-আসতে মনে হয় কখন যেন সেই বাচ্চা ছেলেটা থেকে ও একলা, নির্জন পথে হেঁটে যাওয়া সেই বাঁশিওয়ালায় পরিণত হয়েছে। জীবন এক অদ্ভুত জাদুকর! নিজের অজান্তেই সে মানুষকে পালটে দেয়। তার অবস্থান বদলে দেয়।
নাঃ, মাথাটা কেমন করছে! একে ভাল করে ঘুম হয়নি, তারপর এসব চিন্তাভাবনা! পুশকিন আর দেরি করল না। উঠে পড়ল। নোঈ কি সত্যি আসবে নাকি? বুকের মধ্যে আবার খচ করে উঠল! বাবা যে কী করে!
বাথরুমে গিয়ে সময় নিয়ে চোখেমুখে জল দিল পুশকিন। তারপর কী মনে হওয়ায় স্নান করল ভাল করে।
স্নান সেরে তোয়ালে পরে ঘরে এল পুশকিন। পাজামা-পাঞ্জাবি আছে আলমারিতে। ও বের করল সেটা। ডিমের কুসুম রঙের পাঞ্জাবির সঙ্গে সাদা পাজামা পরে নিল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউমটা তুলে নিল। নীল রঙের বোতল। ঠান্ডা জলের মতো আরামদায়ক।
“জেজে, আমায় লাগিয়ে দেবে না!”
কোমরের কাছ থেকে শব্দটা এল। পুশকিন তাকাল। কুটু এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। কুটু ভাইয়ের ছেলে। বছরচারেক বয়স। একমাথা গোল্লা পাকানো চুল। ছোট্ট লাল ঠোঁট আর বড়-বড় চোখ!
পুশকিন দেখল বাইরে বেরোনোর জামাকাপড় পরে কুটু তৈরি! বুঝল, ভাইরা ঘুরতে বেরোবে। ঠাকুর দেখতে বেরোবে। বাবা এই নিয়ে একটু রাগ করছিল, কিন্তু ভাইকে বাবা জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে না। ভাই সাফ বলে দিয়েছে যে, লোকজন আসবে আসুক, ওরা একটু ঘুরে দশটার মধ্যে বাড়ি চলে আসবে!
কথাটা সত্যি। অষ্টমীর দিন মানুষ ঘুরবে না তো কি লোকের বাড়িতে এসে রাতে খাবে? বাবাকে কে বোঝাবে! বললেই বলবে, “আগে তো সবাই আসত। এত বায়নাক্কা দেখাত না। এখন তোরা কেমন সব হয়ে গেছিস!”
আরে, আগেকার দিনে মানুষ অন্যরকম ছিল। এখন আর-এক রকম হয়ে গেছে। সব পালটাচ্ছে, মানুষ পালটাবে না! চারিদিকে জনসংখ্যা কী হারে বাড়ছে! মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য আরও আক্রমণাত্মক হতে হচ্ছে এখন! নিজের ইচ্ছেটাই সেখানে সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্টের জন্য প্রাধান্য পাচ্ছে। মনের ধাঁচটাই যে পালটে গিয়েছে! সেই মনটা কি আর আগের মতো কাজ করবে! তার প্রভাব তো অন্য কাজেও পড়বে!
“এই নে, হাত তোল…” পুশকিন কুটুর দিকে ঝুঁকল।
“হ্যান্ডস আপ?” কুটু চোখ বড়-বড় করে হাত তুলল মাথার ওপরে!
পারফিউম লাগিয়ে দিয়ে নিজের গায়েও স্প্রে করল পুশকিন।
“জেজে, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো না! মা বলছিল তোমায় বলতে। যাবে? আজ সাউথের ঠাকুর দেখব।”
“না কুটুবাবু, আজ তো যেতে পারব না। বাড়িতে লোকজন আসবে! সবাই চলে গেলে লোকজন রাগ করবে তো। কাল যাব, কেমন?” পুশকিন হাসল।
কুটু গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, “লোক রাগ করবে, না জন রাগবে?”
হাসল পুশকিন, বলল, “দু’জনেই রাগ করবে! তাই আমাকে থাকতে হবে বাড়িতে!”
