“না, না,” পুশকিন আশ্বস্ত করল বাবাকে, “আসলে দু’রাত ঘুমোইনি তো… তাই…”
বাবা মাথা নাড়ল, “কী লাভ এমন কাজ করে! ক্রীতদাস প্রথা চলছে নাকি! যাকগে, তুই রেডি হয়ে নে, লোকজন আসতে শুরু করবে!”
এবার মাথাটা পরিষ্কার হল পুশকিনের। তাই তো! আজ তো রাতে বাড়িতে লোকজন খায়। বাবা অনেককে নেমন্তন্ন করে। আজ অষ্টমী যে! দুর্গাষ্টমী!
গত দু’রাত ঘুমোয়নি পুশকিন। অফিসের একটা বিশেষ কাজে খুব ব্যস্ত ছিল। ওদের দিল্লি হেড কোয়ার্টার থেকে পুশকিনকে একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে একটা নতুন ফ্যাক্টরি হচ্ছে। তার কিছু টেকনিকাল ইভ্যালুয়েশন ছিল। পুশকিনের কাছে সেইসব পেপার পাঠানো হয়েছিল দেখে দেওয়ার জন্য। প্রায় সাড়ে ছ’শো পাতার পিডিএফ ফাইল। দুটো দিন আর দুটো রাত লেগে গিয়েছে পুশকিনের।
পুজো বলে এখানে অফিস ছুটি। কিন্তু ও একা এই দু’দিন অফিসে গেছে। অফিস করেছে! কাজটা খুব জরুরি ছিল। যে-কোম্পানি এই প্রোজেক্টে ইনভেস্ট করছে রিকো গ্রুপের সঙ্গে, তাদের প্রতিনিধিরা কাল আসবে বুদাপেস্টে। মিটিং আছে রিকো গ্রুপের লোকজনদের সঙ্গে। ব্যাপারটা খুবই জরুরি বলে বস দিল্লি থেকে ওকে নিজে ফোন করে বলেছিলেন কাজটা করে দিতে। পুশকিন আপত্তি করেনি। পুজো-টুজো নিয়ে ওর কোনও মাথাব্যথা নেই।
টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা কাজ করে আজ সকালে অফিস থেকে বেরোনোর সময় ওর মাথা টলছিল। মনে হচ্ছিল যে-কোনও সময় পড়ে যাবে মাটিতে। কীভাবে যে তাও গাড়ি চালিয়ে এখানে এসেছে, এখন ভাবতেও অবাক লাগছে ওর!
বাবা আগেই বলে দিয়েছিল, পুজোর চারটে দিন ও যেন নিজের ফ্ল্যাটে না থেকে বাড়িতে এসে ওঠে! তাই আজ অফিস থেকে সোজা বাড়িতেই এসেছে পুশকিন।
ও বুঝতে পারছে আস্তে-আস্তে বাড়ির সঙ্গে ওর যোগাযোগ আবার সহজ হয়ে আসছে। বুঝতে পারছে, বাবা চাইছে ও আবার এখানে ফিরে আসুক।
পুশকিন বাবাকে বলল, “আমি ঠিক আছি। একটু ফ্রেশ হয়ে নিই।”
বাবা বিরক্ত মুখে তাকাল ওর দিকে! বলল, “সেই দেড়টার সময় ঘুমিয়েছিস! না ডাকলে তো এখনও উঠতিস না! কী হবে এমন কাজ করে যেখানে এভাবে গোরুর মতো খাটতে হয়!”
পুশকিন হাসল। বাবাকে বুঝিয়ে লাভ নেই।
বাবা আবার বলল, “তুই ফ্রেশ হয়ে নে। লোকজন এসে পড়বে! আর ওই মেয়েটা, নোঈ, ওকে একবার ফোন করে মনে করিয়ে দে যেন আসে।”
“মানে!” পুশকিন অবাক হল! এই কথাটায় ঘুমের যে সামান্য কুঁচিকাচা পড়েছিল চোখের কোণে, এক ধাক্কায় উধাও হয়ে গেল! ও বলল, “নোঈ মানে? ওকে তুমি আসতে বলেছ নাকি?”
“হ্যাঁ, আমি ফোন করেছিলাম মহালয়ার দিন। বলল তো নিশ্চয় আসবে। আর আমি স্পেশ্যালি বলেছিলাম, তোকে যেন না বলে!”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না। বাবা মাঝে মাঝে এমন সব কাণ্ড করে! কে বলেছে বাবাকে এটা করতে? যত বয়স বাড়ছে, ছেলেমানুষিগুলোও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে!
ও বলল, “তুমি ওকে বলেছ কেন? আরে, ও আমার অফিসে চাকরি করে! একটা প্রোটোকল বলেও তো ব্যাপার আছে, নাকি? বললেই হল এভাবে বাড়িতে আসতে!”
বাবা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর বলল, “আমার বাড়ি, আমি যাকে খুশি ডাকব, তাতে তোর কী!”
পুশকিন মাথা নাড়ল। বাবা আগে এমন ছিল না। দিন কে দিন কী যে হয়ে যাচ্ছে!
বাবা আবার বলল, “ফ্রেশ হ,’ ওই বুঝি কেউ এল!”
কলিং বেলটা পুশকিনও শুনতে পেয়েছিল। ও আর কিছু বলল না। বাবা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে!
ওর মনে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বাবা আবার নোঈকে কেন ডাকতে গেল! মেয়েটার সামনে গেলে আজকাল কেমন একটা লাগে ওর! কেমন একটা মনখারাপ আর মন ভাল নামের দুটো রং যেন মিলেমিশে যায় একসঙ্গে! মনে হয় পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে, পাইন আর দেবদারু গাছের জঙ্গল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একলা এক মনমরা টয় ট্রেন উঠে যাচ্ছে মেঘেদের ছাড়িয়ে! উঠে যাচ্ছে নাম-না-জানা কোনও নির্জন কাঠের স্টেশনের দিকে!
কী করে যে এর থেকে পালাবে, কিছুতেই বুঝতে পারে না ও। ও শুধু নিজেকে বোঝায় মেয়েটা, ওর চেয়ে অনেক ছোট। মেয়েটার একটা জীবন আছে! কোম্পানিতে কাজ করতে এসেছে মেয়েটা। বোঝায়, এসব অপ্রীতিকর চিন্তাভাবনা যেন কিছুতেই ওর মনে আর জায়গা না করতে পারে।
এমনিতেই অফিসের কারণে বেশ চাপে আছে পুশকিন। সোনাঝুরির কাজটা কেমন যেন আটকে আছে! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না! শুধু মিল কেনার কথা ওরা ভাবছে না। জোনাক-বাড়ি না পেলে শুধু মিল ওরা কিনতে চায় না। এখন ম্যানেজমেন্ট চাইছে পুশকিন যে করেই হোক ওই বাড়ির ব্যাপারটা যেন মিটিয়ে দেয়। মালিকদের বলে যে করেই হোক জোনাক-বাড়িটা জোগাড় করে। বিদেশে নাকি এই গোটা প্রজেক্টের জন্য নানা ইনভেস্টরের কাছ থেকে কোম্পানি টাকা তুলতে শুরু করেছে। সেখানে এখন কাজ না হলে যে-পরিমাণ পেনাল্টি রিকো গ্রুপকে দিতে হবে, সেটা কোম্পানির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই যে করেই হোক জুট মিল, জমি আর গোটা জোনাক-বাড়ি, সবটাই চাই ওদের। সেই কারণেই চতুর্থীর দিন সোজা গিয়ে দীপমালা দেবীর সঙ্গে দেখা করেছিল ও।
মাথাটা টিপটিপ করছে পুশকিনের। আরও ঘুম দরকার ছিল। বাবা কেন যে ঘুমটা ভাঙাল! লোকজন এলে আসবে, তাতে ও কী করবে? ওর লোকজন ভাল লাগে না! দেখা হলেই সব এমন-এমন প্রশ্ন করে! বিশেষ করে স্মিতার সঙ্গে বিয়ের বিষয়টা নিয়ে লোকজন এখনও এমন সব প্রশ্ন করে যে, মাথা ঠিক রাখা যায় না! পৃথিবীতে আত্মীয়স্বজনদের কাজই বোধহয় মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলা, তাদের মুখ ম্লান করে দেওয়া!
