“বল,” নিশান ছোট করে বলল।
বাদল ওর হাতটা ধরল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তুই কথাটা কিন্তু ভুলভাবে ধরবি না নিশান। তুই আমার বন্ধু, আমি চাই না তোর কোনও ক্ষতি হোক। তাই বলছি। তুই এই ‘সেভ সোনাঝুরি’ না কী একটা অর্গানাইজ়েশন করেছিস, সেটা বন্ধ কর। শুনছি সামনে তোদের নানা প্রোগ্রাম আছে? মিছিল, ধরনা, আরও কীসব! করিস না ভাই এসব। বন্ধ কর। না হলে বিপদ হবে!”
“তারকদা বলেছে এসব তোকে আমায় বলতে?” নিশান শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
“না রে পাগল!” বাদল বলল, “আমি শুনেছি। মানে, কানে এসেছে আমার। তোর ওপর কিন্তু খার আছে তারকদার। ভাই, তুই এসব করিস না। বিপদ হয়ে যাবে! আমার উপায় নেই, আমায় রোজগার করতে হবে। কিন্তু তুই এমন করিস না। তারকদা ভাল লোক নয়। জানিস তো এই প্রোজেক্টে কয়েক কোটি টাকা কামাবে ও। সেটাতে কেউ বাধা দিলে কী হবে বুঝতে পারছিস? পার্টির কথাও নাকি লোকটা শুনছে না! মোতিদা সেদিন বলছিল আমায়। তুই একটু রয়ে-সয়ে থাকিস।”
নিশান কিছু বলার আগেই পকেটের ফোনটা বেজে উঠল ওর। এখন আবার কে? ও পকেট থেকে বের করল মোবাইলটা। মণীশ! এখন মণীশ কল করছে কেন?
“বল,” মোবাইলটা কানে লাগাল নিশান।
“তুমি কোথায়?” মণীশ দ্রুত জিজ্ঞেস করল।
“কেন? আমি বাদলের বাড়িতে। কী হয়েছে?”
“আধঘণ্টার মধ্যে তারকদার বাড়ির সামনে আসতে পারবে? খুব জরুরি দরকার।”
মণীশের গলা শুনে নিশান বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
“কেন? আমি নেমন্তন্নে এসেছি…”
“সুপ্রতীক মালিক এসেছে একা। তারকদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে! তুমি বলেছিলে না, লোকটার সঙ্গে কথা বলবে! আজ চান্স। চলে এসো। একাই লোকটা গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছে। এই ওয়েদারে সবার চোখের আড়ালে আসতে পারবে বলেই বোধহয় এসেছে। জানি না কী কেস! কিন্তু কিছু কেলো তো আছে গুরু। চলে এসো। আমি এখানেই আছি।”
কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিল মণীশ। নিশান বুঝতে পারল না কী করবে! এখানে দুপুরে খাবে। কাকিমা সারাদিন ধরে রান্না করেছে। এখন চলে গেলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে!
“খুব আর্জেন্ট দরকার নাকি?” বাদল তাকাল ওর দিকে।
নিশান মাথা নাড়ল। বাদলকে বলা যাবে না কী ব্যাপার। কারণ, ওর যা প্ল্যান সেটা তারকের ভাল লাগবে না জানলে।
নিশান বলল, “হ্যাঁ রে, খুব আর্জেন্ট। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছতে হবে।”
বাদল মুখ নিচু করে চিন্তা করল। তারপর বলল, “এক ঘণ্টার মধ্যে আসতে পারবি? আমি মাকে ম্যানেজ করে নিচ্ছি। তুই ঘুরে আয়!”
“কিন্তু…” নিশান ইতস্তত করল।
বাদল হাসল, “আরে, কাজ আগে। প্লাস এমন হুড়োহুড়ি করে কেউ নেমন্তন্ন খায়! তুই সেরে আয় কাজটা। আমি মা আর মেঘলাকে সামলে নেব। শুধু মাথায় রাখিস, তুই না এলে কিন্তু আমরা কেউ খাব না! কেমন? বোনটা আমার কষ্ট পাবে!”
নিশান হাসল। বলল, “ব্যাগটা থাক। আমি ঘুরে আসছি তা হলে চট করে।”
আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় টাঙানো বর্ষাতিটা তুলে নিয়ে সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেল। উঠোনে জল আরও বাড়ছে। চাঁপাগাছের ওপরের ডালপালা কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছে!
বাইরে বেরিয়ে নিশানের মনে হল বৃষ্টিটা বোধহয় আরও ঝেঁপে নামল ওকে দেখে! বাধা, সবেতেই যেন বাধা পাচ্ছে! কেন কে জানে, নিশানের মনে হল, সামনেও খুব কিছু সহজ দিন আসছে না!
.
২৪. পুশকিন
আজ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। দূর পাহাড়ের ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো হাওয়ায় দুলছে খুব। ফাঁকা মাঠের মাঝে একলা সিঁথির মতো রাস্তা পড়ে রয়েছে। আর সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা লোক। পরনে হাতকাটা ফতুয়া আর ধুতি। লোকটা বাঁশি বাজাতে-বাজাতে হেঁটে যাচ্ছে দূর পাহাড়ের দিকে। আশপাশে কেউ নেই। শুধু দূরে একটা বাড়ি, তার জানলায় বসে রয়েছে কেউ। আর সে দেখছে এই পথিককে। হাওয়ায় চুল উড়ছে মানুষটির। ফতুয়ার কোণ উড়ছে। আর সে একাকী হেঁটে যাচ্ছে নির্জন এই পথে, দূর পাহাড়ের দিকে। বাঁশির সুরটা স্পষ্ট। আর কী ভীষণ চেনা! রাতের হাওয়ায় ভেসে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ছে। আর ছুঁয়ে দিচ্ছে দূর সেই বাড়ির জানলায় বসে থাকা ছেলেটিকে। পাশে প্রদীপের মৃদু আলো। ছেলেটি বসে দেখছে দূর রাত্রির বুক দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক একলা মানুষকে।
“বাবু,” ছেলেটিকে কে যেন ডাকল এবার। ছেলেটি পাশ ফিরল। আর চোখ মেলে তাকাল পুশকিন!
“বাবু, ঘুমিয়ে পড়েছিস?” বাবা ডাকছে! পুশকিন বুঝতে পারল না প্রথমে! কোথায় ও! সেই সাদা সিঁথির মতো একলা রাস্তাটা কোথায়! পথিক! সেই পথিকই-বা কই!
“কী রে, শুনছিস?” বাবা সামান্য ঠেলল এবার ওকে!
পুশকিন যেন প্যারাসুটে চেপে ধীরে-ধীরে নেমে এল মাটিতে!
ও এবার ভাল করে দেখল। বাবা দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথার কাছে। সিল্কের লুঙ্গি আর গায়ে একটা ফতুয়া। ও ধীরে-ধীরে উঠে বসল। আজ কী দিন? কী বার! গুলিয়ে যাচ্ছে যেন সব!
“কী রে, শরীর খারাপ করছে এখনও?” বাবার মুখে উদ্বেগ!
পুশকিন মাথাটা ঝাঁকাল। চোখটা লেগে আসছে। ক্লান্ত লাগছে। বালিশের দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ার লোভ হচ্ছে!
ক’টা বাজে? দেওয়ালে পুরনো দিনের একটা ঘড়ি টাঙানো আছে। দেখল, সাড়ে সাতটা বাজে। সন্ধে হয়ে গেছে তবে? কতক্ষণ ঘুমোল ও?
“কী রে, শরীর খারাপ নাকি?” বাবা আবার জিজ্ঞেস করল।
