“কিছু হয়েছে কি? আমায় বলতে পারো,” আশ্বাসের গলায় বলেছিল নিশান।
“পারি?” দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল রাধিয়া, “আসলে… মানে…”
“তবে থাক। ব্যক্তিগত কিছু হলে লেট ইট বি,” নিশান হেসে পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করেছিল।
“আসলে,” রাধিয়া ঠোঁট কামড়ে ভেবেছিল একটু, “আমার কাউকে এই ব্যাপারটা নিয়ে বলার নেই। কিন্তু… আমি কি তোমায় বিশ্বাস করতে পারি?”
নিশান এবার চওড়া করে হেসেছিল, “শোনো, বিশ্বাস ব্যাপারটা সেই ছবি বিশ্বাসের আমলেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই ওটা ভেবো না। আমি এমন কিছু করব না যাতে তোমার ক্ষতি হয়। ইচ্ছে হলে বলতে পারো আমায়।”
নিশান কথা বলার সময় রাধিয়ার চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছিল না একটুও। দেখছিল ওর ‘তুমি’ বলাটা রাধিয়া ভালভাবেই নিয়েছে। আর নিজেও ‘তুমি’ করেই কথা বলছে!
“আমার বাবা… মানে কী করে বলি,” রাধিয়া ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলেছিল, “আমি এটা কী করে তোমায় বলতে পারছি, জানি না। কিন্তু ইচ্ছে করছে বলতে…”
নিশান কিছু না বলে এবার আলতো করে রাধিয়ার হাতটা ধরে সামান্য চাপ দিয়েছিল। নিজের ব্যবহারে ও নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। এসব কী করে করছে ও! একটা অর্ধেক চেনা মেয়ের হাত ধরছে ও!
রাধিয়া বলেছিল, “বাবা আমাদের না বলে আজকাল কোথায় যেন যায়! মানে… আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। বিজ়নেসের কাজে কলকাতার বাইরে যাবে বলে কলকাতার মধ্যেই ঘোরাফেরা করে! কেন জানি না। কিন্তু আমার খুব ভয় করে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। মাকে বা ঠাকুমাকে বলা যাবে না!”
নিশান বলেছিল, “আমি কি খোঁজখবর করব?”
“তুমি?” রাধিয়া কেঁপে গিয়েছিল সামান্য, “কিন্তু…”
“না, কিছু ফেভার আমি চাইব না। তোমার ঠাকুমার সঙ্গে আমার দেখা করা দরকার। কিন্তু সেটাও আমি তোমায় করিয়ে দিতে বলব না। তুমি চাইলে আমি খবর নিতে পারি।”
রাধিয়া মাথা নামিয়ে নিয়েছিল, “ছিঃ! ছিঃ! আমি কী বললাম!”
“ডোন্ট ওয়ারি, কেউ জানবে না। আই প্রমিস। আমি খবর নেব।”
রাধিয়া এবার নিশানের হাতটা ধরেছিল। বলেছিল, “আমি ভুলব না, তুমি আমার জন্য কী করলে!”
“এখনও তো কিছু করিনি! আগে করি!” নিশান হেসেছিল।
রাধিয়া বলেছিল, “এই যে কিছু করবে বললে এটাই বা কে বলে? আই অ্যাম গ্রেটফুল।”
“প্লিজ়, এভাবে বোলো না। তোমার জন্য কিছু করতে পারলে আমার ভাল লাগবে!”
“কেন?” রাধিয়া প্রশ্নটা করে তাকিয়েছিল নিশানের দিকে।
নিশান হেসেছিল শুধু। তারপর শান্ত গলায় বলেছিল, “ঝড় থেমে গেছে, দ্যাখো!”
“না, আমার উত্তর চাই,” রাধিয়া চোখ সরায়নি, “কেন?”
নিশান মাথা নেড়ে হেসেছিল নিজের মনে, তারপর বলেছিল, “বলব একদিন, কেমন?”
“তুমি শালা নিজে ক্যাল খাবে! আমাকেও ক্যাল খাওয়াবে!” কথাটা শুনে চিড়বিড় করে উঠেছিল মণীশ।
“আরে, তুই জাস্ট একটু খবর নিবি!” নিশান কথাটা বলে হেসেছিল।
সোনাঝুরির বটতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। সেদিনের অনুষ্ঠানের পরে সোনাঝুরিতে ফিরে মণীশের সঙ্গে দরকারি কথা আছে বলে নিশান ওকে দাঁড় করিয়েছিল বটতলায়!
“মাইরি, সুপ্রতীক মালিক কি বাচ্চা ছেলে নাকি যে, আমি খবর নেব? শালা, গাড়ি করে বেড়ায় সারাক্ষণ। আমি কী করে পারব?” ছায়া-ছায়া অন্ধকারে মণীশকে কেমন ছটফটে লাগছিল।
“না, না, পারবি। তোর তো বিশাল জানাশোনা। একটু দেখ না, কোথায় যায় লোকটা। বুঝতে পারছিস না আমাদের আন্দোলনের জন্য এটা দরকার। লোকটা কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, সেটা জানা দরকার আমার।”
“আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়া একটা বাচ্চা ছেলে, আমায় তুমি এসব বলছ?” কথাটা শেষ করে হেসেছিল মণীশ।
“শালা, তিনবার ফেল করে তো এবার স্কুল ছেড়ে দিলি! আবার বাচ্চা ছেলে কী রে? দেখ না ভাই, প্লিজ়!” নিশান হাত ধরেছিল ওর।
আসলে নিশানের নিজের তো সময় হবে না। তাই মণীশকে বলেছিল। ও জানে মণীশ ছেলেটা করিতকর্মা। তা ছাড়া নিশানের কথা শোনে মণীশ। আর ওকে তো আসল কথা বলেনি। বলেছে এই সোনাঝুরির ব্যাপারে সুপ্রতীক মালিক কী করছে সেটা জানা দরকার। আর মণীশ ব্যাপারটা খেয়েও গেছে!
মণীশ শুধু বলেছিল, “তুমি কি মালটার সঙ্গে দেখা করতে চাও নাকি?”
সময় নিয়েছিল নিশান। তারপর বলেছিল, “হ্যাঁ চাই। দেখা করতে চাই আমি। শুধু গতিবিধিটা একটু দেখিস, কেমন!”
“শালা, তোমার যত্তসব আনতাবড়ি কাজ! খবর নিয়ে কী ছিঁড়বে কে জানে! বেকার সব! ঠিক আছে আমি জানাব,” মণীশ আর দাঁড়ায়নি। বটতলার পাতলা অন্ধকার ফুটো করে চলে গিয়েছিল বাড়ির দিকে।
আর, তারপর খবর পেয়েছে নিশান। মণীশ ঠিক খবর জোগাড় করে এনেছে। আর সেটা খুব একটা সুখবর নয়। ও জানে না ব্যাপারটা কী করে বলবে রাধিয়াকে!
“কী রে, একা-একা বসে কী করছিস? আমি ভাবলাম মায়ের সঙ্গে কথা বলবি,” বাদল ঘরে ঢুকে হাসল।
নিশানও হাসল বাদলের দিকে তাকিয়ে। বলল, “না এমনি।”
বাদল চট করে একবার অন্য ঘরের দিকে দেখল। তারপর একটা মোড়া টেনে এনে ওর পাশে বসে বলল, “তোকে একটা কথা বলার ছিল। আর্জেন্ট।”
নিশান অবাক হল। বাদলের চেহারায় পুরনো চাকচিক্য ফিরে এসেছে। ঘরবাড়িতেও একটা শ্রী এসেছে। বোঝা যাচ্ছে যে, তারক চক্রবর্তীর কাছ থেকে খারাপ কিছু পাচ্ছে না ও। কিন্তু এই লোকটার সঙ্গে কেন কাজ করছে বাদল? ওর বাদলের জন্য চিন্তা হচ্ছে।
