নিশান নিজের মনকে শক্ত করল। তারপর ধীরে-ধীরে বসল বিছানার একপাশে। বলল, “এমন করতে নেই মেঘলা। এভাবে বলতে নেই!”
“কেন?” মেঘলা উঠে বসল এবার। পাথরের মতো চোখ দুটো থিরথির করে কাঁপছে, “কেন হয় না নিশানদা? আমি অন্ধ বলে?”
“না রে পাগলি না,” মেঘলার গলায় এমন একটা অসহায়তা ছিল যে, নিশানের চোখে জল এসে গেল, “আমি তোকে ওভাবে দেখি না রে! তোকে সেই ছোট থেকে দেখছি। আর তুই… তুই এমন কেন করলি?”
“আমি তোমায় ভালবাসি নিশানদা। বোঝো না কেন তুমি? আমি তোমায়… সব দিতে চাই নিশানদা…”
“কী বলছিস তুই?” নিশান মেঘলার গলার ওপর গলা তুলে ওকে চুপ করিয়ে দিতে চাইল।
মেঘলা নিজেকে সংযত করল এবার। তারপর বলল, “আমি জানি আমার এই অবস্থার জন্য কোনওদিন তুমি আমায় ভালবাসতে পারবে না। ছেলেরা মুখেই বড়-বড় কথা বলে, কিন্তু আসলে সবাই বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো বউ আর প্রেমিকা চায়! তোমারও নিশ্চয়ই তেমন কোনও প্রেমিকা আছে! তাই না? কিন্তু আমি তো তোমায় ভালবাসি, আমি থাকব তোমার জন্য। কখনও যদি তোমার মনে হয়, তুমি এসো। আমি আমার সবটা তোমায় দেব। না, পরিবর্তে কিছু চাই না।”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। আসলে কিছু বলার নেই ওর। মেঘলা মনে মনে এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছে যে, ওকে কিছু বলার কোনও মানে নেই এখন। যে সত্যিকারের প্রেমে পড়ে তার কাছে জীবনের, বাস্তবের, ঠিক-ভুলের পারসেপশনগুলো বদলে যায়। তার যুক্তি, বুদ্ধি, তথাকথিত রোজকার পৃথিবীর যুক্তি, বুদ্ধির সঙ্গে খাপ খায় না আর!
“কী চাস না রে?”
আচমকা পেছন থেকে কাকিমার গলা পেয়ে নিশান চমকে উঠল। ওর মনে হল হৃৎপিণ্ডটা বোধহয় এবার মুখ দিয়ে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
“কী রে! কী বলছিস তুই?” কাকিমা ঘরে ঢুকল। নিশান দেখল কাকিমার সঙ্গে বাদলও এসে ঘরে ঢুকেছে!
মেঘলা চোখ মুছে বলল, “বলছি, আমার কিছু চাই না নিশানদার কাছ থেকে। নিজে আসে না, আর আজ এসেছে গিফট নিয়ে! মানুষের চেয়ে জিনিস দামি নাকি? তাই বলেছি এসব যেন নিয়ে যায়!”
“আরে…” নিশান অপ্রস্তুতভাবে হাসল। মেয়েটা কথাটা ঠিক ঘুরিয়ে দিল তো! ও বলল, “তাই কি হয় নাকি? ওভাবে হয় না। আমি নিয়ে এসেছি, তোকে নিতেই হবে! আমি তোকে ভালবেসে…”
“ছাড়ো তো!” মেঘলা রাগে গরগর করে উঠল, “ভালবেসে… বাজে কথা যত!”
“আহা, তুই ওকে অমন করে কথা বলছিস কেন?” কাকিমা শাসনের গলায় বলল, “চল ও ঘরে। স্নান করে নিবি, চল।”
মেঘলা উঠল বিছানা থেকে, তারপর আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে-ধীরে চলে গেল পাশের ঘরে।
নিশান যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ যা হল সেটা কি সত্যি হয়েছিল? মেঘলা এমন করবে বুঝতে পারেনি! এরপর থেকে এখানে আসার আগে ওকে ভেবে দেখতে হবে!
“কী এনেছিস এটা?” বাদল ঝুঁকে বিছানায় রাখা গিফটের প্যাকেটটা তুলে নিল হাতে।
“ওই আর কী…” নিশান হাসার চেষ্টা করল, “তা কোথায় গিয়েছিলি তোরা?”
“কাছেই। পাড়ার এক দাদু। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হল। আমায় ডাকল। শুনে মা-ও গেল। মা, কাকাবাবু বলে ডাকত। আরে দেখ না, অ্যাম্বুলেন্স আসতে চাইছিল না। আমাকে তাই ডেকেছিল।”
“তোকে? কেন?” নিশান অবাক হল।
বাদল হাসল, “আরে, তুই জানিস না? তুই তো আর কিছু কাজ দেখে দিলি না। তাই আমি গিয়ে ধরলাম তারকদাকে। আমি এখন তারকদার সঙ্গে আছি। সেই কারণেই ডেকেছিল আমায়। তো, দাদুর ওখানে গিয়ে আমি নিজেই ফোন করলাম তারকদার ওই রাইট হ্যান্ড মোতিদাকে। ব্যস, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হয়ে গেল। তা, তুই খেয়ে যাবি তো? একটু বোস, আমি আসছি।”
নিশানের উত্তর না শুনেই বেরিয়ে গেল বাদল। নিশান ঘড়ি দেখল। দেড়টা বাজে। একটা ফোন আসার কথা আছে। মণীশটা ঠিকমতো কাজটা করছে তো! চিন্তা হল ওর। ছেলেটাকে ব্যাপারটা বলে কোনও ভুল করেনি তো! নিশান নিজেকে ঠিক করতে চোখ বন্ধ করল। আর সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা।
সেদিন ঝড় উঠেছিল খুব। নন্দন চত্বরে হাওয়ায় কুটো উড়ছিল ভীষণ! একটা ঝড়ের কুটো এসে লেপটে গিয়েছিল রাধিয়ার গালে। এমন তো করে না নিশান! কিন্তু সেদিন কী যে হয়েছিল ওর! আচমকা হাত বাড়িয়ে রাধিয়ার গালে লেপটে থাকা ঝড়ের কুটো সরিয়ে দিয়েছিল ও। আর অবাক হয়ে দেখেছিল রাধিয়া মাথা নামিয়ে ঝরঝর করে কাঁদছে!
“আরে, কী হল?” নিশান আর-একটু কাছে এগিয়ে গিয়েছিল।
রাধিয়া সময় নিয়েছিল। আর সেই সু্যোগে ঝড়টাও যেন আছড়ে পড়েছিল কলকাতায়। সবাই এদিক-ওদিক দৌড়োচ্ছিল মাথা বাঁচাতে। নিশানও রাধিয়ার হাতটা ধরে সামান্য দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা ছাউনির তলায়।
“কী হয়েছে তোমার?” নিশান যেন কীসের এক অদৃশ্য জোরে তুমি করে বলে ফেলেছিল কথাটা।
“আমার… আমার…” রাধিয়া কথা বলতে পারছিল না ভাল করে। হাওয়া এসে উড়িয়ে নিচ্ছিল ওর চুল। জলের ছিটে এসে হিরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছিল ওর চুলে, মুখে।
“আমি কিছু হেল্প করতে পারি?” নিশানের ঠোঁট শুকিয়ে আসছিল। বুকের ভেতর কেমন যেন এক ঘূর্ণি শুরু হয়েছিল। ওর মনে হচ্ছিল রাধিয়াকে জড়িয়ে ধরে, সবার কাছ থেকে, সব কিছু থেকে লুকিয়ে রাখে!
রাধিয়া নিজেকে সামলেছিল এরপর। হাতে ধরা রুমালটা দিয়ে চোখ আর নাক মুছেছিল আলতো করে। তারপর বলেছিল, “আই অ্যাম সরি।”
