সাইকেলটা ঠেলতে-ঠেলতে ও বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ছড়ানো উঠোনে জল থইথই করছে! জায়গা দেখে, সামনের বড় চাঁপাগাছের পাশে সাইকেলটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে বারান্দায় উঠল ও।
“কে?” মেঘলার গলা পেল নিশান।
“আমি রে!” নিশান গায়ের বর্ষাতিটা খুলে জল ঝেড়ে বারান্দার পাশে একটা কাঠের ছোট আংটায় ঝুলিয়ে দিল। তারপর হাত দিয়ে মাথা আর গায়ের সামান্য জলের কুচি সরিয়ে দিয়ে দাঁড়াল ঘরের সামনে! পাপোশটা সরে গেছে। সেটা পা দিয়ে টেনে তাতে পা মুছে ও ঘরে ঢুকল। সামান্য ঠান্ডা লাগছে!
“কী রে, কাকিমা নেই?”
“আমি আছি, এতে হবে না?” মেঘলার গলায় রাগ।
“আরে!” নিশান হাসল। পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে রাখল বিছানায়। তারপর বসল মেঘলার পাশে।
“কী আরে!” মেঘলা অভিমানী গলায় বলল, “খালি এর কথা, ওর কথা! আজকাল তো আসোও না! কেন এমন হয়ে গেলে তুমি নিশানদা!”
“আমি আবার কী হলাম!” নিশান ব্যাগের চেন খুলে একটা বড় প্যাকেট বের করল। তারপর ব্যাগটা নামিয়ে রাখল মাটিতে।
রাধিয়ার সঙ্গে গিয়ে কিনেছে এটা। একটা জামা আছে এতে। সঙ্গে ভাল একটা মিউজিক সিস্টেম!
“এই যে আর আসো না! আমি কেমন আছি আর জানতে চাও না। আজ মা জোর করে নেমন্তন্ন করল বলেই তো এলে, তাই না? না হলে কি আসতে?”
“কী হয়েছে তোর মেঘলা?” নিশান ওর দিকে ঘুরে বসল, “কী বলছিস? আজ তোর জন্মদিন না! এমন মনখারাপের কথা কেউ বলে? এমন করিস না। এই দ্যাখ তো, আমি যদি তোর কথা না ভাবি, তা হলে এই ওয়েদারে কেন আসব জল-কাদা ভেঙে? এই দেখ কী এনেছি তোর জন্য!”
“লাগবে না যাও, কিচ্ছু লাগবে না আমার! তুমি ভিক্ষে দিতে এসেছ?” মেঘলা আচমকা ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে এগোতে গেল দরজার দিকে। কিন্তু ওর পায়ের কাছে রাখা নিশানের রাখা ব্যাগটায় বাধা পেয়ে নিজে টাল সামলাতে পারল না।
নিশান দ্রুত প্যাকেটটা বিছানায় রেখে ধরে ফেলল মেঘলাকে। মেয়েটা আর-একটু হলেই পড়ে যেত মাটিতে!
মেঘলা ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেল একটু। নিশান ওকে নিজের বুকের কাছে ধরে রেখেছে। ও-ও নিশানের পাঞ্জাবির বুকের কাছটা ধরে রয়েছে খামচে।
নিশান দেখল মেঘলার চোখে জল।
“আরে, তুই কাঁদছিস?”
নিশান হেসে ব্যাপারটাকে হালকা করতে গেল। কিন্তু আচমকা মেঘলা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর দু’হাতে নিশানকে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে নিল নিজের দিকে। আর নিখুঁত আন্দাজে নিশানের ঠোঁটটায় চেপে ধরল ওর ঠোঁট!
নিশান হতভম্ব হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য! এটা কী হচ্ছে? মেঘলা হঠাৎ এটা কী করছে? তারপরেই ওর হুঁশ ফিরল। মেঘলাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল জোরে। কিন্তু পারল না। বরং মেঘলা যেন আরও ঘন হয়ে, আরও জোরে চেপে ধরল ওকে!
মেঘলার গরম জিভ ওর ঠোঁট ফাঁক করে মুখের ভেতরে ঢুকতে চাইছে! মেঘলা দুটো হাত দিয়ে নিজের সঙ্গে পিষে ফেলতে চাইছে নিশানকে! নিশান কী করবে বুঝতে পারল না। মেঘলা যেন নিশানের সমস্ত সত্তাকে নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিতে চাইছে নিজের মধ্যে। কামড়ে ধরছে ওর ঠোঁট! নিজের বুক দুটো চেপে ঘষছে নিশানের বুকের সঙ্গে!
“আঃ!” ব্যথায় চিৎকার করে এবার নিশান গায়ের জোরে মেঘলাকে ঠেলে সরিয়ে দিল। মেঘলা সরল বটে, কিন্তু তাতে খুব একটা দূরে ছিটকে গেল না। বরং আবার সামনে ঝুঁকে দু’বারের চেষ্টায় চেপে ধরল নিশানের হাত। তারপর সটান নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে বলল, “আমি কি কিছু কম? নিশানদা, আমি চোখে দেখি না বলে আমার কি কিছু নেই! আমি কি কিছু দিতে পারি না তোমায়?”
নিশান এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ছিটকে গেল পেছনে। বলল, “কী করছিস তুই? পাগল হয়ে গেলি নাকি?”
“কেন, পাগল কেন? বাড়িতে মা নেই। দাদাও না। আমার ইচ্ছে করে না তোমায় আদর করতে! তুমি বোঝো না! আমিও তো মানুষ না কি! আমার চোখ নেই বলে কি ইচ্ছে থাকতে নেই!” মেঘলার গলার স্বর রাগ থেকে আচমকা কান্নায় ডুবে গেল এবার। ও দু’হাতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল বিছানায়!
নিশান কী করবে বুঝতে পারল না। মেয়েটা বিছানায় শুয়ে উপুড় হয়ে কাঁদছে। ফুলে-ফুলে উঠছে পিঠটা। ওর কী করা উচিত? পাশে বসে মাথায় হাত দেবে? তাতে যদি আবার রাগ করে? বা যদি আবার ওরকম করে?
নিশানের ঠোঁটটা এখনও ব্যথা হয়ে আছে! মনটা কেমন খাদে-পড়ে-যাওয়া বাসের মতো উলটে আছে! মনে হচ্ছে দৌড়ে পালিয়ে যায় এখান থেকে! কিন্তু সেটা যে সম্ভব নয়, বুঝতে পারছে। মেয়েটা এমন করল কেন!
এই জটিল প্রেম-ভালবাসা-যৌনতাগুলো সব কিছু নষ্ট করে দেয়। যার সঙ্গে মনের সম্পর্ক আছে তাকে আদর করতে নিশানের অসুবিধে হয় না। কিন্তু এভাবে যাকে ওই চোখে কোনওদিনও দেখেনি, যাকে ওইভাবে ভাবেনি, তার সঙ্গে কী করে ও এমন একটা সম্পর্কে জড়ায়! ও জানে এমন মানুষজন আছে যারা মন-টন বোঝে না! শরীর হলেই তাদের হয়। কিন্তু নিশান সে দলে পড়ে না। বরং ওর এখন খুব কষ্টও হচ্ছে! ও মনে মনে রাধিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সেখানে অন্য একটা মেয়ে ওকে এভাবে ধরে ফেলল! ঠোঁটে কামড়ে ধরল! এতে কোথাও কি রাধিয়ার বিশ্বাসটা ভাঙল ও!
নিশান জানে এভাবে হয়তো এখনকার ছেলেমেয়েরা কেউ ভাবে না। কিন্তু ও কী করবে! সবার ভ্যালু সিস্টেম তো একরকম নয়! ওর এইসব ব্যাপারে খুব একটা পিউরিটান মনোভাব আছে। কেন আছে জানে না। এখন ওর বারবার রাধিয়ার মুখটা মনে পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, রাধিয়াকেও তো কিছু বলেনি ও। এখনও ওর মনের ইচ্ছেটা, ফিলিংসটা নিয়ে কিছু বলেনি! শুধু বন্ধুত্বটুকু হয়ে আছে! তাও নিজের মনের কাছে কী করে মিথ্যে বলে নিশান!
