“ওরে আমার ন্যাকাখোকা! মায়ের কথা শুনে কত চলিস! মনে নেই, একদিন মাল খেয়ে আমাদের পাড়ার প্রতিমাদির ঘরে গিয়েছিলি? ওকে নাকি রেশমির মতো দেখতে! মাকে জিজ্ঞেস করেছিলি? শোন, হাওয়াটা বোঝ মাহির। এমন স্টাইলের নাম নিয়ে ঘুরলেই হবে! ঘটে কিছু থাকবে না? বড়-বড় শিল্পী সাহিত্যিকরা সুযোগ বুঝে পাল তুলে দিয়ে নৌকো বাইছে! আর সেখানে তুই আতাক্যালানে! রিতুদার এই কাজটা ভাল। এক নম্বরি। চল। ভাল দেবে। দু’মাসের মধ্যে বাইক নিয়ে ঘুরবি!” কথাটা বলে পকেট থেকে বিড়ি বের করল টিটি।
মাহির বিরক্ত হয়ে দেখল সেটা। ও কালে-ভদ্রে মদ খায়, কিন্তু কখনওই বিড়ি বা সিগারেট খায় না। গন্ধেই কেমন একটা গা গুলোয় ওর। বিশেষ করে এই বিড়ি জিনিসটা।
ও বিরক্ত হয়ে তাকাল টিটির দিকে। টিটি পাত্তা দিল না। নেশা নিয়ে টিটি কারও কথা শোনে না। বরং বলল, “শোন, আগেও বলেছে রিতুদা। কিন্তু এবারেরটা ভাইটাল। নতুন কাজ। খুব জটিল কাজ। ভাল টিম না হলে চলে না।”
“কী জটিল কাজ?” মাহির ভুরু কোঁচকাল।
“সে আমি কী জানি! কিন্তু রিতুদা যখন বলেছে, তখন জটিল! ব্যস! বেকার জেরা করবি না তো! রিতুদার অনেকদিন তোর উপরে চোখ আছে। জানে তো তুই একসময় ক্যারাটে করতিস।”
“সে তো আগে। লাস্ট দু’বছর তো করি না। আর আমি কি রিতুদার হয়ে মারামারি করব নাকি?” মাহির চোয়াল শক্ত করল।
টিটি সময় নিল একটু। বিড়িতে বড় করে একটা টান দিয়ে গাল ফুলিয়ে ধোঁয়াটাকে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর রাস্তার হলুদ আলোর মুখে ছুড়ে দিল নীলচে মিহি রুমাল! মাহির দেখল ধোঁয়ার ছোট্ট মেঘটাকে। দেখল, পুঁচকি মেঘটা ধীরে-ধীরে ছিঁড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল সন্ধের বাতাসে। নাকটা কুঁচকে গেল মাহিরের। গন্ধটা বড্ড বাজে! যারা রাস্তাঘাটে এসব খায় বা খেতে খেতে হাঁটে, তারা বোঝে না ব্যাপারটা কতটা বিরক্তিকর অন্যদের পক্ষে। অনেক বাতেলা বক্তৃতা করা লোককে দেখেছে মাহির, যারা এইসব সাধারণ অসভ্যতা নিয়ে ভাবে না। আসলে সেই বোধটাই নেই!
“শোন বোকা, যা বলছি কর। আমার আর কী! আমি তো ঢুকে গেছি। তোকে ভালবাসি। তাই বলছি। আর কথাটা শুনতে কী আছে বে? কান দিয়েছে ভগবান, সেটা শালা কাজে লাগাবি না? শোন, রিতুদা বাণী দেবে আর তুই শুনবি। আমাদের কাছে রিতুদার বাণী হল দৈববাণী! আর অত ভাটের নখরামোর কী আছে! রিতুদা বাইক পাঠিয়েছে তোর জন্য। বোঝ রে গান্ডু! চল।”
মাহির অবাক হয়ে গেল! বাইক পাঠিয়েছে রিতুদা! ওর জন্য! সামান্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে টিটির দিকে তাকাল। বলে কী ছেলেটা! ও এত গুরুত্বপূর্ণ হল কবে থেকে!
মাহির এদিক-ওদিক তাকাল। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে একের পর এক। রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের দিকের ফুটপাথে সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনেই মেনকা সিনেমা। সন্ধের শো কি শুরু হল?
এই রাস্তাটায় বড়-বড় গুলমোহর, কিছু রেনট্রি আর অশ্বত্থগাছ রয়েছে। রাস্তার হলুদ আলো এই গাছগুলোয় ধাক্কা খেয়ে ছোট-ছোট ছায়ায় ভেঙে ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। কিন্তু তার ভিতর তো কোনও বাইক নেই! টিটি কী সব হাবিজাবি বলছে!
টিটি বুঝল ব্যাপারটা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করে কানে লাগাল। বলল, “কী বে? কোথায় গেলি? তোর গাঁজা কেনা হয়নি? শালা, গাছ লাগাচ্ছিস নাকি বে!”
মাহিরের মুখটা বিরক্তিতে বেঁকে গেল। বুঝল, বাইক নিয়ে কেউ একটা গাঁজা কিনতে গিয়েছে। এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটা গাঁজার ঠেক আছে। টিটির দৌলতে মাহিরও সেসব চিনে গিয়েছে। ও তাকাল টিটির দিকে।
টিটি ওকে পাত্তা না দিয়ে বলল, “ও, এসে গেছিস? তাই বল। দেরি করিস না।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রিতুদার সামনে ওকে যেতেই হবে! কী আপদ! এমন একটা মানুষ। কিছু বললে, কী করে মুখের ওপর না করবে! আর মা? মাকে কী বলবে? মাহির নিজের মনটাকে শক্ত করল। এটাই ওর সমস্যা, বড্ড বেশি আগাম ভেবে নেয় ও। আগে কী বলে দেখা যাক। তারপর না হয় চিন্তা করবে। আর সৎ কাজ হলে করবে না কেন? মা-ও নিশ্চয় বুঝবে ব্যাপারটা। সারা জীবন আর কত অনিশ্চয়তার ভিতর থাকবে!
“ওই এসে গিয়েছে।”
টিটির গলা শুনে তাকাল মাহির। একটা হলুদ কালো বাইক এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে। যে ছেলেটা চালাচ্ছে, তার মুখটা চেনা। আন্ডারকাট চুল। সামনেটা ব্রোঞ্জের মতো রং। বাইকটা দাঁড় করিয়ে মাটিতে পা রেখে ছেলেটা লুকিং গ্লাসে নিজের চুল ঠিক করছে।
টিটি মাহিরকে ইঙ্গিত করে বাইকের দিকে এগিয়ে গেল।
ছেলেটা সোজা হয়ে বসে এবার তাকাল মাহিরের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে মুখটা হাসিতে ভরে গেল, “আরে! মাহিরদা!”
মাহির অবাক হল। ও ছেলেটার মুখ চেনে। নাম জানে না। কিন্তু ছেলেটা ওকে চেনে!
ছেলেটা বলল, “আমি নকু। মানে নকুলেশ্বর। আমি তোমায় চিনি। তুমি তো হেবি খেলো! গতমাসে ওই কবরডাঙায় খেলতে গিয়েছিলে না? হায়ার করে নিয়ে গেছিল তোমায়! আমার মামার বাড়ি তো ওখানে। আমি দেখেছিলাম। আমার খুব ফুটবল খেলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু…”
মাহির হাসল।
টিটি নকুকে কথা শেষ করতে দিল না। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আর ফ্যাচকাস না! ফুটবল খেলবে! গাঁজার ছিলিম চুষে ফুসফুস কয়লার বস্তা করে ফেলেছে! শালা! শোন, তুই সোজা রিতুদার অফিসে নিয়ে যাবি। এখন দাদা চেম্বারে আছে। আমি পরে যাব।”
