“কী হয়েছে বলবে তো?” নিশান বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা শুধু ওর নিজেদের ব্যাবসায় মন না দেওয়ায় আটকে নেই। অন্য কিছু ঘটেছে!
বাবা উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার, “সোনাঝুরি কি তোর একার জায়গা! যে যা করছে করুক, তুই কেন তার মধ্যে নাক গলাচ্ছিস? যাদের জুটমিল, যাদের জোনাক-বাড়ি তাদের ভাবতে দে না। তুই কেন এর মধ্যে থাকছিস? নিজের বড়মামার রক্তটা পেয়েছিস?”
“আরে, কী হল!” নিশান অবাক হয়ে গিয়েছিল। বড়মামা মানে সত্যেন মিত্র। নকশালের সময় খুন হয়ে গিয়েছিলেন। সোনাঝুরিতে সতু বললে একসময় সবাই চিনত। সতুমামার গল্পই শুধু ও শুনেছে। কারণ, চার ভাই আর দু’বোনের মধ্যে মা সবচেয়ে ছোট। সতুমামা যখন মারা যান তখন মা অনেক ছোট ছিল! কিন্তু পরিবারের মধ্যে এখনও সতুমামার কথা আলোচনা হয়। বলা হয়, কীভাবে সতু রাজনীতিতে ঢুকে নিজের জীবন নষ্ট করে ফেলেছিল!
কিন্তু সেই সতুমামার কথা বাবা তুলল কেন? নিশান এবার সামান্য শক্ত গলায় বলেছিল, “কী হয়েছে বলো তো! কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”
“কেন, বললে কী করবি? তাদের গলা কাটবি?” বাবা পায়চারি করতে-করতে তাকিয়েছিল নিশানের দিকে।
“কে কী বলেছে তোমায়? আমি কী করব, সেটা কি অন্য লোকে ঠিক করে দেবে?”
“মরতে চাস তুই?” বাবা সামনে এসে আচমকা চিৎকার করে উঠেছিল।
“বাবা আস্তে!” নিশান চাপা গলায় বলেছিল, “অনেক রাত হয়েছে। আশপাশের লোকজন শুনতে পাবে। কী হয়েছে তোমার?”
“তুই ওই তারক গুন্ডার সঙ্গে লাগতে গিয়েছিস? তোকে তো মেরে পুঁতে দেবে! আমায় আজ শয়তানটা ধরেছিল রাস্তায়। নিজের গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল আমায় দেখে। বলে, নিজের ছেলেকে সামলান। উন্নয়নে বাধা দিলে ওকে কিন্তু আর খুঁজে পাওয়া যাবে না! কে বলেছে তোকে উন্নয়নে বাধা দিতে? নিজেকে কী ভাবিস তুই?
নিশান তাকিয়েছিল বাবার দিকে। ফরসা মানুষ, লাল হয়ে গিয়েছে! কাঁপছে থরথর করে। ও বুঝতে পারছিল খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে বাবা! ওরও ভয় হয়েছিল। বাবার না আবার শরীর খারাপ করে!
নিশান বলেছিল, “তুমি ভয় পেয়ো না বাবা। কিছু হবে না। এভাবে কেউ এসে আমাদের হেরিটেজ নষ্ট করবে! মিল বন্ধ করে দিয়ে যাবে! এটা হতে পারে না। এতগুলো লোকের কী হবে? আর তার ওপর লোকটা তো দালালি করে মোটা টাকা কামাবে। এতগুলো মানুষকে শেষ করে ও নিজে টাকা রোজগার করবে? জানোয়ার ছাড়া এমন কেউ করে? এটা আমার সামনে দিয়ে হবে, আর আমি কিছু বলব না?”
“না, বলবি না! কে বলতে বলেছে তোকে এসব কথা!” বাবা গলা নামায়নি একটুও, “আমি চাই না তুই এসব করিস। আজ তারক এভাবে বলছে। কাল যদি কিছু করে? রাতবিরেতে বাড়ি ফিরিস তুই। কিছু হলে আমার আর তোর মায়ের কী হবে? নিজের কথাটাই শুধু ভাবছিস?”
নিশান সোজা তাকিয়েছিল বাবার দিকে। তারপর বলেছিল, “আর, মানুষগুলোর কী হবে? কঠিন সময়ে সবাই যদি পালায় তবে দাঁড়াবেটা কে? কেন সবকিছু আমাদের মুখ বুজে মেনে নিতে হবে? উন্নয়নের নামে কেউ যদি মানুষের ক্ষতি করে! নিজের পকেট ভরে! সেসব মেনে নিতে হবে? কেউ কিছু না বললে তো এবার বাকি সোনাঝুরিটাও নিলাম করে দেবে এই লোকগুলো! কারখানা বন্ধ করে হাউজ়িং হচ্ছে! বড় লোকেদের ইনভেস্টমেন্টের জায়গা এইসব ফ্ল্যাট। ক’জন থাকবে এখানে এসে? সব কিনে ফেলে রাখবে। বছরে কয়েকদিন আসবে মাত্র। আর ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা কী করবে? কোন কাজ করবে? মাঠের ঘাস কাটবে? দরোয়ানের পোশাক পরে সামান্য মাইনে নেবে? আর নিজের কথা কি সত্যি আমিই শুধু ভাবছি বাবা?”
“তুই… তুই… আমায় জ্ঞান দিচ্ছিস? তুই…” বাবা কথা খুঁজে না পেয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। তারপর মাকে উদ্দেশ করে বলেছিল, “তোমার ছেলেকে এসব করতে বারণ করে দাও। আমি কিন্তু এসব বরদাস্ত করব না। কেউ রাস্তায় সবার সামনে আমায় অপমান করবে, এসব কিন্তু আমি মেনে নেব না বলে দিলাম!”
বাবা দুদ্দাড় করে পা দাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিল। নিশান কী বলবে বুঝতে পারছিল না। নিঝুম রাত যেন আরও চেপে বসছিল চারিদিকে। দূরে ঝিঁঝি ডাকছিল। পাশের পুকুর থেকে কোলাব্যাঙের আওয়াজ রাতটাকে আরও যেন নিশুত করে দিচ্ছিল!
মা বলেছিল, “তুই এমন কেন? আমাদের কথা একবারও তোর মনে পড়ে না!”
নিশান বলেছিল, “কেন, বাবা তো বলেই গেল। সতুমামার রক্ত! মা, আর ভাল লাগছে না। খিদে পেয়েছে। বিজনদার সঙ্গে সেই মুড়ি আর তেলেভাজা খেয়েছিলাম কখন। খেতে দেবে?”
মা খেতে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সারাটা সময় গজগজ করে গিয়েছিল!
আজও সারাক্ষণ মা, বাবার কথাগুলোকেই নানাভাবে বলে যাচ্ছিল। নিশান খুব-একটা গা করেনি। বরং নিজের ঘরে বসে রাধিয়ার সঙ্গে মেসেজে কথা বলছিল!
মা ভেবেছিল গতকালের বকুনির পরে হয়তো নিশানের সুমতি হয়েছে, তাই বেরোয়নি সকালে। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে, দুপুরে এই বাদলার মধ্যে বেরিয়ে যাবে ও!
রাধিয়াও ওকে বারণ করছিল এই ঝড়বৃষ্টিতে বেরোতে, কিন্তু আজ রাধিয়ার কথাও শোনেনি! রাধিয়া কি তাতে রেগে গেছে! কে জানে! রাধিয়া ওকে ভুল বুঝলে বা রেগে গেলে খুব খারাপ লাগবে নিশানের।
বাঁধের ওপর থেকে রাস্তাটা নেমে গেছে ঢালু হয়ে। রাস্তার দু’দিকে ঘন ঝোপঝাড়! তার মধ্য দিয়ে মেঘলাদের বাড়িটা দেখতে পাচ্ছে নিশান।
