স্মরণ বাইরে বেরিয়ে বলেছিল, “কাঁদছ কেন? এভাবে কাঁদতে নেই! বড়রা কাঁদে না!”
“কী হল? এখনও মুড অফ!” স্মরণ সাবধানে জিজ্ঞেস করল!
নোঈ বলল, “জানিস তো আমার এক কাজ়িন দাদা ওখানেই থাকে। নিশান। ও সোনাঝুরিতে পলিটিক্যালি অ্যাক্টিভ। কিন্তু ওকে আমি কিছু বলি না, কারণ ও নিজে এইসব আবাসনের বিরুদ্ধে! কীসব নাকি কমিটি করছে সোনাঝুরিকে বাঁচাবে বলে! তাই ওকে বলেও লাভ হবে না। বরং হিতে বিপরীত হবে!”
স্মরণ বলল, “আমি চিনি ওকে! ম্যাগাজ়িন সূত্রে আলাপ। আর শোন, কাউকে বলার দরকার নেই! নিশান যদিও আমাদের ভুল বুঝছে, তাও এখনই কিছু বলার দরকার নেই। আমরা তো আর সব কিছু ধ্বংস করতে চাইছি না হোমওয়ার্ড বাউন্ডের মতো! আমাদের ভিশনটা আলাদা। তবে নিশান কিছু শুনবে না জানি। ডোন্ট মাইন্ড। ও ভাল ছেলে, কিন্তু হেভি গোঁয়ার! যাকগে। এখন আর মাথা খারাপ করিস না। যা হবে দেখা যাবে। এখন তো লুচি খা! মা যা আলুর দম বানায় না! আর নারকেলের মিষ্টিও বানিয়েছে। ঘ্যামা!”
নোঈ হাসল সামান্য। মাথা নাড়ল, “আর লুচি! আসলে কী জানিস, এক-একটা দিন এমন যায়! আজ আমার খারাপ লাগার দিন!”
স্মরণ দ্রুত একবার রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “প্যাঁও-ও এমন বলে। সত্যি এমন এক-একটা দিন যায়।”
“প্যাঁওকে বাড়িতে আনিসনি এখনও?” নোঈ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
“বাড়িতে?” স্মরণ হেসে বলল, “সবকিছু অত সহজ নয়! আসলে…”
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই টিং টং শব্দে ডোরবেলটা বেজে উঠল! স্মরণ চমকে উঠল একটু, “এখন আবার কে!”
নোঈ দেখল কাকিমাও রান্নাঘর থেকে মুখ বের করে উঁকি মারছেন।
স্মরণ উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। নোঈ বসেই দেখতে পেল লোকটাকে।
আসলে লোক নয়, একটা ছেলে। বেশ লম্বা। ভাল চেহারা! একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরা। পায়ে সাধারণ একটা চটি।
স্মরণ চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাইছেন?”
ছেলেটা নরম গলায় বলল, “আপনাদেরই চাইছি।”
“আমাদের? মানে?” স্মরণ যে সামান্য ঘাবড়ে গেছে, সেটা ওর গলার স্বরেই বুঝতে পারল।
ছেলেটা বলল, “আমি আপনাদের কাছে বলতে পারেন একজনের হয়ে এসেছি। সোনাঝুরির কাজের ব্যাপারে এসেছি!”
“সোনাঝুরি?” নোঈ এবার উঠে গিয়ে দাঁড়াল স্মরণের পাশে!
ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ। দরকারি কাজ। একটু যদি শোনেন আপনাদের ক্ষতি হবে না।”
নোঈ অবাক হল, “কোথা থেকে আসছেন? কে আপনি?”
ছেলেটা সময় নিল একটু। তারপর নরম স্বরে বলল, “আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি। আমার নাম মাহির।”
.
২৩. নিশান
বৃষ্টিতে আজ চারিদিক আবছা হয়ে আছে। পাঁচ হাত দূরের জিনিসও এখন দেখা যাচ্ছে না! তাও সাইকেল চালাতে বেশ মজা লাগছে নিশানের।
বর্ষাকাল খুব পছন্দ ওর! কেমন একটা ঘন রং হয়ে যায় সব কিছুর। জল যেন সমস্ত পৃথিবীর ভেতর থেকে একটা ডার্কার শেড বের করে আনে।
বাঁধের রাস্তাটায় উঠে সাইকেল চালানোই দায় হয়ে উঠছে। ও গায়ে মোটা বর্ষাতি পরে থাকলেও মুখটা তো খোলা। মুখ বেয়ে গলার কাছ অবধি জল চলে যাচ্ছে। বারবার চোখ আর ভুরুর ওপর থেকে জল সরাতে হচ্ছে। অন্য কেউ হলে এই বৃষ্টিতে নিশান আসত না, কিন্তু মেঘলার জন্মদিন আজ! না এলে পাগলিটা খুব রাগ করবে। কষ্টও পাবে! মেঘলার প্রতি একটা অদ্ভুত মায়া আছে নিশানের।
নিশান সাইকেল থেকে নেমে পড়ল এবার। বৃষ্টির আলপিন তেরছাভাবে এসে মুখে ফুটছে। এভাবে সাইকেল চালানো যায় না!
সাইকেল হাঁটিয়ে-হাঁটিয়ে নিশান এগোতে লাগল সামনের দিকে। বর্ষাতির তলায় পিঠে ব্যাগ আছে ওর। মেঘলার জন্য উপহার আছে ওতে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মা বারণ করছিল আসতে। কিন্তু নিশান শোনেনি। আসলে নিশান কারও কথাই খুব একটা শোনে না। আজকাল বাবাও তাই কথা বলা একরকম বন্ধ করে দিয়েছে। খুব দরকার না পড়লে বাবা আর নিশান দু’জন দু’জনকে এড়িয়েই চলে। কারণ, কথা হলেই ঝগড়া হয়। এই যেমন গতকাল রাতেই খেতে বসে হয়েছে একচোট।
অন্য দিন বাবা দশটার মধ্যে খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে নিশান দেখেছিল খাওয়ার ঘরে মায়ের সঙ্গে বাবাও বসে রয়েছে!
নিশানের এমনিতে বাড়ি ফিরতে রাত এগারোটা হয়। কিন্তু গতকাল আরও রাত হয়ে গিয়েছিল। ওরা যে একটা মঞ্চ তৈরি করেছে, ‘সেভ সোনাঝুরি’, তার কিছু লিফলেট আর ব্যানার তৈরির কাজ ছিল। বাড়িতে ঢুকে অত রাতে বাবাকে বসে থাকতে দেখে ও অবাকই হয়েছিল।
ও ঘরে ঢুকতেই মা বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “এইমাত্র এল ছেলেটা, এখনই কিছু বোলো না।”
“এখন বলব না?” বাবা যে খুব রেগে আছে, সেটা গলার আওয়াজ শুনেই বুঝে গিয়েছিল নিশান।
ও আর নিজের ঘরের দিকে না গিয়ে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসে তাকিয়েছিল বাবার দিকে। যা শোনার এখনই শুনে নেওয়া ভাল!
নিশান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার হার্টের সমস্যা, এই রাত বারোটার সময় জেগে আছ কেন?”
বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “আমি মরি কি বাঁচি, তাতে তোর আগ্রহ আছে?”
“কী হয়েছে?” নিশান টেবিলে আঙুল দিয়ে দাগ কাটতে-কাটতে বলেছিল, “এমন করে বলছ কেন?”
বাবা উত্তেজিত গলায় বলেছিল, “তুই কী পেয়েছিস? এভাবে কি তোর জীবন যাবে? আমার ব্যাবসাটা কার জন্য করেছি? আর কতদিন এভাবে সমাজসেবা চলবে?”
