“তবে রে,” নোঈ ব্যাগটা তুলল, “সারাক্ষণ খালি বাজে কথা!”
কাকিমা নোঈর হাত ধরে বললেন, “চলো, ঘরে চলো। আমাদের ছোট বাড়ি। একটু অসুবিধে হবে!”
স্মরণ বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কেন অসুবিধে হবে? আমাদের এখানে কি ও থাকতে আসছে নাকি! কথা বলো একটা এমন!”
নোঈ হাসল। কিন্তু শহরের মধ্যে এমন একটা বাগানঘেরা বাড়িতে থাকতে পারলে ওর খারাপ লাগত না! ওদের ভবানীপুরের ফ্ল্যাট যেন কেমন কাটাকুটি খেলার ঘরের মতো!
ঘরে ঢুকেই বসার জায়গা। মাটিতে পাতা মোটা গদি। কুশন দিয়ে সাজানো! বারান্দাতেই জুতো খুলে রেখেছিল নোঈ। এবার গদিতে বসে পড়ল। দেখল, স্মরণ ওইখানে ওর পাশে না বসে সামনের একটা ছোট চৌকোমতো গদিতে বসল।
নোঈ মাথা ঘুরিয়ে দেখল ঘরটা। চারিদিকে শুধু বই রাখা! আর নানান মাপের ছোটবড় গাড়ির মডেল সাজানো!
নোঈ জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কার গাড়ি?”
“কেন? আমার!” স্মরণ এমন করে বলল, যেন নোঈ বোকার মতো জিজ্ঞেস করেছে!
“এই বয়সে গাড়ি? কী করিস? খেলিস?”
“খেলব কেন? জমাই! ভিন্টেজ কার্স। দারুণ। সব স্কেল ডাউন ডাই কাস্ট মডেল। পুরো অরিজিনালের মতো!”
নোঈ হাসল, “পাগল কি গাছে ফলে?”
স্মরণ পালটা বলল, “না, ভবানীপুরে ফলে!”
“কেন, আমি কী করলাম?” নোঈ অবাক হল।
“অন্যের অফিসে গিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদে, আবার জিজ্ঞেস করছিস!”
“ভাল হবে না কিন্তু স্মরণ!” নোঈ আবার ব্যাগ তুলল।
“আঃ, বাবু তুই চুপ করবি! নোঈ, তুমি কিছু মনে কোরো না ওর কথায়! আর এমন গাড়ি কিনে কত টাকা যে নষ্ট করে!” কাকিমা মাথা নাড়লেন, “যাই হোক, তোমরা কথা বলো। আমি খাবার নিয়ে আসি।”
“খাবার!” নোঈ অপ্রস্তুত হল, “খাবার কেন?”
“আরে, খাবার কেন মানে? তারক চক্কোত্তি তোমার… ইয়ে তোর মাথা ঘেঁটে দিয়েছে নাকি? নাকি ওই বান্ধবী দিল!” স্মরণ হইহই করে উঠল, “তুমি আনো তো মা!”
কাকিমা চলে যেতেই নোঈ চাপা গলায় বলল, “এভাবে খাওয়া-দাওয়া কেন? আর খালি তারক চক্রবর্তীর কথা তুলছিস কেন?”
“কারণ,” স্মরণ এবার সিরিয়াস গলায় বলল, “লোকটাকে আমি মাথা থেকে বের করতে পারছি না! কেমন করে তাকাচ্ছিল মনে আছে? জানোয়ার পুরো!”
নোঈ চোয়াল শক্ত করল। স্মরণ ঠিক বলেছে! লোকটার যে বাজে দৃষ্টি, লোকটাকে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছিল! এই সব লোকগুলো কেমন একটা ধাঁচের হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন!
লোকটার সামনে বসতেই নোঈর অস্বস্তি লেগেছিল। লোকটা সোজা ওর বুকের দিকে তাকিয়েছিল। আজ জিন্স আর একটা নীল সাদার ডোরাকাটা গোল গলার টিশার্ট পরেছে নোঈ!
ও ব্যাগটাকে বুকে জড়িয়ে বসেছিল।
তারক লোকটার বড়সড় চেহারা। মাথায় বিশাল টাক। কপালে তিলক কাটা। একটা স্টিলের বইয়ের মতো দেখতে কৌটো খুলে জরদা খেয়েছিল সময় নিয়ে। কিন্তু গোটা সময়টা চোখ সরায়নি নোঈর দিক থেকে!
জরদা মুখে পুরে হাতটা চেয়ারের হাতলে রাখা একটা তোয়ালেতে মুছে তারক বলেছিল, “আপনি চাকরি করেন কেন? আপনার তো ফিল্মে নামা উচিত! নিদেনপক্ষে সিরিয়াল! বলেন তো, আমি বলে দিই কাউকে। আমার চেনাজানা আছে।”
স্মরণ মাঝখান থেকে বলেছিল, “আসলে আমরা এসেছিলাম ওই জুট মিল আর…”
“জানি, জানি,” খেঁকিয়ে উঠেছিল তারক, “দেখছ কথা বলছি, অত নাক গলানোর কী আছে!”
নোঈ চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “আমরা ওই কাজেই এসেছিলাম তারকবাবু, পুরো কাজটা…”
তারক এবার হেলান দিয়ে বসেছিল, “ও আপনার বুঝি ফিল্মে নামার ইচ্ছে নেই! ঠিক আছে, তা হলে আর কী বলি?”
“ওই মিলের আর জোনাক-বাড়ির ব্যাপারটা…” নোঈ চেষ্টা করেছিল আবার।
এবার আর আপনি নয়, সোজা তুমিতে নেমে এসেছিল তারক। ঝুঁকে পড়ে বলেছিল, “তোমাদের মতো বাচ্চাদের সঙ্গে আমি এই নিয়ে কথা বলব? তোমাদের ওই পুশকিনবাবু কই? আমি খবর রাখি না ভেবেছ? অন্য যারা কাজ নেবে তারা রেসপন্সিবল লোকজনদের পাঠাচ্ছে! আর তোমাদের অফিস এসব নভিসদের পাঠাচ্ছে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে! আমার মান-সম্মান নেই?”
স্মরণ বলেছিল, “আমি আগেই এসেছিলাম। মোতিবাবুর সঙ্গে কথা বলে গিয়েছি। কিন্তু, মানে একটা গাইডলাইন না পেলে…”
“কীসের গাইডলাইন!” তারক বলেছিল, “গান্ডু নাকি তুমি? এখানে রেট বাঁধা! বুঝেছ? আর সেটা না জেনে এলে আমি কী করতে পারি। প্লাস বড় কাউকে পাঠাও! তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে কলেজ থেকে রিইউনিয়নের চাঁদা চাইতে এসেছ!”
“আপনি একবার কথাটা শুনুন,” নোঈ বলার চেষ্টা করেছিল।
“তুমি তো পার্ট করবে না সিনেমায়, তবে আর কী শুনব। এমন চেহারা নিয়ে এসব বাজে কোম্পানিতে কাজ করছ! কোনও মানে হয়?”
“প্লিজ়, মিস্টার চক্রবর্তী এভাবে বলবেন না,” নোঈ উঠে দাঁড়িয়েছিল।
“তবে কীভাবে বলব? আমার একটা সম্মান নেই? যার-তার সঙ্গে আমি কথা বলব বলে মনে হয়?” তারক চোয়াল শক্ত করেছিল, “সামনের উইকের মধ্যে তোমাদের অফিসের বড় কেউ এসে যোগাযোগ না করলে দেখব তোমরা কী করে এখানে কাজ করো! নাও, এখন কাটো! শালা…”
অপমানে নোঈর মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। এতটা ইতর কেউ কী করে হতে পারে! স্মরণ কিছু বলতে গিয়েছিল। কিন্তু নোঈ স্মরণের হাত ধরে টেনে ওকে ঘর থেকে বের করে এনেছিল! এসব মানুষের সামনে কিছু বলার মানে হয় না! রাগে কষ্টে জল এসে গিয়েছিল ওর চোখে!
