“তাও স্যার। আমাদের দিক থেকে একটা রিপ্রেজ়েন্টেশন হয়ে থাকা ভাল,” নোঈ সোজা তাকিয়েছিল, “আপনি আমার জন্য এত করেছেন, আমি এটুকু চেষ্টা করব না!”
“আরে!” এবার পুশকিন সোজা হয়ে বসেছিল। হেসেওছিল সামান্য, “বাচ্চা মেয়ের মতো হয়ে গেল না কথাটা? আমি কী করেছি? কিচ্ছু না! তুমি নিজের যোগ্যতায় কাজ পেয়েছ! আর এটা কর্পোরেট সেক্টর! ডোন্ট মেক ইট পারসোনাল।”
নোঈ একগুঁয়ে বাচ্চার মতো বলেছিল, “আমি যাব স্যার, প্লিজ় হ্যাঁ বলুন!”
“আচ্ছা মেয়ে তো! আমি অন্য প্ল্যান ভাবছি।”
“প্লিজ়!” নোঈ তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে।
একটা জিনিস নোঈ বোঝে, পুশকিন ওকে পছন্দ করে। না, এটা ও ভাবতে চায় না। কিন্তু তাও ভেবে ফেলে মাঝে মাঝে। মেয়ে হিসেবে নিজের ইনস্টিংক্টটাকে তো আর অস্বীকার করতে পারে না!
পুশকিনের ওর দিকে তাকানো, হাসি, ওকে ইন্ডাল্জ করা, সবেতেই একটা ভাললাগা মিশে আছে, সেটা বুঝতে পারে নোঈ। আর এটাও বোঝে, পুশকিন সেটা লুকোনোর চেষ্টা করে। অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করে!
নোঈর খারাপ লাগে না, বা সত্যি করে বললে বলা উচিত ভাল লাগে ব্যাপারটা। আর দিনে-দিনে সুড়ঙ্গ কাটার মতো ভাললাগাটা যেন আরও গভীর হচ্ছে! নিজেকে এই নিয়ে বুঝিয়েছে নোঈ। বলেছে এসব ঠিক নয়। কত বড় ওর চেয়ে পুশকিন! একবার বিয়ে হয়ে গেছে! বাড়িতে সবাই অন্যভাবে ওকে চেনে।
কিন্তু মনের আর-একটা দিক ছোট্ট খোঁচা মেরে বলেছে, এসব তো মিডল ক্লাস মেন্টালিটি। কাউকে ভাল লাগলে বয়সের কী কাজ সেখানে! নোঈ বোঝে আমাদের মনের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, যা আমাদের জটিলতার দিকেই টানে! ও বোঝে জটিলতার একটা আলাদা মাধ্যাকর্ষণ আছে! একটা অদ্ভুত চোরা নেশা আছে! যা কিছু ‘ফ্রাউন্ড আপন’, মানুষ সেটার দিকেই কেন কে জানে বেঁকে যায়! ও নিজেও সেই বাঁকের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। টান টের পাচ্ছে! আর অনেকটা সেই টানই ওকে পুশকিনের ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বলে ওর চোরা মনটা বুঝতে পারছিল!
পুশকিন বলেছিল, “স্মরণকে নিয়ে যেয়ো। একা যেয়ো না। আর ডোন্ট এক্সপেক্ট এনি ওভারটাইম। কেমন?”
নোঈ ঘর থেকে বেরোনোর আগে চশমাটা ঠিক করে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে, তারপর কেটে-কেটে বলেছিল, “আই অ্যাম নট এক্সপেক্টিং এনিথিং।”
“তুমি… মানে তুই এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি?” স্মরণ আবার ব্যাগ ধরে টানল ওকে।
নোঈ বলল, “যাচ্ছি, যাচ্ছি, দাঁড়া। আগে বাগানটা দেখি ভাল করে।”
স্মরণ চোখ গোল করে বলল, “দূর, বাগান আর নেই। জঙ্গল হয়ে গেছে। দেখছিস না কী হয়ে আছে? আমি আর সময় পাই না পরিষ্কার করার। আগে এক মালিকাকু আসত। কিন্তু মাসে তিন হাজার টাকা আর অ্যাফোর্ড করতে পারি না রে। প্লাস ওই যে বললাম, মা কিছু কাটতেও দেয় না!”
ঘন সবুজের একটা গন্ধ থাকে। এই গাছপালার মধ্যে দাঁড়িয়ে সেটা পেল নোঈ। আর কেন কে জানে হঠাৎ পুশকিনের কথা মনে পড়ল। পুশকিন এমনই একটা পারফিউম ব্যবহার করে। কেমন একটা ঘন জঙ্গল মাখা গন্ধ! আজকাল মাঝে মাঝে এই গন্ধটা পায় নোঈ। রাতে নিজের ঘরে বসে, স্নান সেরে বেরোনোর পরে বা আচমকা বৃষ্টি এলে কী করে যেন এই গন্ধটা পায় ও। কেমন একটা করে ওর শরীর। কাঁটা দিয়ে ওঠে! বুকের কাছটা কেমন একটা ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। ও ভাবে এটা কী করে হল! জয় চলে যাওয়ার পরে তো ভেবেছিল আর কোনওদিন কারও জন্য এমন কিছু মনে হবে না ওর। কিন্তু সেখানে এমন হল কী করে? কোন ফাঁক দিয়ে এমন ছোট্ট এই গাছটা বেরোল মাটি ভেদ করে! ওর এও মনে হয়, এটা কোনও রিবাউন্ড নয় তো!
আসলে পুশকিন খুব শান্ত, চুপচাপ ধরনের। রাগ করে না। ভাল করে কথা বলে। আর কেমন একটা একা-একলা মানুষ যেন! পুশকিনকে দেখলে মনে হয়, সব কিছু করছে, কিন্তু তাও যেন কিছু করছে না! সব কিছুতে আছে, কিন্তু যেন কোনও কিছুতেই নেই! এমন একটা মানুষের দিকে কেন টান অনুভব করছে নোঈ! আজকাল পুশকিনের সামনে গেলে ও সচেতন হয়ে পড়ে। মানুষটা কিছুতেই যেন ওর মনের ভাব বুঝতে না পারে!
বাগানের মধ্যে দিয়ে ছোট নুড়ি ফেলা রাস্তা চলে গেছে বাড়ির দিকে। সেই পথে এগোল নোঈ।
বিকেল শেষ হয়ে আসছে। মেঘও করছে আবার। বৃষ্টি নামবে মনে হয়! নুড়িপথ থেকে দু’ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে বারান্দায়। নোঈ বারান্দায় উঠে দেখল দুটো বেতের মোড়া রাখা আছে। সবটাই কেমন একটা ঘন সবুজ ছায়া দিয়ে ঢাকা! বারান্দায় একজন বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে ঝোলানো টবের অর্কিডগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন।
“মা, এই যে নোঈ!” স্মরণ বলল।
“আরে, এসো,” ভদ্রমহিলা পেছন ফিরে হেসে এগিয়ে এলেন।
নোঈ এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল, “কাকিমা, আমি নোঈ!”
“আরে, প্রণাম করতে হবে না!” কাকিমা হাসলেন। নোঈর থুতনি ধরে আলতো করে চুমু খেলেন। বললেন, “বাব্বা, কী সুন্দর দেখতে তোমায়!”
নোঈ লজ্জা পেয়ে গেল। এভাবে কেউ বললে লজ্জা তো করবেই! ও বলল, “সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয় কাকিমা… এসব তো আর কারও হাতে থাকে না!”
স্মরণ বলল, “ঘরে চলো। নোঈর মেজাজ আজ হেভি খারাপ! দুটো ঝামেলা করে এসেছে! বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে আরও রেগে যাবে!”
“ভ্যাট,” নোঈ আলতো করে একটা চড় মারল স্মরণকে, “খালি বাজে কথা!”
স্মরণ চোখ বড় বড় করে বলল, “দেখছ তো, এখনই মারধর শুরু করেছে আমায়। এবার তোমাকেও মারবে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে!”
