“তোমার সঙ্গে হলে তুমি এমন ফিলজ়ফিকাল হতে পারতে?” নোঈ সোজা তাকাল স্মরণের দিকে।
স্মরণ হাসল। বলল, “আচ্ছা, আমার কথা বাদ দাও। আমি বেশি বকবক করি। প্যাঁও তো তাই রেগে যায় আমার ওপর। শোনো, একটা কথা বলি, মায়ের সামনে কিন্তু প্যাঁও-এর কথা বোলো না। মা এসব জানে না কিন্তু।”
নোঈ রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল, “তুই একটা… সরি… মানে তুমি একটা পাগল।”
“তুইটাই তো ভাল!” স্মরণ হাসল, “আমিও তুই বলি। চল, বাড়ি চল।”
পাড়াটা ছোট। ফাঁকা। পুরনো বাড়িঘর চারিদিকে। কেমন একটা রংচটা ধরনের। কেমন যেন ছোট, মাথা নিচু আর লাজুক! দেখলেই মায়া হয়, এমন।
রাস্তার দু’পাশে বেশ বড়-বড় গাছ। ফুল হয়ে আছে। বড়রাস্তা থেকে বেশ ভেতর দিকে পাড়াটা।
স্মরণ হাঁটতে-হাঁটতে আশপাশের গাছগুলো দেখাচ্ছে আর বলছে কোন গাছটার কী নাম। নোঈ এসব জেনে কী করবে, কে জানে! কিন্তু স্মরণের উৎসাহ দেখে ভাল লাগছে।
ও আশপাশের বাড়ি-ঘরগুলো দেখতে-দেখতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এত গাছ চেনো কী করে?”
স্মরণ বলল, “আরে, আমার বাবা বোটানিস্ট ছিল। সারাক্ষণ গাছপালা নিয়ে থাকত। আমাদের বাড়িটা একতলা, ছোট। কিন্তু দেখবে কতরকমের গাছপালা আছে। বাবার লাগানো সব। এখন যদিও খুব একটা যত্ন করা হয় না। জঙ্গল মতো হয়ে গেছে। তাও মা কাটতে দেয় না।”
নোঈ তাকাল স্মরণের দিকে। ছেলেটা হাসিমুখেই কথা বলছে। কিন্তু তাও কথাগুলোর তলায় একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে!
স্মরণদের বাড়িটা সত্যি ছোট। একটা মুঠোর মধ্যে যেন ধরা যায়। কিন্তু কী মিষ্টি লাগল নোঈর। পাহাড়ি এলাকায় কাঠের ছোট বাড়ি যেমন হয় অনেকটা সেই ধাঁচের বাড়ি, কিন্তু ইট-সিমেন্টের! আর সামনে কত গাছপালা!
স্মরণ বলল, “বাবা কিনেছিল জায়গাটা। নিজেরা ছোটবেলায় চিরকাল খুব ঘিঞ্জি, পুরনো বাড়িতে কষ্ট করে ছিল বলে, নিজে জায়গা কিনে বাড়ি করতে চেয়েছিল! তাই ছোট্ট এই বাড়ি তৈরি করে বাকি জায়গায় গাছ লাগিয়েছিল। ছোট থেকেই বাবা গাছ খুব ভালবাসে! পরিবেশটা ভাল না? তোমায় এই যে জোর করে নিয়ে এলাম, ভাল লাগল না এটা? এখানে একদিন তোমায় জোনাকি দেখাব! দেখবে আমাদের শহরেও কত জোনাকি আছে!”
জোনাকি? এখানে! স্মরণটা পাগল নাকি? নোঈ হাসল।
সোনাঝুরি থেকে এসে নোঈ ভেবেছিল বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু স্মরণই ওকে বলেছিল ওর বাড়িতে আসতে। কেন বাড়িতে আসতে বলেছিল, সেটা বলেনি। কিন্তু জোর করেছিল একরকম। নোঈ প্রথমে একটু আপত্তি করলেও পরে মেনে নিয়েছিল। সবে বিকেল। কী করবে এখন বাড়ি গিয়ে! আজকাল বাড়িতে মা সারাক্ষণ বলে, “বিয়ে কর, বিয়ে কর!” আর আজ তো শ্বেতা এসে ওর বিয়ের কার্ড দিয়ে গেছে। সঙ্গে আরও কী-কী বলে গেছে ভগবান জানে! শ্বেতা যেরকম মুডে ছিল, কিছু বলে গেছে তো নিশ্চিত। তাই ও ভালই করেছে বাড়ি না গিয়ে।
আজ দিনটাই ভাল নয়। একটু আগে শ্বেতার সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেল। তার আগে সোনাঝুরিতে গিয়ে তারক চক্রবর্তীর অসভ্যতার সামনে পড়তে হয়েছিল। এক-একটা দিন যায় যাতে কিছুই ঠিকঠাক হয় না। নিজেকেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে নোঈর। ওকে তো বারণ করেছিল পুশকিন ওখানে যেতে। কিন্তু ও নিজেই জোর করে গিয়েছিল। পুশকিনের কথা শুনলেই হত।
হেডঅফিস থেকে ওইরকম কড়া চিঠি পাওয়ার পরে পুশকিন বেশ চিন্তিত ছিল ক’দিন। সেটা দেখে ভাল লাগেনি নোঈর। পুশকিন ওকে এই চাকরিটা পেতে সাহায্য করেছে, সেটা ভাল করেই ও জানে। সেখানে লোকটাকে হেডঅফিস থেকে একরকম শোকজ় করা হয়েছে দেখে ওর খারাপ লাগছিল।
গত পরশু নিজের চেম্বারে বসে ছিল পুশকিন। তখন দরজা নক করে ঘরে ঢুকেছিল নোঈ।
“কিছু বলবে?” পুশকিন তাকিয়েছিল ওর দিকে। সামনে একগাদা কাগজ খোলা ছিল। পুশকিনকে কেমন এলোমেলো লাগছিল নোঈর। মনে হচ্ছিল গালটা ধরে চুল আঁচড়ে দেয়!
“একটা কথা ছিল, স্যার,” নোঈ সাবধানে বলেছিল কথাটা।
এলোমেলো হলেও পুশকিনকে অন্যদিনের চেয়ে বেশ গম্ভীর লাগছিল! একটা পেপারওয়েট নিয়ে নিজের মনে আস্তে-আস্তে ঘোরাচ্ছিল পুশকিন। “বলো, বসে বলো…” সামনের চেয়ারের দিকে হাত তুলে দেখিয়েছিল পুশকিন।
নোঈ বসে ঠোঁটটা চেটে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে। এলোমেলো চুল, আলগা টাই! ও খেয়াল করেছিল সন্ধেবেলায় পুশকিনের গালটা কেমন গাঢ় নীল হয়ে যায় দাড়ির জন্য! নোঈ দেখেছে পুশকিনের দাড়ি বেশ ঘন।
“ইয়েস!”
“আসলে স্যার, আমি ভাবছিলাম সানডে আমি সোনাঝুরি যাব। তারক চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলতে। স্মরণ গিয়ে সেই যে খবর নিয়ে এসেছিল তারপর তো আমরা আর সেভাবে ফলো আপ করিনি। তাই ভাবছিলাম আমি যাব।”
“গিয়ে?”
“গিয়ে লোকটাকে বোঝাব যে, আমরাও ইন্টারেস্টেড। আইকাদিরাই শুধু ইন্টারেস্টেড, সেকথা ভাবা তো ঠিক নয়!” নোঈ চশমাটা ঠিক করেছিল।
পুশকিন বলেছিল, “লোকটা ঘুষ চায়। জানো, ঘুষ দেওয়া কতটা বিপজ্জনক! না আমি মরালিটির কথা বলছি না। বলছি প্র্যাকটিকাল ব্যাপার। লোকটা ক্যাশ চাইবে। সঙ্গে ফ্ল্যাটও চাইবে। কিন্তু আমরা সেটা দেব কী করে? ট্যাক্সে দেখাব কী করে এত টাকা! আর লোকটাকে সেটা দিলেই যে কাজ হবে, এমনটাও তো নয়! প্লাস আর-একটা সমস্যা আছে!”
“কী সমস্যা?”
“যার জিনিস সেই তো বিক্রি করবে না! তা হলে?”
