নোঈ কিছু বলার আগেই ফোনটা বেজে উঠল ওর। ও ব্যাগ থেকে বের করল মোবাইলটা। আরে, শ্বেতা ফোন করেছে! মেয়েটার বাড়িতে সেই যে নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছিল, তারপর থেকে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চণ্ডীগড় গিয়ে কেমন যেন ভুলে গিয়েছে। সেই মেয়ে হঠাৎ ফোন করল! তাও আবার কলকাতার নাম্বার থেকে? কেন? কী ব্যাপার! ও কি ফিরে এসেছে?
ফোনটা ধরল নোঈ, “আরে, কী খবর তোর?”
শ্বেতা ওদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফোনের মধ্যে দিয়ে। বলল, “আমার কী খবর! বাজে মেয়ে। আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড সেটা ভুলে গিয়েছিস, না?”
নোঈ বলতেই পারত যে, ও বেশ কয়েকবার হোয়াটসঅ্যাপে ওকে পিং করেছে। ই-মেল করেছে। কিন্তু শ্বেতাই ওকে কোনওরকম পাত্তা দেয়নি! উত্তর দেয়নি। কিন্তু এখন সেটা বলল না। ও একটা জিনিস বুঝতে পারছে। জীবনে একটা সময়ের পরে বন্ধুত্বগুলো সব পালটে-পালটে যায়। সেটা নিয়ে সেন্টিমেন্টাল হওয়ার বা মনখারাপ করার কোনও কারণ ও দেখে না। আর সত্যি বলতে কী, এই চাকরিতে জয়েন করে কাজের মধ্যে ডুবে ও ভাল আছে! পুরনো জীবনটা ওকে যে-কষ্ট দিয়েছিল, সেটা আর সহ্য করতে হচ্ছে না!
নোঈ শব্দ করে হাসল। তর্কে যেতে ইচ্ছে করছে না। শ্বেতা নিজের দায়টা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যদি খুশি হয় হোক!
“শোন,” শ্বেতা বলল, “আমার সামনে বিয়ে। সেই জন্য নেমন্তন্ন করতে এসেছিলাম তোদের বাড়িতে। শুনলাম তুই অফিসের কাজে বেরিয়েছিস! আমি নেমন্তন্ন করে বেরিয়ে এসেছি। বাব্বা সানডেতেও কাজ! কী করছিস রে!”
শ্বেতার বিয়ে! সেটা ও এখন জানতে পারছে! ওকে কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করতে এসেছে মেয়েটা! এসব কী! ওর সঙ্গে এমন সম্পর্ক তো ছিল না! নোঈর খারাপ লাগল বেশ। কিন্তু সেটা ও প্রকাশ করল না। কারণ, ও শ্বেতার গলা শুনে বুঝতে পারছে ওর খারাপ লাগল কি ভাল লাগল, তাতে শ্বেতার কিছু যায় আসে না!
“দারুণ!” নোঈ হাসল, “কার সঙ্গে?”
“কেন তুই জানিস না?” শ্বেতার গলাটা কেমন যেন পালটে গেল এবার।
“মানে… ওই ববি?” নোঈ সাবধানে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” শ্বেতা সামান্য থামল, তারপর বাঁকা গলায় বলল, “তোর গা জ্বলে গেল, তাই না?”
“মানে?” নোঈ শ্বেতার গলায় শ্লেষ শুনে কেমন যেন থমকে গেল।
শ্বেতা বলল, “তুই আমার সঙ্গে যা করেছিস, তারপর আমার উচিত ছিল তোকে নেমন্তন্ন না করা!”
“মানে?” নোঈ ঘাবড়ে গেল, “কী বলছিস তুই?”
শ্বেতা বলল, “আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে তুই এটা করতে পেরেছিলি? কেন তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি ভেবে দেখেছিস কখনও? জয় বেঁচে গেছে তোকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে!”
“তুই কী বলছিস?” নোঈ স্থান কাল ভুলে চিৎকার করে উঠল। দেখল, স্মরণ হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে ওকে!
শ্বেতা বলল, “ববি বলেছে আমায়, তুই ওর পেছনে পড়েছিলি!”
“কী!” নোঈ বিহ্বল হয়ে গেল। এটা কী বলছে শ্বেতা!
শ্বেতা বলল, “ববি বলেছে আমায়! ছিঃ। আমি আজ আসতেও চাইনি। ববিই আমায় আসতে বলেছে তোদের বাড়ি। নেমন্তন্ন করতে বলেছে।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। হাত-পা কাঁপছে ওর, চোখ জ্বালা করছে। ববি এসব বলেছে! এ তো বিনা মেঘে বজ্রপাত! এমনও হয়! এতদিন দেখা নেই, যোগাযোগ নেই, সেটা এই কারণে! ববি এমন করে মন বিষিয়ে দিয়েছে শ্বেতার! ববি ওকে কী বলেছিল, শ্বেতা কষ্ট পাবে বলেই শ্বেতার সামনে নোঈ তা কোনওদিন বলেনি। সেখানে ববি এমনটা করতে পারল! কেন করল এমন!
নোঈ বলল, “যা বললি, ভুল বললি। এটাই শুধু বলব। আর একটা কথাও আমি বলব না এ বিষয়ে। আমায় ছোট থেকে এই চিনলি! আর কিছু বলার নেই। আমার হোয়াট্সঅ্যাপে এখনও কিন্তু ববির মেসেজ সেভ করা আছে। চাইলে স্ক্রিন শট পাঠাতে পারি। বাট ক্যান ইউ হ্যান্ডেল দ্যাট? বাই।”
ফোনটা কেটে চোয়াল শক্ত করল নোঈ। চোখের জ্বালাভাবটা আর নেই। বদলে একটা রাগ মাথার ভেতরে পাক খাচ্ছে! স্মরণ ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমার বাড়ি যাবে তা হলে?”
“কেন যাব না?” ফুঁসে উঠল নোঈ, “তোমরা কী ভাবো আমাকে?”
“আমরা?” স্মরণ কী বলবে বুঝতে পারল না।
“নয়তো কী? কেন মনে হল যাব না? কীসের জন্য মনে হল? আমি কি বলেছি যাব না? আমার কথার দাম নেই?” নোঈ ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে থামল।
স্মরণ সময় নিল একটু। তারপর আচমকা ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, “ঘ্যামা লাগছিল কিন্তু! খচে গেলে মাইরি, ডোন্ট মাইন্ড, দারুণ লাগে তোমায়! যে-মেয়েটা ফোন করেছিল তাকে যা ঝাড়লে… সামনে থাকলে বোধহয় কেলিয়েই দিতে, না? এমন একটা ব্র্যান্ডের ঝাঁটা আর ঝাড়ন মার্কেটে আনলে হয় না? ‘নোঈ ঝাড়ন’!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। ছেলেটা এমন করে বলল যে, এত রাগের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল ওর। ও মাথা নাড়ল, তারপর বলল, “শ্বেতা আমার ছোটবেলার বন্ধু। তারপরও ও এমন কথা বলে কী করে? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আমায় এমন করে বলল? বলে ওর বয়ফ্রেন্ডকে আমি নাকি ভাঙিয়ে নিতে চেয়েছি! ভাবতে পারো?”
স্মরণ ভাঙা গাড়িটার গায়ে হেলান দিল এবার। আর-এক মুঠো ফুল হাতে তুলে নিয়ে বলল, “এই দ্যাখো, ঝরা ফুল। গাছ কি আর একে নিজের ফুল ভাবে? ভাবে না! তুমিও ওকে বন্ধু ভেবো না। মানুষের সম্পর্কগুলো এমনই হয়। তারা আসে ঝরে পড়ার জন্যই। এমন করে মনখারাপ করার মানে নেই নোঈ।”
