স্মরণ বলল, “ভাবো একবার, এই শহরের দক্ষিণে একসময় ঘন জঙ্গল ছিল! দেখবে মাঝে মাঝে বড় আর বুড়ো কিছু গাছ তুমি দেখতে পাবে কলকাতায়! যেমন ধরো, টালিগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের সামনের যে-ক্রসিং। যেখান থেকে একটা রাস্তা লেক হয়ে গোলপার্কের দিকে বেঁকে গেছে, সেখানে একটা বটগাছ আছে! তারপর গল্ফ গ্রিনের কাছে আছে। লেকেও আছে। কত পুরনো আর বড় সব গাছ! দেখলেই আমার গা ছমছম করে! চোখ বন্ধ করে আমি ভাবি বহু পুরনো সময়ে এই দিকের কলকাতাটা কেমন ছিল! তুমি ভাবো না?”
নোঈ হাসল। মাথা নাড়ল।
স্মরণ চোখ বড় করল। বলল, “প্যাঁও-ও ভাবে না! কেন কে জানে!”
নোঈ হাতের মুঠোয় ধরা ফুলগুলো নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকল। কী অদ্ভুত গন্ধ! ঝিম হয়ে আসে শরীর!
স্মরণ বলল, “এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? আমার বাড়ি যাবে না?”
নোঈ হাসল। কথাটা ঠিক। স্মরণের বাড়ি যাবে বলেই ও এসেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম রবিবার আজ। কিন্তু ওর ছুটি ছিল না। অফিসের কাজে সোনাঝুরি গিয়েছিল। হেড অফিস থেকে বেশ একটা কড়া করে চিঠি এসেছে অফিসে। এতদিন হয়ে গেল, তাও কেন কোনও প্রগ্রেস হয়নি?
কিন্তু নোঈ জানে এতে পুশকিনের কোনও দোষ নেই। আসলে কারও দোষ নেই। মালিক গ্রুপের সম্পত্তি। গোটাটা নিয়ে তারাই ঢিমেতালে এগোচ্ছে। ওদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, আপাতত শুধু মিল ও তার আশপাশের জায়গা বিক্রি করা হবে। জোনাক-বাড়ি এখন বিক্রি করা হবে না।
কিন্তু ওদের কোম্পানির কাছে, জোনাক-বাড়ি ছাড়া জায়গাটার তেমন মূল্য নেই। সোনাঝুরির সবচেয়ে ভাল আর সুন্দর জায়গায় ওই বড় বাড়িটা রয়েছে! ওদের কোম্পানির উদ্দেশ্য তো শুধু ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করা নয়। মিলটাকে বাঁচিয়ে আরও ভালভাবে ব্যাবসা করতে চায় ওরা! আগামীর পৃথিবীতে প্যাকিং-এ ইকো ফ্রেন্ডলি প্যাকেজ হিসেবে জুট খুব প্রয়োজনীয় একটা ভূমিকা পালন করবে। প্লাস্টিকের চেয়ে জুট প্যাকিং-এর দাম বেশি হলেও, জুটের প্যাকিং অনেক টেকসই ও বহুবার ব্যবহার করা যায়। তার সঙ্গে এটা অরগ্যানিক, তাই বায়োডিগ্রেডেবল। সামনের দূষণমুক্ত পৃথিবীতে তাই জুট খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস।
এইসব দিক ভেবেই এই ফ্যাক্টরিকে আবার ভালভাবে চাঙ্গা করে তুলতে চায় ওদের কোম্পানি। কিন্তু সেটা করলেই শুধু হবে না। বিদেশ থেকে লোকজন এসে যাতে ভালভাবে থাকতে পারে এখানে, সেটাও দেখতে হবে। সেই সঙ্গে একটা ট্যুরিজ়মও ডেভেলপ করা যাবে জোনাক-বাড়ি আর ওর পাশের নদীকে কেন্দ্র করে। শুধু মিলটা নিলে তা হবে না।
নোঈর অবাক লেগেছিল। আইকাদিদের কোম্পানি কিন্তু সব কিনে, ভেঙে ফেলে তাতে বাড়িই করবে। তা হলে ওদের ‘রিকো গ্রুপ’-ই বা সেটা করবে না কেন?
কথাটা একদিন অফিসের পরে ও জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিনকে। পুশকিন হেসেছিল কথাটা শুনে। তারপর বলেছিল, “জলসাঘর দেখেছ? সত্যজিৎ রায়ের সেই ছবি?”
“হ্যাঁ, কেন?” নোঈ বুঝতে পারেনি হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন কেন?
পুশকিন বলেছিল, “আমাদের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল। আমাদের ভিশনটা কিন্তু শুধু পয়সা রোজগার করা নয়! সঙ্গে নানা কিছু ডেভেলপ করা। মিলটা রিভাইভ করলে শ্রমিকদের সুরাহা হবে। জোনাক-বাড়িটাকে ফাইভ স্টার হোটেল করে তার পাশের বিশাল বড় জায়গায় থিম পার্ক করে সেখানে ট্যুরিজ়ম ডেভেলপ করলে, সোনাঝুরির অন্য লোকজনও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। আমাদের কোম্পানির প্রেস্টিজ কিন্তু শুধু লাভ করে তৈরি হয়নি। মানুষের ওয়েলফেয়ারটাও আমাদের ভিশনের একটা লক্ষ্য।”
“কিন্তু জলসাঘর কেন বললেন বুঝলাম না।”
পুশকিন হেসে বলেছিল, “ছবি বিশ্বাসের সেই ক্যারেকটারটা, মানে সেই পড়তি জমিদার কী বলেছিল মনে আছে? ওরা পারবে না, কারণ জানো? রক্ত! অনেক মানুষ আছে যারা ওঁচা টাইপ! সারাক্ষণ হাত পেতে থাকে, কাঁদুনি গেয়ে বেড়ায়। কিছু পাওয়ার জন্য ছোঁক ছোঁক করে সব সময়! তেমন কিছু কোম্পানিও আছে এরকম! তাদের কাছে টাকা রোজগারটাই আসল। ক্লাস নয়! এটাই সেই রক্ত! এখনকার ভাষায় ডিএনএ! কারও-কারও রক্তে অমন থাকে। আমাদের কোম্পানির ডিএনএ-টা অমন ছোটলোকদের মতো নয়! বুঝলে? তাই হোমওয়ার্ড-এর লোকজন যা করবে আমরা তা পারব না। আমাদের ইন্টারন্যাশনাল রেপুটেশন আছে। ইউএন-এ আমাদের কথা ওঠে! আমরা ওঁচা কাজ করতে পারি না!”
“কী হল?” স্মরণ নোঈর ব্যাগটা ধরে টানল।
নোঈ লক্ষ করেছে, স্মরণ কখনও ওর গায়ে হাত দেয় না। ও মাঝে মাঝে স্মরণের পিঠে থাপ্পড় মারে, চিমটি কাটে, কান ধরে টানে। কিন্তু স্মরণ কখনও ওর গায়ে হাত দেয় না!
কোলিগ হলেও স্মরণ ওর বন্ধুর মতোই হয়ে গেছে। ও জানে ওর এমন মারধরে স্মরণ কিছু মনে করে না।
নোঈ বলল, “যাচ্ছি। আসলে এমন ফুল আমি আগে দেখিনি। তাই…”
স্মরণ বলল, “আজ তারক চক্কোত্তির কথায় কি তুমি একটু আপসেট?”
নোঈ হাসল। মাথা নেড়ে বলল, “কেন এমন মনে হল?”
স্মরণ বলল, “পুশকিনস্যার যে কেন লোকটার সঙ্গে নিজে দেখা করছে না সেটা বুঝতে পারছি না!”
নোঈ ভাবল, বলে রক্ত, রক্ত, কিন্তু বলল না। বরং হাসল।
স্মরণ নিজেই উত্তর দিল নিজের প্রশ্নের। বলল, “আসলে গোড়া ঘরই যখন ঠিক করতে পারছে না কী করবে, জোনাক-বাড়ি বিক্রি করবে কি করবে না, সেখানে বেকার তারক চক্কোত্তিকে ভাও দিয়ে কী হবে, তাই না?”
