অফিসার্স ক্লাবটা নদীর একপাশে। বেশ বড় আর পুরনো ক্লাব। ব্রিটিশদের তৈরি করা। ঢোকার মুখে বড় গেট। বাগান। তারপর কাঠ আর সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা ক্লাব। অনেকটা প্যাগোডার আকৃতি। পেছনে একটা লম্বা জেটির মতো আছে, যেটা গঙ্গা অবধি টানা চলে গিয়েছে।
সাইকেলটা গেটের একপাশে রেখে দিল কাজু। গেটে আজ কেউ নেই। তবে গেট দিয়ে ঢুকেই ডান দিকের গুমটি ঘরে দু’জন দারোয়ান বসে রয়েছে। বাল্ব জ্বলছে। মাধবকাকাকে দেখা যাচ্ছে। এই ক্লাবের সিনিয়র গেটকিপার। খুব ভাল করে চেনে কাজু। মাধবকাকার দুই নাতনিকে ও এক সময় পড়িয়েছে!
“মাধবকাকা!” গেট দিয়ে ঢুকে সামান্য গলা তুলে ডাকল কাজু।
মাধবকাকা বেরিয়ে এল গুমটি থেকে। সামান্য সময়ের জন্য থমকে গেলেও তারপর খুশি হয়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল কাজুকে!
“আরে মাস্টার তুমি? এখানে? কী ব্যাপার?”
কাজু হাসল, “একটু ভেতরে যাব। একজনের সঙ্গে দরকার আছে। কিন্তু…” বলে নিজের জামাকাপড় আর পায়ের দিকে দেখাল।
মাধবকাকা দেখল সেটা, তারপর মাথা নেড়ে হাসল, “আর্জেন্ট মনে হচ্ছে!”
কাজু কিছু না বলে হাসল।
“যাও, কিছু হবে না, আজ ক্লাব ফাঁকা আছে…” মাধবকাকা হাসল।
কাজু মাথা নেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
মোরামের বাঁকা রাস্তা। দু’পাশে পুরনো ধাঁচের বাতিস্তম্ভ। সবেতেই কলোনিয়াল ছাপ স্পষ্ট। রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে কাঠের রেলিং দেওয়া বড় বারান্দায়। সেখানে কয়েকজন মানুষ বসে মদ্যপান করছে।
সুদর্শন মালিককে কয়েকবার দেখেছে কাজু। ও চেনে মানুষটকে। মোটা চেহারা। খুব ফরসা। আর দু’কানে বড়-বড় লোম আছে!
কাজুকে খুঁজতে হল না। সুদর্শনকে বারান্দার এককোণেই পেয়ে গেল কাজু। একাই বসে রয়েছে মানুষটা। সামনের টেবলে কাচের গেলাস। সঙ্গে মাংসজাতীয় খাবার।
কাজু একটু ইতস্তত করল। তারপর মনটা শক্ত করে এগিয়ে গেল সামনে।
“মিস্টার মালিক?”
সুদর্শন গেলাসটা তুলে চুমুক দিতে যাচ্ছিল। আচমকা ডাকে থমকে গেল। তারপর তাকাল।
এবার কাছ থেকে ভাল করে মানুষটাকে দেখল কাজু। আয়েশি চেহারা। চোখের কোলে ছোট-ছোট থলি। মাথায় পাতলা চুল। জোড়া ভুরু। আর কানের লোমগুলো শজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে আছে। লোকটা জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে।
কাজু বলল, “আমার আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে। ইমপর্ট্যান্ট দরকার। কথা বলা যাবে?”
সুদর্শন চুমুক দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রাখল সামনে। তারপর হাসল। পকেট থেকে রুমাল বের করে নাক মুছে বলল, “তোমরা আমাকে একটুও একা ছাড়বে না, না?”
“দেখুন,” কাজু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল। ও জানে, ওর বয়সটা একটা সমস্যা। কেউ তেমন সিরিয়াসভাবে ওকে নেয় না! তাই ও নিজের গলাটা ভারিক্কি করার চেষ্টা করল, “আমি যে-কাজে এসেছি, তাতে অনেক মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তাই বলছি, আমার কথাটা শুনুন।”
সুদর্শন হাসল এবার। একটা মাংসের টুকরো মুখে পুরে চিবোতে-চিবোতে বলল, “ঠিক আছে। বোসো কাজুবাবু। কথাটা শুনি।”
কাজু থমকে গেল একদম! কাজুবাবু! মানে সুদর্শন ওর নাম জানে! ওকে চেনে? কিন্তু ও তো কোনওদিন সুদর্শনের সামনে যায়নি। প্রথাগতভাবে আলাপ করেনি! তা হলে?
“অত ঘাবড়ানোর কিছু হয়নি!” সুদর্শন এবার খিকখিক করে হাসল, “আমার পেছনে যে আছোলা বাঁশ দেওয়ার জন্য ঘুরছে, তাকে আমি চিনব না! তা ছাড়া, আমার বাড়ির হবু বউমার লাভারকেই-বা না চিনে থাকি কী করে?”
কাজুর পা দুটো দুর্বল লাগল আচমকা! লোকটা ওর সম্বন্ধে এত কিছু জানে! কিন্তু কী করে? ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর ঘাম দিচ্ছে বেশ। বুঝল, মনের মধ্যে জমিয়ে তোলা সাহসটা কোন এক অদৃশ্য ফুটো দিয়ে গলে যাচ্ছে! কাজুর মনে হল লোকটা ওকে কথা শুরুর আগেই দু’গোল দিয়ে দিয়েছে!
ও চোয়াল শক্ত করে নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করল। তারপর চেয়ারটা টেনে বসল সামনে। খেলা শুরুর আগে হার মানার কোনও মানে নেই।
.
২২. নোঈ
ভাঙা গাড়িটার মাথায় এমন করে ফুলগুলো ছড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে কে যেন নরম সবুজ রং মাখিয়ে দিয়েছে। কী ফুল এটা! কেমন একটা অদ্ভুত মিষ্টি ঝিমধরা গন্ধ! নোঈর মনে হল ওর শরীরের সমস্ত রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে গন্ধটা। বিকেল-শেষের বৃষ্টির পরে, সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে ফুলের গন্ধটা অন্য একটা আলো পেয়েছে!
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ল। ভাল করে দেখল গাড়িটাকে। ভাঙা, পুরনো একটা গাড়ি। সামনের লাইট নেই। জং ধরা দরজা। বনেটের সামনেটা কেমন একটু তুবড়েও আছে! তার ওপর ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলো দেখে কী অদ্ভুত লাগল নোঈর! নিঝুম পাড়া। বড় গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা একলা গাড়ি। মাথায় গুঁড়োফুল। ওর মনেই হচ্ছে না এটা কলকাতা।
“খুব সুরিয়াল একটা ব্যাপার না?” পাশ থেকে স্মরণ নরম গলায় বলল।
নোঈ সেই কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী ফুল?”
“এটা?” স্মরণ সামনে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির বনেটের ওপর থেকে একমুঠো ফুল তুলে নিয়ে ওর হাতে রেখে বলল, “ছাতিম! এই বড় গাছটা দ্যাখো। ছাতিম গাছ! কেমন মেলে রাখা একটা ছাতার মতো, না? এই ফুলের গন্ধ খুব স্ট্রং হয়।”
নোঈ ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল। সত্যি, অদ্ভুত দেখতে একটা গাছ! ও গাছপালা খুব একটা চেনে না। কলকাতা শহরের দক্ষিণে গাছপালা উত্তরের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে কোনওদিন এই নিয়ে নোঈ ভাবেনি। কিন্তু আজ এই ফুলগুলো দেখে ওর মনে হল, গাছপালা সম্বন্ধে ও কত কম জানে!
