কাজু দম নিল একটু। তারপর বলল, “গোড়া ঘরের সঙ্গে দেখা করব আজ, খোদ মালিকের সঙ্গে দেখা করব। সুদর্শন মালিক! বুঝলি?”
“শালা…” সতু হাঁ করে তাকিয়ে রইল কাজুর দিকে। কী বলবে বুঝতে পারল না!
“শোন, বিমলদা, গোপেনদা, সবাই সাইড করছে। এভাবে কিছু হওয়ার নয়। সবাই যে যার ইগো আর ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত! তা হলে আর ইউনিয়ন করে শ্রমিক স্বার্থ দেখব বলে ঢ্যামনামো করা কেন? আমি সতু, নিজের আখের গোছানোর জন্য রাজনীতি করি না। জানি সব জায়গায় আজকাল নিজের আখেরটাই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে! কিন্তু আমি নিজে যেটা কনডেম করি, সেটাই আবার নিজে কী করে করি! আর করবই-বা কেন? সৎ কাজ করার জন্য যখন দেখবি লোকজন বাহবা দিচ্ছে বা সাবধান করে দিচ্ছে, জানবি তখন সমাজ আর দেশের ঘোর দুর্দিন!”
সতু সময় নিল একটু। তারপর বলল, “এখন যা সিচুয়েশন তোর ব্যক্তিগত লাইফে, সেখানে এই সুদর্শন মালিকের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটাকে পারসোনালি নিয়ে নিস না। মানে ওর ছেলের সঙ্গে তো…”
সতু জানত। তবে ওকে জিজ্ঞেস করল কেন? কিন্তু এটা নিয়ে আর কথা বাড়াতে ভাল লাগছে না ওর। ওই নামটাই আর শুনতে ইচ্ছে করছে না। কাজু সামনের দিকে তাকাল। অন্ধকারে জোনাকিরা আলো জ্বালিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোট-ছোট প্রদীপ যেন। অদ্ভুত এক আভা ছড়িয়ে আছে। কিন্তু অন্ধকার কি তাও কাটছে!
ও বলল, “সবটাই পার্সোনাল সতু। জানবি, জীবনে প্রফেশনাল বলে কিছু নেই। পারসোনালি লোকটা কেমন, সেটাই ইমপর্ট্যান্ট।”
“কিন্তু…”
সতু আরও কিছু বলত, তবে তার আগেই, পেছনে একটা শব্দ শোনা গেল। কারও একটা হেঁটে আসার শব্দ! কাজু উঠে ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকার হলেও আবছায়ায় মানুষটার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। ও বুঝল বিজন আসছে!
“কাজুদা,” বিজন সামনে এসে দাঁড়াল। সামান্য হাঁপাচ্ছে ছেলেটা।
“কী রে এসেছে?”
“এসেছে, এই মিনিটদশেক হল… আমি ঢুকতে দেখেই তোমার কাছে এসেছি, সাইকেল আছে আমার, চলো…” বিজন নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে বলল।
“চল,” কাজু এবার সতুর দিকে ঘুরল, “তুই যাবি?”
সতু মাথা নাড়ল, “না, আমার কাজ আছে অন্য। আর তুইও যাস না। শোন, একটা জিনিস ভাব। সুদর্শনের ছেলে যা করছে, সেটা কি লোকটা নিজে জানে না মনে হয়? যাদবকাকা না কে, তার কথায় অত গুরুত্ব দিস না। তুই যে ডাইরেক্ট এসব করছিস, জানলে কিন্তু বিমলদা খচে যাবে! আমাদের রেজিমেন্টেড পার্টি। ঘোড়া টপকে ঘাস খেতে যাস না! বিপদে পড়বি কিন্তু কাজু।”
কাজু বলল, “এই তোর বিপ্লব! ভাগ শালা। চল বিজন।”
সাইকেলটা দাঁড় করানো ছিল জোনাক-বাড়ির মেন গেটের পাশে।
কাজু দেখল পরিতোষ সাইকেল পাহারা দিচ্ছে। কাজু বিরক্ত হল। ছেলেটা কথা শোনে না তো!
ও বলল, “তুই কী করছিস এখানে? তোকে বলেছি না যে, এমন করবি না? তুই ভাল ছেলে। পড়াশোনা কর। এসব করছিস কেন এখন? সবাই এক কাজ করলে মুশকিল! যে যেটা পারে, তার সেটাই করা উচিত! বিজনটা আর কিছু করবে না বলে ঠিক করে নিয়েছে। ওকে বললেও শোনে না। কিন্তু তুই এসবে আসিস না পরিতোষ। বাড়ি যা।”
পরিতোষ কী বলবে বুঝতে পারল না। বিজনের দিকে তাকাল।
“যা বলছি!” এবার জোরে ধমক দিল কাজু। তারপর সাইকেলে উঠে বিজনকে বলল, “তুইও কাট।”
বিজন মাথা নাড়ল জোরে, “আমি যাব তোমার সঙ্গে। একা যাবে কেন তুমি? আর এমন হাওয়াই চটি পরে তোমায় ওই ক্লাবে ঢুকতে দেবে?”
কাজু আর উত্তর দিল না কথার। সাইকেল চালিয়ে দিল। এই বয়সি ছেলেগুলো খুব ডেঁপো হয়! ঢুকতে দেবে কি দেবে না সেটা ওর ব্যাপার! সব কিছু না জেনেই কি ও আর এভাবে দেখা করার কথা ভেবেছে!
সোনাঝুরির মেন রোডে আলো লাগানো হয়েছে। সোজা রাস্তাটা একটা ব্রিজ থেকে নেমে দু’কিলোমিটারের মতো গিয়ে সোনাঝুরি বয়েজ় স্কুলে শেষ হয়েছে।
রাস্তাটা নির্জন। দু’পাশে বড়-বড় গাছ। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, রেন-ট্রি আর পাম গাছ! তার মাঝখানে ছড়ানো মাঠের মধ্যে জুটমিলের কোয়ার্টার, সিনেমা হল, পাম্প হাউজ়, মেস আর ক্যান্টিন!
যদিও রাস্তার আলো ওই মাঠের দূর অবধি পৌঁছয় না, তাই সবটাই কেমন যেন ধোঁয়াটে, অন্ধকার! রহস্যকাহিনির মতো। সাইকেল চালাতে-চালাতে আচমকা কাজুর মনে হল, এই যে এসব করছে ও, তাতে কি সত্যি কিছু হবে! নাকি কিছু হতে পারে! কোনও কিছুর জন্য পরিশ্রম করলেই কি সেটা মানুষ পায়! তা হলে তো সেই হিসেবে দেখলে, পেখমকেও ওর পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হল?
নয়না যখন বলল যে, পেখমের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, পেখম খুব খুশি, তখন তো এই কথাটাই মনে হয়েছিল ওর। মনে হয়েছিল, এই জীবনে সৎভাবে কিছু পাওয়া যায় না! মন দিয়ে চাইলেও কিছু পাওয়া যায় না। ও ভেবেছিল, আজ যদি ও ভাল চাকরি করত, অনেক টাকা রোজগার করত, তা হলে কি এভাবে ওকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারত পেখম! ও তো কোনওদিন লুকোয়নি যে, ও কী! জীবনে কী চায়! তখন তো পেখমের এসবই ভাল লাগত। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে সে সবই খেলাচ্ছল। তাই তো সেদিন পেখম যখন ওকে ডাকছিল ও শোনেনি। কী শুনবে? একরাশ বানানো কথা? নিজেকে অসহায় দেখানোর একপ্রস্থ নাটক! ও নিজে তো যায়নি পেখমের কাছে! পেখমই তো আগ্রহ দেখিয়েছিল! আর এখন…
আঃ, এসব কী ভাবছে! আজকাল সব কথাই কেন এমন করে বাঁক নিয়ে পেখমের কথায় এসে মেশে! সব কিছুই কেন এসে মেশে এমন একটা হাহাকারে! কাজু তো এমন নয়। ওর তো সামনে কত কিছু করার আছে। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কত কী করার আছে। তা হলে এমন কেন করছে? কে না কে একটা মেয়ে, তার জন্য এমন করছে কেন? বেশি গল্পের বই পড়ার ফল কি? এসব ন্যাকামো তো ওর ছিল না কোনওদিন! তা হলে? নিজের ওপর ঘেন্না হল ওর। এতেই এত হতচকিত হয়ে গেল ও! একটা অল্পবয়সি মেয়ের পুতুলখেলা নিয়ে এতটা কষ্ট পেয়ে গেল! তা হলে ও জীবনে যে-পথ বেছেছে সেখানে কী করবে? সেখানে তো পদে-পদে বিপদ আর কষ্ট! সামনে আধো আলো আর আধো অন্ধকার ঢাকা পথের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করল কাজু। আর এসব নিয়ে কোনওদিন ভাববে না। পেখমের কথা মনে এলে জোর করে মনটা ঘুরিয়ে দেবে অন্য দিকে। ও ভুলে যাবে এমন কোনও একটা মেয়ে এসেছিল ওর জীবনে।
