“বললে কী করতিস? সেদিন মেয়েটা নিজে তোর সঙ্গে কথা বলতে এল, তুই কথা বললি? বললি না। সাইকেলে উঠে চলে গেলি! তারপর মেয়েটার সঙ্গে সব কথা, সম্পর্ক শেষ করে দিলি! আর বলছিস আমি তোকে বলিনি কেন!”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। বুকের ভেতরে কেমন একটা দমচাপা কষ্ট হচ্ছে ওর। পেখমের কথা উঠলেই এমনটা হয়!
কেবলই মনে হয়, মেয়েটা এই পৃথিবীতে থাকবে কিন্তু ওর হবে না! ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকবে না! অন্যের হয়ে যাবে মেয়েটা! অন্যের জন্য চিন্তা করবে! অন্যের সঙ্গে সময় কাটাবে! অন্যের সন্তান ধারণ করবে! অন্যের শরীরের গন্ধ মিশে থাকবে ওর শ্বাসে! যাকে কাজু সব দিয়ে ভালবাসল, সে এটা কী করে করতে পারল ওর সঙ্গে?
“কী হয়েছে তোর কাজু! আমার সঙ্গে কিচ্ছু দেখা হয়নি পেখমের! আমি জাস্ট দেখলাম তোর রিঅ্যাকশন!” সতু আলতো ঠেলল ওকে, “দেখ ভাই আমি ধর তক্তা মার পেরেক টাইপের ছেলে! রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকি। কিন্তু এটুকু আমিও বুঝি যে, মেয়েটা তোকে পাগলের মতো ভালবাসে! আর তুই নিজেই বলেছিস একদিন মেয়েটা এসেছিল তোর কাছে, তুই ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিস! তারপর সেদিন সন্ধেবেলা তোর কাছে আবার এল, তুই ওকে দেখতে পাসনি এমন ভাব করে চলে গেলি! তোর দাবিটা কী? মেয়েটা কী করেছে?”
“ও বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে,” কাজু ছোট করে বলল।
ছোট একটা বাক্য। কিন্তু বলতে গিয়ে কাজুর মনে হল বুক থেকে জিভ অবধি সবটা পুড়ে গিয়েছে ওর! কেমন একটা শূন্যতা টের পাচ্ছে যেন ও! কাজু বুঝল, কিছু বলে দেওয়া আর মনে মনে বিশ্বাস করার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে।
“বিয়ে?” সতু আকাশ থেকে পড়ল যেন, “সে কী রে? এটা তো জানি না! কার সঙ্গে বিয়ে? কে বলল তোকে?”
“কার সঙ্গে বিয়ে?” নামটা মুখে আনতেও কেমন যেন মনে হল ভেতরে-ভেতরে একটা বিস্ফোরণে শেষ হয়ে যাবে কাজু।
ও ঢোঁক গিলে নিজেকে সামলাল। গলার কাছে তীব্র একটা ব্যথা হচ্ছে।
কাজু মিথ্যে করে বলল, “জানি না। তবে হচ্ছে জানি। এটা আমায় অন্যের মুখ থেকে শুনতে হল সতু! যাকে সব দিয়ে ভালবাসলাম সে একবারও বলল না!”
“কে বলেছে তোকে? তুই শিয়োর?” সতুর গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, ও এটা বিশ্বাস করতে পারছে না!
“বাদ দে,” কাজু আবার সামনের দিকে তাকাল, “এসব আর বলিস না। প্লিজ়!”
সতু আরও কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। সত্যি, কিছু সময় কথা বলা যায় না!
কাজু সামনের অন্ধকারে জোনাকিদের দিকে তাকিয়ে রইল। গাছে, ঝোপে যেন অসংখ্য আলোর বিন্দু জ্বলে আছে। যেন দূর থেকে দেখা আলো-জ্বলা বাড়ির জানলা! যেন প্রতিটা আলোর পেছনে কোনও না-কোনও গল্প লুকিয়ে আছে!
সতু এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, “বাদ দে। তা, গোপেনদার সঙ্গে তোর কথা হল? বিমলদা তো ঝাড় দিল খুব। গোপেনদা কিছু বলল?
কাজু মাথা নাড়ল, “কেউ কিছু করবে না রে। গোপেনদা তো দেখাই করছে না আর! ওদিকে বিমলদা ওইসব বলল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম গোপেনদা ঠিক হেল্প করবে। কিন্তু সব শালা এক!”
“কেন করবে?” সতু বাদামটা শেষ করে এবার পকেট থেকে বিড়ি বের করল একটা, “তুই শালা সত্যযুগে পড়ে আছিস, কিন্তু এখন কলিযুগ ভাই। গোপেনদা যেই বুঝেছে যে, ফ্যাক্টরিতে গোলমাল হলে ওদের লাভ, সঙ্গে-সঙ্গে কাটাচ্ছে তোকে। গাছে ফল পাকতে দিচ্ছে। বিমলদা যেই শ্রমিক স্বার্থ দেখতে ব্যর্থ হবে, গোপেনদা টুক করে খেয়ে নেবে ফলটা!”
“আমি বুঝতে পারছি সতু,” কাজু মাথা নাড়ল, “অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু তা বলে তো আমি বসে থাকতে পারি না! যাদবকাকাদের সঙ্গে আজও সকালে কথা হল মিলের ইউনিয়ন রুমে। সবাই খুব আপসেট। আর ভয়ও পেয়ে গিয়েছে। এমনিতেই মিল থেকে মাইনে ইরেগুলার হয়ে গিয়েছে! এখন যদি অন্যভাবেও ন্যায্য পারিশ্রমিকে হাত পড়ে, তবে তো লোকগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে রাস্তায় বসবে! ওদিকে মালের শিপমেন্ট এগিয়ে আসছে। আর যা কোয়ালিটি দিয়েছে মালিকের ছেলে, তাতে মাল রিজেক্ট হওয়ার চান্স বেশি। সেই ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নাকি টাকা কেটে নেবে! এটা কোন দেশি কথা? এর একটা বিহিত করতে হবে না?”
সতু এতক্ষণ বিড়ি ধরায়নি। এবার দাঁত দিয়ে বিড়িটা চেপে ফস করে দেশলাই জ্বালাল। কাজুর নাক কুঁচকে গেল। এই গন্ধটা কী যে খারাপ লাগে ওর!
সতু বিড়ি টেনে কিছুক্ষণ ধোঁয়াটা ধরে রাখল বুকের ভেতর। তারপর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নীলচে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “কী করে বিহিত করবি?”
কাজু মাথা নাড়ল। তারপর কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। অন্ধকারে ঘড়ির কাঁটার সবুজ ফসফরাস চকচক করছে! ও বলল, “যে-কোনও সময় বিজন এসে পড়বে। ও খবরটা আনবে লোকটা কখন অফিসার্স ক্লাবে আসে। খবরটা পেলেই আমি গিয়ে দেখা করব আজ।”
“অফিসার্স ক্লাব? মানে?” সতু অবাক হয়ে তাকাল, “কার সঙ্গে দেখা করবি তুই?”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। আবার বুক থেকে জিভ অবধি পুড়ে যাচ্ছে ওর! কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে পাঁজরগুলো গুঁড়িয়ে যাবে!
“কী হল বল!” সতু ঠেলল ওকে।
“বলছি, কিন্তু কাউকে বলবি না।”
“শালা, আমি তোর কোন কথাটা কাকে বলতে গিয়েছি রে? ফালতু কথা বলছিস!” সতু রেগে গেল সামান্য। হাতের বিড়িটা মাটিতে ফেলে হাওয়াই চটি দিয়ে পিষে দিল। যেন বিড়িটা নয়, কাজুকেই পিষল!
