তারক আর কথা না বাড়িয়ে হাতজোড় করে হাসল।
আইকা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। এত টাকা! চারটে ফ্ল্যাট! নদীর পাশে! পাগল নাকি?
ও চারিদিকে তাকাল। লোকজন এখনও তারককে দেখছে! নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করছে! কিন্তু তারকের কিছু খারাপ লাগছে বলে তো মনে হচ্ছে না! পাত্তাই দিচ্ছে না!
আইকা এগিয়ে গেল দরজার দিকে। কিন্তু হঠাৎ কী একটা মনে হল ওর! ওটা কে?
আইকা দ্রুত মাথা তুলল। রেস্তরাঁর দেওয়ালটা পুরো কাচের। বাইরের সব দেখা যাচ্ছে! আর সেখানেই ছেলেটাকে দেখল ও। আবার!
সেই লম্বামতো। বড় চেহারা। জিন্স আর সস্তার টি-শার্ট পরা! ছেলেটা স্থিরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! বেশ কিছুটা দূরে হলেও আইকার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না!
শরীরের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল ওর। ছেলেটা কি ওকে ফলো করছে? কেন করছে? কে ছেলেটা? কী চায়?
আচমকা মনে পড়ে গেল ওর। আরে, এ তো সেই ছেলে! ঋষির বাড়ি থেকে একদিন শেয়ার গাড়িতে করে ফেরার সময়ে দেখেছিল। সঙ্গে একটা রোগা করে ছেলেও ছিল! ছেলেটা কী করছে এখানে! কী চায়? ওকেই কি ফলো করছে? নাকি এমনি এসেছে! বুঝতে পারছে না আইকা। কিন্তু কেন কে জানে গোটা ব্যাপারটা ভালও লাগছে না! খালি মনে হচ্ছে সামনে কোনও বিপদ আসতে চলেছে! যাদবপুর কলোনির সেই ভিতু মেয়েটা যেন আবার গুটিগুটি করে এসে মনের দখল নিচ্ছে ওর।
.
২১. কাজু
আজ হাওয়া দিচ্ছে খুব। গঙ্গার দিক থেকে অদ্ভুত একটা হাওয়া এসে যেন পাউডারের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সোনাঝুরির আকাশে বাতাসে! এই অন্ধকারে বসে হাওয়ায় ডুবে যেতে যেতে কী ভাল যে লাগছে কাজুর! উঠতে ইচ্ছে করছে না।
জোনাক-বাড়ির এই বাগানের দিকটা অন্ধকার থাকে। বিশাল কম্পাউন্ডের এই দিকটায় বিশেষ কেউ আসে-টাসে না। চারটে বিশাল বড়-বড় বাড়ির ব্লকের পরে একটা রাস্তা কিছুটা এসেছে এই বাগানের মধ্যে। তবে নামে বাগান হলেও পরিচর্যার অভাবে এটা এখন কেমন একটা জঙ্গলের আকার নিয়েছে। সামনেই বাউন্ডারি ওয়াল। তবে তার কিছুটা বেশ ভাঙা। কিন্তু যেহেতু এদিকে কেউ আসে না, তাই এটা সারানোও হয় না। তবে সারাবেই-বা কে?
আসলে জোনাক-বাড়িতে যারা থাকে, তারা কেউই এটা সারাবে না। ইচ্ছে থাকলেও তাদের সেই সামর্থ্য নেই। আর এই বাড়িটা সুদর্শন মালিকদের। যারা থাকে তাদের অধিকাংশ লোকই জুটমিলে কাজ করে। বাকিরা ভাড়া দিয়ে থাকে। তবে সেটাও খুব বেশি নয়। তাই মালিকরাও কেউ এটা সারানোর গরজ করে না।
“কী ভাবছিস কী?” সতু কনুই দিয়ে খোঁচা দিল।
কাজু মাথা নাড়ল। তারপর সামান্য শব্দ করে হাসল, “না, এই বাড়িটার কথা ভাবছিলাম! ভাগের মা গঙ্গা পায় না অবস্থা বাড়ির! অনেক জায়গা রিপেয়ার করা দরকার!”
“ছাড় তো!” সতু হাসল, “কী সব ভাবিস! তার চেয়ে সামনে দেখ! কী সুন্দর না!”
কাজু কথা না বলে তাকিয়ে রইল। সামনে অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু জোনাকি জ্বলছে। অনেক জোনাকি। বাড়িটার চারিদিকে এত জোনাকি জ্বলে থাকে যে, অদ্ভুত লাগে কাজুর! মনে হল আকাশ থেকে হাজার-হাজার তারা নেমে এসেছে মাটিতে!
ছোটবেলায় ও কাচের বয়ামে জোনাকিদের ধরে রাখত। সারাদিন বয়ামটাকে ও ঢেকে রাখত কাপড় দিয়ে। তারপর ছাদের ওপরের ভাঙা ঘরে গিয়ে সন্ধের অন্ধকারে বয়ামটার কাপড় সরিয়ে দিত! আর দেখত, অপার্থিব এক সবুজ-হলুদ আলো! ঘরের দেওয়ালে কেমন জলের মতো সেই আলোর ঢেউ খেলত! ওর মনে হত কোনও দূর আর অজানা সমুদ্রের তলায় যেন বসে রয়েছে ও! বয়ামের চারপাশে হাত ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখত ও। হাতে আলোর টুকরো ছড়িয়ে থাকত! কিন্তু ধরা যেত না! বাবাও মাঝে মাঝে ওর পাশে বসে দেখত এই সব আলোর জাদু! আর বলত, “মানুষের কিছু-কিছু ইচ্ছেরা এমন হয় জানিস! এই জোনাকিদের আলোর মতো। দেখা যায়, কিন্তু হাতের মুঠোয় ধরা যায় না! তাদের শুধু দূর থেকে দেখেই যেতে হয়!”
তখন বাবা কী বলছে না-বুঝলেও আজ বড় হওয়ার পরে এই সব কিছু বুঝতে পারে কাজু। বুঝতে পারে কোন কষ্ট আর হতাশা থেকে বাবা ওকে এইসব কথা বলত!
“তোদের এই বাড়িটাকে জোনাক-বাড়ি বলে, কিছু খারাপ বলে না। শালা ভারতের সমস্ত জোনাকি কি এখানেই এসে জমেছে?” সতু চিনেবাদামের ঠোঙার মুখটা খুলে হাতে ঢালল।
কাজু কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু।
সতু বলল, “শালা, সারাক্ষণ এমন করে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়বি, কিন্তু তাও পেখমের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিবি না! শালা, তোকে বোঝা ভার। ভালই যদি বাসিস তা হলে এমন করছিস কেন বে?”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। ও চাইছিল না এই প্রসঙ্গটা উঠুক। কিন্তু এই সতুব্যাটা ভুল সময়ে ভুল কথা তুলবেই!
ও বলল, “এই নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না!”
“কেন?” সতু ছাড়ল না, “সেদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল পেখমের পাঁচ মিনিটের জন্য। মেয়েটার মুখ-চোখ বসে গিয়েছে! কেমন অসুস্থ লাগল। আমি কথা বললাম। ও শুধু হুঁ হাঁ করে গেল গোটা সময়। শেষে আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম যে, কাজুর সঙ্গে দেখা হয়? তাতে মেয়েটা সবার সামনে যা কাঁদল! তুই শালা মানুষ!”
কাজু সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চে এবার ঘুরে বসল, “এটা আগে বলিসনি তো!”
“কী বলব?” সতু পাশ ফিরে তাকাল।
“এই যে পেখমের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছিল, এটা বলিসনি তো!”
