তারক গলার উত্তরীয়টা মাফলারের মতো করে গলায় পেঁচিয়ে বলল, “ওকে আটকাচ্ছ কেন? আমার গেস্ট না?”
মেয়েটি শুকনো মুখে বলল, “আমি স্যার ওঁকে বলছিলাম… একটা তো রুল আছে!”
এবার রেস্তরাঁর ভেতর থেকে একজন ম্যানেজার গোছের লোক বেরিয়ে এল হন্তদন্ত হয়ে। তারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “হোয়াটস দ্য ইনকনভিনিয়েন্স স্যার?”
“বাঞ্চোত!” তারক ঠোঁট কামড়ে লোকটার দিকে তাকাল, “বাঙালির পো হয়ে ইংরেজি মারাচ্ছ? রুল? রুলের গুঁতো খেয়েছ? তোদের গোটা হোটেল পেছনে দিয়ে দেব শুয়োরের বাচ্চা! ম্যাডাম আমার গেস্ট। বলে কিনা ঢুকতে দেবে না! নিয়ম দেখাচ্ছে! আমার মটকা তেতে গেলে না কেলিয়ে দাঁত খুলে নেব!”
ম্যানেজারটি হাসছিল। কিন্তু দাঁত খুলে নেওয়ার আশঙ্কাতেই কি না কে জানে, দ্রুত বেরিয়ে থাকা দাঁতগুলো ঢুকিয়ে নিল!
তারক দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আমায় চেনো না চাঁদু! পোঙাপাকামো করেছ কী, পোঙা ভেঙে বাড়ির দেওয়ালে ডেকরেশন করে দেব! আসুন ম্যাডাম।”
আইকা দেখল ম্যানেজারটি মাথা ঝুঁকিয়ে আইকাকে ভেতরে যাওয়ার জন্য বিগলিত হয়ে হাত দেখাল।
তারক কটমট করে তাকাল ম্যানেজারটির দিকে। তারপর বলল, “আর ঢ্যামনামো করতে হবে না! আমার জন্য একটা নিট পাঠা!”
রেস্তরাঁর ভেতরে সবাই গন্ডগোলে থমকে ছিল। এবার ওরা ঢুকতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল!
তারক নিজের টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে পাশের টেবিলে বসা একটা ইয়া মোটা, ফরসা লোকের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী কাকা, ভাল টাইট দিয়েছি না? শালা ইংরেজি মারাচ্ছে! বাড়িতে উবু হয়ে বসে হাগে, আবার ইংরেজি মারায়! বেশি ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করলেই পোঙা ভেঙে বাড়ির দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেব। কেমন? তুমি খাও।”
লোকটা দ্রুত তারকের মধুর বাক্যে সম্মতি জানিয়ে গোগ্রাসে নিজের খাবার শেষ করতে লাগল। আইকা বুঝল লোকটা আর পাশের টেবলে বসে থাকার কোনওরকম রিস্ক নিতে চাইছে না!
তারকের টেবিলে একটা বিয়ারের মাগ। সামনে চিকেনের দু’-তিন রকম প্লেট। লোকটা যে ড্রিঙ্ক করে আছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল!
“ম্যাডাম, আপনি কী নেবেন? আমি খাওয়াব!”
আইকা দেখল, এ এমন অবস্থায় আছে যে, এর সঙ্গে বেশি কথা বাড়ানো মুশকিল! ও বলল, “আজ আমার উপোস! তাই খাব না কিছু!”
“উ…” তারকের চোখ গোল হয়ে গেল, “আপনারা উপোস করেন!”
“কেন?” আইকা তাকাল অবাক হয়ে!
তারক ফিক করে হাসল! লোকটার নেশা হয়ে গেছে কি! কেমন একটা ব্যবহার করছে!
তারক সামনে রাখা বিয়ারের মাগটা তুলে লম্বা চুমুক দিয়ে শব্দ করে ঢেকুর তুলল! পাশের টেবলের সেই মোটা লোকটি সামান্য অসন্তুষ্ট হয়ে তাকাল।
তারক আবার ঘুরল লোকটার দিকে, “কী হল, কাকা? তুমি ঢেকুর তোলো না? দেখে তো মনে হচ্ছে ঢেকুর ছাড়াও নানা শব্দ বের করো শরীর থেকে! অমন তাকিয়ো না, মটকা তাতছে কিন্তু!”
“প্লিজ়,” আইকা এবার না বলে পারল না, “একটু কন্ট্রোল করুন। এমন করবেন না। আমার এমব্যারাসিং লাগছে!”
তারক থমকে গেল এবার। তারপর হাসল। বলল, “আচ্ছা, বাদ দিন। আসলে আপনাদের মতো মোমপালিশ করা মেয়েরা এমন উপোস করে, আমি জানতাম না!”
মোমপালিশ! কথাটা কট করে কানে লাগল আইকার। কিন্তু ও কিছু বলল না। তারক যে পুরো নেশাগ্রস্ত, সেটা বোঝাই যাচ্ছে!
আইকা জিজ্ঞেস করল, “আপনি ডাকলেন কেন? যদি কাইন্ডলি বলেন! আমার একটা কাজ আছে!”
“ইয়েস!” তারক একটা চিকেন তুলে মুখে দিয়ে তাকাল আইকার দিকে। তারপর বলল, “আপনাদের সোনাঝুরির জায়গা, মিল, জোনাক-বাড়ি চাই। ওখানে অনেক লোক থাকে। আপনারা সব নিয়ে সেই লোকগুলোকে উৎখাত করবেন! বিশাল প্রজেক্ট বানাবেন! ভাল। কিন্তু সেটা করতে গেলে বহু গরিবের বহুত কষ্ট হবে। তাই না?”
আইকা তাকিয়ে রইল।
তারক বলল, “আপনারা চান যাতে ঝামেলা না হয়। চান, যাতে কেউ প্রতিবাদ না করে! তাই তো? সেটার জন্যই তো আমার কাছে গিয়েছিলেন! ঠিক আছে। জানেন তো আরও একটা পার্টি ঘুরঘুর করছে। পুশকিন চক্রবর্তী। সেও দেখা করতে চাইছে। অফিস থেকে একটা ছেলেকেও পাঠিয়েছে কয়েকবার। জানেন তো?”
এসব জানে আইকা। কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিজের জায়গায়। কিন্তু কাজটা কাজই। এটা ও জানে যে, পুশকিনদের কোম্পানি ‘রিকো গ্রুপ’-ও এই একই লক্ষ্যে এগোচ্ছে!
আইকা বলল, “আপনি কেন ডেকেছেন যদি বলেন।”
তারক বলল, “আমার দুটো মেয়ে! বউ নেই। বহু আগে এক ছোঁড়ার সঙ্গে পালিয়েছিল! আমি জানেন, বউকে খোঁজার চেষ্টা করিনি। যে নিজের ইচ্ছেয় চলে যায় তাকে জোর করে লাভ নেই! আমার বউয়ের যদি অন্য কাউকে পছন্দ হয়, তবে আর কী করা যাবে! কিন্তু একটা জিনিস হয়েছে তারপর থেকে। আমি আমার মেয়েদের ব্যাপারে খুব ইনসিকিয়র্ড হয়ে পড়েছি! ওদের ভবিষ্যৎও তো আমাকেই দেখতে হবে। তাই চারটে থ্রি বিএইচকে ফ্ল্যাট, প্রেফারেবলি নদীর পাশে। আর দেড় কোটি টাকা! আমার মেয়েদের জন্য এটাই এনাফ হবে।”
আইকা ভেতরে-ভেতরে চমকে উঠলেও বাইরে দেখাল না। বলল, “ঠিক আছে মিস্টার চক্রবর্তী। আমি অফিসে জানিয়ে দেব। তারপর জানাব কী করতে পারছি!”
তারক তাকিয়ে হাসল। বলল, “জানাবেন! পুশকিন কিন্তু আরও বেশি দিতে রাজি! কিন্তু আপনি এসেছেন আগে। দু’বার দেখা করেছেন। তাই আপনার চান্স আগে! আমি লোভী নই। প্র্যাকটিকাল। আসুন!”
