আইকা দেখল মেয়েটার ডান হাতের অনামিকায় একটা রুপোয় বাঁধানো পলার আংটি। আর বাঁ হাতের বাহুতে টপের ফাঁক দিয়ে লাল কারে বাঁধা শিকড় উঁকি মারছে!
মেয়েটা কায়দা করে ইংরেজি বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু উচ্চারণের জন্য সেটা আমেরিকান ইংরিজি না হয়ে অদ্ভুত একটা উচ্চারণ হচ্ছে!
আইকার কষ্ট হল মেয়েটাকে দেখে। কোন বাড়ির মেয়ে! কত বয়স হবে? এই বাইশ-তেইশ। নিজেকে ছাপিয়ে ও স্মার্ট আর ঝকঝকে হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এমন কষ্টের সঙ্গে ও নিজেও পরিচিত।
আইকা বাংলায় বলল, “আমরা ঘড়ি দেখতে এসেছি। ফর কাপ্ল। মাঝবয়সি কাপ্লদের জন্য!”
বাংলা শুনে মেয়েটাও যেন স্বস্তি পেল একটু। হাসল। তারপর এগিয়ে নিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে!
ঘড়ি পছন্দ করতে আইকার মিনিট কুড়ি সময় লাগল। রুপিন যেটা দেখছিলেন সেটাই খুব ভাল বলে কিনতে চাইছিলেন। কিন্তু আইকা সেটা হতে দেয়নি! বরং দু’বার তো একটু বকেইছে রুপিনকে। বলেছে, “স্যার, প্লিজ় ইউ স্টে আউট অফ দিস!”
আইকা দেখেছে যে, এতে রুপিন রাগ তো করেনইনি, বরং হেসেছেন খুব! দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে পিছিয়ে গিয়েছেন!
দুটো ঘড়ি ছাপ্পান্ন হাজার টাকা! আইকা মনে মনে আবার চমকাল! সময় দামি জানত! কিন্তু এমন দামি না হলেও বোধহয় চলত!
রুপিন নিজেই এগিয়ে গেলেন ক্যাশের দিকে। আইকা এই সময়ের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে আরও কয়েকটা ঘড়ি দেখল। বেশ ঘড়িগুলো। কিন্তু বড্ড দাম! আইকা নিজে ঘড়ি পরে না আর। মোবাইলেই তো দেখা হয়ে যায় সময়।
“লেটস গো,” রুপিন হাতে প্যাকেট নিয়ে এসে দাঁড়ালেন পাশে।
দোকানের বাইরে এসে দাঁড়তেই পিংপিং করে আইকার মোবাইলটা বেজে উঠল। ওই বোধহয় এসে পড়েছে!
আইকা দেখল মোবাইলটা। ঠিক ধরেছে। ও রুপিনের দিকে তাকাল। তারপর ফোনটা ধরে বলল, “ইয়েস। ও, এসে গিয়েছেন? কোথায়? ও আচ্ছা। আমি আসছি তা হলে। ফাইভ মিনিটস।”
ফোনটা কেটে রুপিনের দিকে তাকাল আইকা। বলল, “স্যার, আই নিড টু লিভ। তারক চক্রবর্তী এসে গিয়েছেন।”
রুপিন মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যাব তোমার সঙ্গে?”
“না স্যার, আই ক্যান ম্যানেজ। আপনাকে দেখলে হি উইল বিকাম মোর গ্রিডি। মানে আই থিঙ্ক হি ইজ় হিয়ার টু ইনটিমেট হিজ় প্রাইস টুডে।”
রুপিন চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “ওকে। শিয়োর!”
“আমি আসছি স্যার। আই উইল লেট ইউ নো!”
আইকা পা বাড়াতে গেল। কিন্তু পারল না। রুপিন হাত তুলে আটকালেন ওকে। তারপর হাতের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে ওর হাতে দিয়ে বললেন, “দিস ইজ় ফর ইউ। আর একদম আরগু করবে না। টেক দিস অ্যান্ড প্রসিড টুওয়ার্ডস দ্য মিটিং! বাই।”
গোটা ব্যাপারটা এমন করে ঘটে গেল যে, আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দেখল, রুপিন দ্রুত হেঁটে এসকালেটর বেয়ে নেমে গেলেন নীচে।
একটা ঘড়ির বাক্স! এটা কখন কিনলেন রুপিন! ও যখন অন্যমনস্ক হয়ে ঘড়ি দেখছিল তখন? ও কী করবে? ঘড়ি তো পরে না! কিন্তু ফেরত দেওয়াটাও তো ভাল দেখাবে না! তা হলে? আইকা মাথা নাড়ল নিজের মনে। লজ্জা করছে খুব। অপ্রস্তুত লাগছে খুব! এটা কী হল? এভাবে গিফট করলেন কেন রুপিন? আইকা তো এটা চায়নি! আশাও করেনি! এভাবে ধন্যবাদ জানানোর কী দরকার ছিল! আইকার তো ভালই লাগছিল এই শপিংটা করতে। কিন্তু আর কিছু করার নেই। কাঁধের বড় ব্যাগে বাক্সটা ভরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল আইকা।
এসকালেটার দিয়ে উঠে খাবারের জায়গা। একপাশে বাচ্চাদের খেলাধুলোর দোকান। কফি শপ। আইসক্রিমের কাউন্টার। সিনেমা হলও আছে। কিন্তু সেই দিকে না গিয়ে অন্যদিকে এগোল আইকা। সামনে ঝলমলে একটা জায়গা। এই রেস্তরাঁর কথাই বলেছে তারক।
কাচের দরজার সামনে একটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। আইকা যেতেই মাথা নেড়ে ওকে অভিবাদন করল। তারপর খুব ভদ্রভাবে বলল, “উই আর কমপ্লিটলি অকুপায়েড ম্যাম। প্লিজ় রাইট ডাউন ইয়োর নেম। উই উইল কল ইউ!”
আইকা বলল, “কিন্তু আমি যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, সে ভেতরে আছে!”
“সরি ম্যাম,” মেয়েটি সামান্য হেসে বলল, “ইউ হ্যাভ টু ওয়েট…”
“আরে!” আইকা বলল, “ব্যাপারটা বুঝুন। একজন এসেছেন! আমি দেখা করতে এসেছি তাঁর সঙ্গে!”
“সরি ম্যাম, ইউ হ্যাভ টু ওয়েট!” হাসি-হাসি মুখ থাকলেও মেয়েটার গলায় জেদ।
“কী বে?” আচমকা রেস্তরাঁর ভেতর থেকে তারক বেরিয়ে এল।
মেয়েটি ঘাবড়ে গেল বেশ। তারকের অমন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। কপালে কমলা রঙের তিলক। গলায় উত্তরীয়। পায়ে সাদা স্নিকার্স। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে লোকটি কী করে বা কীসের সঙ্গে যুক্ত।
আইকা দেখল, বাইরে থেকেও তিন-চারজন ছেলে এগিয়ে এল। চোয়াড়ে ধরনের চেহারা তাদের। মুখ দেখলেই বোঝা যায় নেতাদের পেছনের চামচা এগুলো। তারক ভেতরে থাকলেও এরা বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইকার বিরক্ত লাগে এই শ্রেণির লোকজনকে দেখলে। একা কিছু করার যোগ্যতা বা ক্ষমতা নেই! নেতাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে গুন্ডামি আর ধমক-ধামক দেওয়া শুধু! আইকা মাঝে মাঝে ভাবে আসলে কিছুই পালটায়নি। আগে বর্গিরা যুদ্ধের সময় ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করত আর বাকি সময় লুঠতরাজ করত, এখনও এরা ভোটের সময় পার্টিগুলোর হয়ে ‘খাটাখাটনি’ করে, তারপর নানাভাবে তোলাবাজি আর গুন্ডামি করে বেড়ায়! ইতিহাসে, জামাকাপড় আর মুকুটের রংই পালটায় শুধু, মানুষগুলো একইরকম থেকে যায়।
