আজ ওই সাড়ে তিনটের সময় তারকের সঙ্গে কথা বলার পর রুপিনকে ফোন করেছিল আইকা। না করলেও হত, কিন্তু তাও মনে হয়েছিল রুপিনকে একটু জানিয়ে রাখা ভাল!
দু’বার রিং হতেই ফোনটা ধরেছিলেন রুপিন।
“স্যার, আমি এক মিনিট কথা বলতে পারি?” আইকা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
“শিয়োর, বলো,” রুপিন নরম গলায় বলেছিলেন।
আইকা সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে তারকের সঙ্গে হওয়া কথার মূল বিষয়টা বলেছিল।
রুপিন সবটা শুনে সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিলেন, “নিশ্চয় দেখা করবে। আর ও যখন নিজে থেকে যোগাযোগ করছে, নিশ্চয় কিছু বক্তব্য আছে। জাস্ট ডোন্ট কমিট এনিথিং। তুমি শুধু শুনবে! কেমন?”
“থ্যাঙ্কস স্যার,” আইকা ভেবেছিল রেখে দেবে।
“আইকা,” রুপিনের গলায় সামান্য দ্বিধা শুনেছিল ও।
“স্যার?”
“মে আই টেক সাম অফ ইয়োর টাইম! মানে, ইটস ইমপর্ট্যান্ট। আই নিড সাম হেল্প,” রুপিনের প্রতিটা কথায় দ্বিধা ঝরে পড়ছিল।
“স্যার, ডোন্ট হেজ়িটেট, প্লিজ় বলুন,” আইকা যতটা সম্ভব আশ্বস্ত করেছিল রুপিনকে।
রুপিন সামান্য লাজুক গলায় বলেছিলেন, “আসলে আমার বোনের কাল টোয়েন্টি ফিফ্থ ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি! আই নিড টু পিক আপ সাম গিফট ফর হার! মানে জুয়েলারি নয়। সাম নাইস ওয়ান্স। বাট আই কান্ট জ়িরো-ইন টু সামথিং স্পেসিফিক। তাই আজ মানে… ইফ ইউ লেন্ড মি সাম অফ ইয়োর টাইম… দেন… তোমার কনভিনিয়েন্ট টাইম বোলো, আই উইল বি দেয়ার!”
“স্যার, কোনও অসুবিধেই নেই,” রুপিনের এমন ইতস্তত ভাব দেখে খুব হাসি পেয়ে গিয়েছিল আইকার, “আমি তো ওই মলে যাবই। তো আপনি যদি ছ’টার সময় আসতে পারেন। তা হলে মনে হয় কেনা হয়ে যাবে।”
“সো কাইন্ড অফ ইউ,” রুপিন যেন স্বস্তি পেয়েছিলেন, “প্লিজ় ডোন্ট মাইন্ড। আসলে আমি এসব করিনি তো কোনওদিন।”
আইকা যেন মনে মনে দেখতে পাচ্ছিল রুপিনের ফরসা মুখটা কেমন যেন লাল হয়ে উঠছে!
“হাই আইকা!” রুপিন সামনে এসে দাঁড়ালেন, “আয়াম সরি, ইউ হ্যাড টু ওয়েট! স্যাটারডে করে আজকাল চারদিকে এত জ্যাম হয়! সরি।”
“স্যার প্লিজ়!” আইকা হাসল।
“ইউ ক্যান কল মি রুপিন! আমরা তো অফিসে নেই আর! আই ডোন্ট লাইক প্রোটোকলস!”
আইকার লজ্জা লাগল হঠাৎ। এমন করে রুপিন বললেন, যেন নাম ধরে ডাকাটা কোনও ব্যাপার নয়!
ও পাশ কাটিয়ে বলল, “চলুন স্যার। ভেতরে যাওয়া যাক!”
রুপিন শুনে হাসলেন একটু। নিজের মনে মাথা নাড়ালেন। তারপর মলের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
আইকাও রুপিনের পেছনে-পেছনে এগোতে গেল। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে কাকে যেন দেখে একটু থমকে গেল। ও মুখ ফেরাল। একটা ছেলে। বেশ লম্বা। ভাল চেহারা। একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্যদিকে তাকিয়ে।
আইকার কেমন যেন লাগল। ছেলেটা এখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও ওর মনে হল, ছেলেটা একটু আগে ওকেই দেখছিল! খুব চেনা লাগল ছেলেটাকে। কিন্তু মনে করতে পারল না। কে এটা? মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর!
“আর ইউ কামিং?” রুপিন পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন।
আইকা হেসে এগিয়ে গেল।
মলের ভেতরে ঢুকে ভাল লাগল আইকার। ঠান্ডা! চারিদিকে লোকজন থাকলেও তাতে খুব কিছু অসুবিধে হচ্ছে না! বরং ভালই লাগছে। এই মলগুলো কেমন ঝকঝক করে! কিন্তু যে-মানুষগুলো এই মলে আসে তারাই কলকাতার অবস্থা কী খারাপ করে রেখেছে! যেন দুটো আলাদা ডাইমেনশন! নয়তো যেন মানসিক রোগে ভুগছে সবাই। একের মধ্যে দু’রকম বিপরীত মানুষ ঢুকে বসে আছে!
“স্যার, আপনি কী কিনতে চান?” আইকা তাকাল রুপিনের দিকে।
রুপিন অসহায়ের মতো তাকালেন আইকার দিকে। মাথা নেড়ে হাত ছড়িয়ে বললেন, “নো ক্লু! আমি জানি না বোন কী পছন্দ করে! আর শুধু বোন নয়, আমার বোনাইয়ের জন্যও কিছু কিনতে চাই। পারফিউম দেব না। কারণ, আই অ্যাম আ বিট সুপারস্টিশাস! আদার দ্যান দ্যাট ইউ চুজ়।”
আইকা ইতস্তত করল। রুপিন বলছেন বটে, কিন্তু কত বাজেট সেটা বলছেন না! তা হলে কী করে কিনবে ও?
ও রুপিনের দিকে তাকিয়ে হাসল। রুপিন যেন বুঝতে পারলেন কিছু! বললেন, “অ্যারাউন্ড ফিফটি থাউজ়্যান্ড ইজ় মাই লিমিট টুডে।”
বাপ রে! আইকা মনে মনে চমকে উঠল! পঞ্চাশ হাজার টাকার গিফট! সোনা দেবেন না এদিকে!
ও ঠোঁট কামড়ে তাকাল রুপিনের দিকে। তারপর বলল, “রিস্ট ওয়াচ!”
“গ্রেট চয়েস!” সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়লেন রুপিন, “রিস্ট ওয়াচ জিনিসটা খুব তাড়াতাড়ি একটা অ্যান্টিক ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে! এটা ভাল বলেছ! লেটস্ বাই দেন!”
এসকালেটার বেয়ে ওরা ওপরে উঠে গেল। ঘড়ির দোকানটা আলোয় ঝলমল করছে! আইকা ভাবল এরা কত টাকা ইলেকট্রিক বিল দেয়! তারপরেই হাসি পেয়ে গেল। এখনও মাঝে মাঝে ওর মনের ভেতরে যাদবপুরের কলোনির একটা ঘরে বড় হওয়া মেয়েটা বেরিয়ে পড়ে। মেঘ করে আসা বর্ষাকালে লেখাপড়া করবে বলে দিনের বেলায় একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যাকে বাড়িওয়ালি জেঠিমার কাছে গালাগালি খেতে হত!
ওরা দোকানে ঢুকতেই খুব সাজগোজ করা একটা মেয়ে এগিয়ে এল ওদের দিকে। মেয়েটা একটা টপ আর স্কার্ট পরে আছে। মুখে আচ্ছা করে রং লেপেছে! গায়ের রং যে কারও এমন অদ্ভুত কমলা হতে পারে না, সেটা মেকআপ করার সময় মেয়েটার মনে ছিল না!
