লোকটার কথার সঙ্গে একটা শোঁ শোঁ শ্বাসের শব্দ পাচ্ছিল ও। কেমন যেন বিরক্ত লাগছিল। ও বলেছিল, “কাল আমার ছুটি। আমি সোমবার দেখা করব?”
“আরে, আপনাকে দেখা করতে আসতে হবে না আমার কাছে। আমিই যাব আপনাদের ওদিকে! দেখুন, এখানে আমায় সবাই চেনে। কে এল, কে গেল সবাই নজর করে। বন্ধু আর অনুগত সেজে সবাই ঘুরে বেড়ায় আমার চারিদিকে। কিন্তু তাই বলে কেউ তো আর বন্ধু নয়। আমায় পদে-পদে সব দেখে চলতে হয়। তাই আমিই যাব কাল। এই ধরুন বারোটা নাগাদ! পার্টির দপ্তরে কাজ আছে আমার। সেটা চুকিয়ে যাব। কোথায় বসবেন, আপনি ঠিক করবেন। আমি পৌঁছে যাব। আর আমি কিন্তু নেমন্তন্ন করলাম। আশা করি আমায় না করবেন না!”
মাগো অস্থির হচ্ছিল আইকার কোলে। বারবার মোবাইলটা ধরে টানাটানি করছিল। নিজের ভাষায় কীসব ইকির-মিকির বলে যাচ্ছিল!
আইকা ছোট কথায় কাজ সারতে চাইছিল। ও বলেছিল, “ঠিক আছে। সকালে আমি আপনাকে ফোন করে নেব। আমায় আমার বসের সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে!”
“আরে, আপনার বেবি আছে? কথা শুনছি?” তারক অবাক হয়েছিল যেন!
“মানে?” চমকে গিয়েছিল আইকা!
“ওই যে শুনছি!” হেসেছিল তারক, “আপনাকে দেখলে কিন্তু ইয়ে বোঝা যায় না যে… মানে এমন ফি… মানে নিজেকে ধরে রেখেছেন!”
আইকা আর উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “কাল সকালে আমি আপনাকে জানাচ্ছি। গুড নাইট।”
তারক গুড নাইট বলার আগেই ফোনটা কেটে দিয়েছিল আইকা। কেমন গা ঘিনঘিন করছিল! লোকটার চোখে কেমন একটা আঠা আছে! ফোনে কথা বললেও লোকটার দৃষ্টি যেন ওকে নোংরা করছিল!
আইকা কথার কথা হিসেবে বলেছিল যে, বসকে ফোন করবে! কিন্তু আসলে তার তো দরকারই নেই! রুপিন আইকাকে একটা পর্যায় অবধি ছাড় দিয়েই রেখেছেন। এসব সিদ্ধান্তর জন্য ওকে কারও সঙ্গে কথা বলতে হবে না।
সকালে আলমারি গোছানো, পার্লার যাওয়া সব বাতিল করে দিয়েছিল আইকা। তারপর তারককে ফোন করেছিল। কিন্তু তারক ফোন ধরেনি! অবাক হয়ে গিয়েছিল আইকা! নিজেই তো বলল দেখা করার কথা। আর এখন রিং হয়ে যাচ্ছে! তাও ফোন ধরছে না! এ কেমন অসভ্যতা!
সারা দুপুর কেটে গিয়েছিল। শেষে আইকা খেয়ে নিয়েছিল। তারপর বেলা সাড়ে তিনটের সময় এসেছিল তারকের ফোনটা! খুব দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিল, পার্টি অফিসে এমন কাজে আটকে পড়েছিল যে, ফোনটা ধরতে পারেনি। সন্ধে ছ’টার পরেই একমাত্র ও দেখা করতে পারবে।
আইকা কথা বাড়ায়নি! ও বলেছিল সন্ধে সাড়ে ছ’টার সময় রাজডাঙার কাছের মলটায় দেখা করতে পারবে ও! তারক এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল!
কিন্তু রুপিন কই? আইকা দু’দিক দেখল। গাড়ি এসেই যাচ্ছে ক্রমাগত! রাস্তা যে পার হবে তার উপায় নেই! আজকাল দূরের জিনিস দেখতে একটু সমস্যা হচ্ছে ওর! পাওয়ার বাড়ল নাকি? ও একবার মোবাইলটা দেখল। রুপিনকে কি একবার ফোন করবে? তারপরই মত পালটাল! ছ’টায় দেখা করার কথা। একটু দেখে নিয়ে তারপর ফোন করবে। এত সামান্যতে অধৈর্য হলে হবে না।
এই মলটা নতুন হয়েছে। বেশ বড়। আইকার ভালই লাগে এইসব জায়গায় আসতে। শপিং করতে খুব ভালবাসে ও। ছোটবেলার না পাওয়া সব কিছু এখন মনে হয় কেনে। মনে হয়, জীবন যা-যা করতে দেয়নি ওকে, সেইসব করে! শুভ ওকে কোনও কিছু করতে বারণ করেনি কোনওদিন। কিছু কিনতে, কোথাও যেতে বারণ করেনি। কিন্তু নিজেই যে অমন চট করে চলে যাবে, সেটা বুঝতে পারেনি আইকা! শুভ বারণ না করলেও ও বেহিসেবি কাজ বা খরচ করত না! কিন্তু শুভ মারা যাওয়ার পর, আইকার মধ্যে থেকে যেন আর-একটা আইকা বেরিয়ে এসেছে। শুভ মারা গিয়ে যেন ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে এই জীবন কতটা ভঙ্গুর! কতটা অনিশ্চিত! ওই ঘটনাটা যেন ওকে শিখিয়েছে যা আছে, যতটুকু আছে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার মানে হয় না। জীবনকে কৃপণের মতো খরচ করা আর জীবনকে বাজে খরচ করার মধ্যে কোনও তফাত নেই। মনের সামান্য ইচ্ছেগুলোকে মেরে ফেলার কোনও মানে হয় না। আগের চেয়ে আইকা তাই নিজেকে মেলে ধরেছে অনেকখানি! শুভ যে বলত, কার্পে ডিয়েম, সেটার মানে বুঝতে পেরেছে এখন।
সামনের রাস্তায় গাড়ি একটু কমে এসেছে এবার। সিগনালটা বন্ধ হয়েছে নিশ্চয়! এই সুযোগে সামান্য হেঁটে আর দৌড়ে রাস্তা পার হল আইকা।
মলের সামনেটা কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো। সেখানেও লোকজন দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এখানে হাওয়া আরও বেশি! হাওয়ায় সব যেন লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে! আইকা মাথার চুলগুলোকে সামলে সিঁড়ির ধাপ ভেঙে উঠে লম্বা বাঁধানো চত্বরে দাঁড়াল।
আকাশের নীল কমে এসেছে আরও। আশপাশটা আলোয় ঝলমল করছে। আইকা আবার দেখল চারদিকে। আর এবার দেখতে পেল রুপিনকে। একটা মেরুন টি-শার্ট আর নীল জিন্স পরে গাড়ি থেকে নামছেন। গায়ের ফরসা রঙের সঙ্গে অমন টি-শার্টটা যেন সবার মধ্যে আরও বেশি করে চোখে পড়ছে! রুপিনকে কোনওদিন এমন ইনফরমাল জামা কাপড়ে দেখেনি আইকা। তাই অদ্ভুত লাগল। আর যেন এই প্রথম খেয়াল করল রুপিনকে দেখতে বেশ ভাল! অনেকটা জর্জ ক্লুনির মতো।
রাস্তা থেকেই রুপিন হাত তুললেন। হাসলেন আইকাকে দেখে! আইকাও হাসল। আসলে ওর একটু অস্বস্তি হচ্ছে। রুপিনের সঙ্গে এভাবে আগে কখনও তো বাইরে দেখা করেনি! তাই কেমন একটা লাগছে!
