“দিদি সামনে নামবেন কি? না, এইখানে রাখব?”
ট্যাক্সিওয়ালার ডাকে হুঁশ ফিরল আইকার। ও তাকাল সামনে। বাঁদিকে বাঁক নিয়ে গাড়িটা মলের মূল ফটকের উলটো ফুটপাথে দাঁড়িয়েছে।
“ব্যস এখানেই,” আইকা টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল, “কত হয়েছে?”
ভাড়া মিটিয়ে রাস্তায় নেমে এদিক-ওদিক তাকাল আইকা। গাড়ির স্রোত চলেছে। ও ঘড়ি দেখল। ছ’টা বাজে। আকাশে আলো আছে এখনও। ও ওপরের দিকে তাকাল। পাখিদের একটা রেখা ওই ওপর দিয়ে উড়তে-উড়তে বেরিয়ে যাচ্ছে!
রুপিন কি এসে পড়েছেন! আইকা এপার থেকেই ওপারের মলের সামনের বড় বাঁধানো জায়গাটা দেখল। কোথায়! চোখে তো পড়ছে না! এদিকে পৌনে সাতটা নাগাদ এখানেই আর-একটা কাজ আছে। তারক চক্রবর্তী আসবে দেখা করতে!
আজ শনিবার বলে ছুটি ছিল আইকার। ভেবেছিল বাড়িতেই থাকবে। নিজের আলমারিটা একটু গোছাবে। তারপর পার্লারে যাবে। বেশ কিছুদিন হল পার্লারে যাওয়া হয়নি। আইব্রো করাটা খুব জরুরি। তা ছাড়া চুলটাও কাটবে। কিন্তু তারক চক্রবর্তী যে এমন করে দেখা করতে চাইবে, সেটা বুঝতে পারেনি।
গতকাল বিকেলে লোকটা নিজে ফোন করেছিল আইকাকে। আসলে এর আগে আইকা গিয়ে দু’বার দেখা করে এসেছে সোনাঝুরিতে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, কাজের কাজ কিছু হয়নি! তারক শুধু কথা দিয়ে মেপে গেছে ওকে। এমনকী এমনও ইঙ্গিত করেছে যে, আইকা মেয়ে হয়ে কেন এমন ঝামেলার কাজে ঢুকছে!
লোকটা যে অশিক্ষিত আর নোংরা, সেটা কথা আর চোখমুখ দেখেই বুঝেছে! কথা বলার সময় সমানে আইকার বুকের দিকে তাকাচ্ছিল ও। এটা নতুন কিছু নয়। অনেক ছেলেই এমন করে। তবে সেটা অসতর্ক ভাবে বা লুকিয়ে-চুরিয়ে। কিন্তু এই লোকটা এমন করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল যে, আইকা শেষমেশ বড় ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়ে বুকটা আড়াল করে বসতে বাধ্য হয়েছিল! তাতে তারক বলেছিল, “আরে, শীত করছে নাকি! তবে এসিটা বন্ধ করে দিই!”
আইকার বিরক্তি আর ফ্রাস্ট্রেশন বাড়ছিল। ভাবছিল, দু’-দু’বার দেখা হয়ে গেল, কিন্তু লোকটা কিছুই বলছে না! যেন অপেক্ষা করছে! যেন দেখছে, আরও কেউ খেলায় নামবে কি না! যত বেশি পার্টি এই সোনাঝুরির জমি, বাড়ি আর জুট মিলের দিকে হাত বাড়াবে তত বেশি করে তারকের লাভ! দরকষাকষিটা আরও ভাল হবে আর কী!
সেই দুটো দিন আইকার বেকার গিয়েছে! ওই ভীষণ খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে অতটা যাওয়ার কোনও ফলই হয়নি! ও বুঝতে পারছিল তারক ওকে লেজে খেলাচ্ছে মাত্র!
তারক শুধু ওকে বলেছিল, “আপনি আসছেন, কথা বলছেন আমার খারাপ লাগছে না! সুন্দরীদের সান্নিধ্য কে না চায়! কিন্তু আমায় একটু হিন্ট দিন তো, আমার জন্য কী ভেবেছেন? মানে, আমায় কতটা যোগ্য মনে করছেন, সেটা আমায় জানতে হবে তো!”
অফিস থেকে বলে দেওয়া একটা ডিল তারককে অফার করে এসেছে আইকা। তারক কিছু বলেনি, শুধু হেসেছে!
জুট মিল, পাশের বিস্তীর্ণ জায়গা আর জোনাক-বাড়ি গোটাটাই মালিক গ্রুপের। ওদের সঙ্গেও কথা বলছে আইকা। এমনকী রুপিন নিজেও বলছে। মুশকিলটা হল, কিছুতেই আসল মানুষটার নাগাল পাচ্ছে না ওরা। ডিরেক্টররা বলেছেন যে, চেয়ারপার্সনই কিন্তু শেষ ‘কল’-টা নেবেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই দেখা করছেন না! আইকা জানে ব্যাপারটা সহজ নয়। কারণ, এ এক বিরাট কর্মকাণ্ড। বোর্ডের লোকজন তো বলছেন, মিলের অবস্থা ভাল নয়। তাই তাঁরা সবটাই ছেড়ে দিতে চান! কিন্তু আসল জায়গা থেকে এখনও নাকি কিছু সেভাবে বলা হয়নি! চেয়ারপার্সন এখনও নাকি কোনও সিদ্ধান্ত নেননি!
আইকার অবাক লেগেছিল। একটা কোম্পানি, তারা তাদের জায়গা বিক্রি করে দেবে, তাতে তারক চক্রবর্তীকে কেন যোগাযোগ করতে হবে! রুপিনকে সেই কথাটা জিজ্ঞেসও করেছিল আইকা!
রুপিন সব শুনে হেসেছিলেন খুব। বলেছিলেন, “তুমি এমন বাচ্চা কেন আইকা! আমরা একটা মিল কিনে সেটা বন্ধ করে দেব। কত লোকের চাকরি যাবে বলো তো? তা ছাড়া ওই জমিতে জবরদখল করে হলেও বেশ কিছু লোক দোকান, বাড়ি করে রয়েছে! মাস ইভাকুয়েশন হলে তার একটা ব্যাকল্যাশ আসবে না? সেটা সামলাবে কে? প্লাস আরও নানা ঝামেলা আছে! পলিটিক্যাল পার্টির হেল্প তো লাগবেই! অ্যান্ড হিয়ার তারক চক্রবর্তী কাম্স ইনটু প্লে!”
সেই তারক চক্রবর্তী আচমকা গতকাল ফোন করেছিল।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে স্নান সেরে সবে মাগোকে নিয়ে বসেছিল আইকা। মাগোর জন্য একটা জামা কিনে এনেছিল। সেটাই পরিয়ে দেখবে ভেবেছিল। কিন্তু তখনই ফোনটা এসেছিল।
বিরক্তই হয়েছিল আইকা। সারাদিন অফিসে নানা ঝামেলা থাকে। তারপর কাজের শেষে আবার ফোন এলে খুব রাগ হয়!
ফোনটা তুলে নম্বরটা দেখেছিল। চিনতে পারেনি আইকা। একটা ল্যান্ড লাইনের নম্বর! সামান্য দ্বিধা নিয়ে ধরেছিল কলটা।
“ম্যাডাম, আমি তারক বলছি।”
আইকা থমকে গিয়েছিল। লোকটা নিজে ফোন করল! কেন? ব্যাপার কী?
“বলুন?” আইকা যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও অনাগ্রহী গলায় বলেছিল।
তারক সময় নিয়েছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, “কাল একবার কথা বা দেখা হতে পারে?”
“কথা না দেখা?”
সামান্য ভেবে তারক বলেছিল, “দেখা। মুখ না দেখলে আমি আবার কথা বলতে পারি না! এই যে আপনার সঙ্গে কথা বলছি, আমার অস্বস্তি হচ্ছে! কারণ, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।”
