বুদা উত্তেজিত মুখ নিয়ে একবার পলির দিকে তাকাল আর-একবার রাধিয়াকে দেখল। তারপর আচমকা কিছু না বলে দুমদাম করে চলে গেল বড় রাস্তার দিকে।
“আরে!” রাধিয়া আটকাতে গেল। কিন্তু এবার জয়তী হাত টেনে ধরল ওর। বলল, “ছাড়! জানিস তো বুদাটা খেপি। মাথা ঠান্ডা হলে নিজেই আসবে!”
রাধিয়ার মনমেজাজ এমনিতেই ভাল নেই। বুদার এভাবে চলে যাওয়াতে ওর মন আরও খারাপ হয়ে গেল। মানুষ কেন এমন করে কে জানে! ও তাকিয়ে দেখল বুদা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল!
“আরে, বুদা চলে গেল দেখলাম!” সুম্পা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল এবার, “পলি তোর হোমের টাকা তোলারও ব্যাপার আছে কিন্তু। সেখানে এখন আসছিস তুই?”
জয়তী বলল, “ও বুদার রাগ হয়েছে! ছাড়!”
সুম্পা পলির হাত ধরে বলল, “আয় তোরা। লোকজন অল্প-অল্প করে আসছে! আর রাধিয়া তোর সঙ্গে একজন একটু কথা বলতে চায়!”
ওরা অ্যাকাডেমির সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল সবাই।
রাধিয়া অবাক হয়ে বলল, “আমার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ, ও…” সুম্পা হাত দিয়ে সামনে দেখাল!
রাধিয়া চোখ তুলে তাকাল! আর সঙ্গে-সঙ্গে চমকে স্থির হয়ে গেল একদম! নিশান! তাই তো! ও তো সুম্পার দাদার বন্ধু!
“তুই কথা বলে ওপরে আয়!” সুম্পা বাকিদের টানতে-টানতে সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল!
নিশান সামান্য হাসিমুখে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। রাধিয়ার কেমন যেন অস্বস্তি হল! কিন্তু আবার কেমন একটা ভালও লাগল! হাওয়ায় নিশানের চুলগুলো উড়ছে। মেরুন পাঞ্জাবিটাও হেমন্তের জং-ধরা প্রজাপতির মতো উড়ছে!
নিজের শাড়ির আঁচলটা সামলে রাখল রাধিয়া। কেন এমন নার্ভাস লাগছে ওর! কান কেন গরম হয়ে যাচ্ছে! নিশানের খয়েরি চোখের মণির দিকে তাকাতে পারছে না কেন? এত হাওয়াতেও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াটা কি স্বাভাবিক!
নিশান হাসল সামান্য। সময় নিল একটু। তারপর নরম গলায় বলল, “আমার একটু দরকার ছিল আপনার সঙ্গে! জরুরি দরকার!”
রাধিয়া কিছু বলার আগেই হাওয়ার বেগ বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতার সঙ্গে ফুলের পাপড়ি উড়ে এল দিগ্বিদিক থেকে! মানুষজন সামান্য থমকে গেল যেন! তাদের কথা যেন থেমে গেল সামান্য সময়ের জন্য। কলকাতা যেন জামার ওপরের বোতামটা খুলে একটু হেলিয়ে বসল! আর কোথা থেকে একটা ঝড়ের কুটো উড়ে এসে আটকে গেল রাধিয়ার গালে! রাধিয়া বিহ্বল হয়ে দেখল নিশান সামান্য ঝুঁকে ওর গালের ওপর থেকে সরিয়ে দিল ঝড়ের কুটোটা! ওই সামান্য স্পর্শ! ওই সামান্যতম কাছে আসা! সামান্য ঝড়ের অছিলায় ওইটুকু নিভৃত মুহূর্ত আচমকা কী যে ওলটপালট করে দিল বুকের ভেতর, বুঝতে পারল না রাধিয়া! ও থমকে গেল এক মুহূর্ত! তারপর মাথা নিচু করে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে!
“আরে, কী হল?” নিশান এগিয়ে এল আরও কাছে! হাওয়ার জোর বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতা পাক খেয়ে উঠল রাধিয়ার মনের শূন্যতায়! ফুলের পাপড়ি আর ধুলোর ইশারা এসে জড়িয়ে গেল ঘাড়ে, গলায়! শেষ আলোর আবির এসে গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ওর গালে! রাধিয়া বুঝতে পারল না কিছু। শুধু হু হু করে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে লাগল ওর! যেন আবছা শুনতে পেল একটা উদ্বিগ্ন গলা বলছে, “কী হল? রাধিয়া, কী হল আপনার?”
রাধিয়া মাথা নামিয়ে মুখ ঢাকল হাতে। পাতায় জমে উঠতে লাগল ফোঁটা ফোঁটা হীরকখণ্ড। ও কথা বলতে পারল না কোনও। ওর মনে হল, কথা তো পরিমিত! তার সাধ্য সামান্য! সে কী করে বলবে কেন আচমকা পাহাড় ফাটিয়ে ঝরনা বেরিয়ে আসে! কী করে বলবে, কোন মুহূর্তে গুটি কেটে উড়ে যায় প্রজাপতি! কেন অমন সূর্য লেগে বরফ থেকে ছিটকে ওঠে আলোর ক্রেয়ন!
রাধিয়া মাথা নামিয়ে, চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। আর দেখল এতদিন পরে পাগল হাওয়ার টানে, নিচু হয়ে আসা মেঘ কেটে কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে বহু-বহু বছর স্তব্ধ হয়ে থাকা ব্রোঞ্জের পরি!
২০. আইকা
সিগনাল থেকে বাঁ দিকে ঘুরতেই হু হু করে হাওয়া ঢুকে এল ট্যাক্সির জানলা দিয়ে। আইকার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল নিমেষে। আরামে চোখও বুজে এল! যা ভ্যাপসা গরম পড়েছে! ভাদ্র মাসের এই এক সমস্যা! বৃষ্টি বন্ধ হলেই চারদিক থেকে যেন কেউ গরম বাষ্প ছাড়তে শুরু করে! ঘাম হলে খুব কষ্ট হয় আইকার। ঘাম জিনিসটা কিছুতেই নিতে পারে না! আর আজকাল এসি-তে থাকতে-থাকতে অভ্যেসটাই খারাপ হয়ে গেছে! কিছুতেই সামান্য গরমও সহ্য হয় না! এই যে হলুদ ট্যাক্সিতে বসে আছে, এতেও খুব কষ্ট হচ্ছে ওর!
আজ নিজে ড্রাইভ করতে ইচ্ছে করছিল না। ভেবেছিল ভাড়া করে নেবে গাড়ি। তাই বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ও দেখছিল কোনও অ্যাপ ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে কি না। কিন্তু কোনও গাড়ি নেই। আজকাল ছুটি হলেই দেখেছে গোটা শহরটা কেমন যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে রাস্তায় আর শপিং মলে। আজকাল শপিং করাটাও একটা এন্টারটেনমেন্ট! সারাক্ষণ কিছুতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায় যেন মানুষ! এসব কি একাকিত্বের লক্ষণ? কিন্তু আজকাল তো চারিদিকে এত রকমের যোগাযোগের উপায়! আইকার মনে হয়, এই বাড়াবাড়িটাই বিপদের কারণ। দরকারের চেয়ে বেশি জিনিস কোনওদিনও ভাল নয়। বেশি যোগাযোগের ভিড়ে সত্যিকারের সম্পর্ক হারিয়ে যাচ্ছে। কথা হারিয়ে যাচ্ছে। নানারকমের হলুদ গোল্লাওয়ালা মুখ জানিয়ে দেবার চেষ্টা করছে হাসি, কষ্ট আর মনখারাপ! বুড়ো আঙুলের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে! আইকার মাঝে মাঝে মনে হয় এমন চলতে থাকলে কয়েকহাজার বছর পরে কি আস্তে-আস্তে মানুষের হাতের বাকি আঙুল সব লুপ্তপ্রায় হয়ে যাবে!
