বাবা বলেছিল, “রাধি, তোকে স্টেটসে পাঠিয়ে দেব মাস্টার্স কমপ্লিট হলে। আমি কথা বলে রেখেছি। সামনের অক্টোবরে যাব যখন, সব দেখে-শুনে আসব। আর এখানে নয়। আমাদের বিজ়নেসে তোকে তো জয়েন করতে হবে। সো ইউ নিড টু লার্ন ফ্রম দ্য বেস্ট। আমাদের ইচ্ছে আছে দুবাইতেও কিছু এক্সপ্যানশনের। ফলে উই নিড অ্যান এব্ল ম্যানেজমেন্ট! সো গিয়ার আপ। প্রিপেয়ার ফর কামিং ব্যাটল্স।”
রাধিয়া কিছু বলেনি। ও জানে বাবার মুখের ওপর হ্যাঁ বা না বলে কোনও লাভ নেই। ঠাকুরমা থাকলে তাও কিছুটা বাফার পাওয়া যেত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ঠাকুরমা কেমন যেন আরও চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছে না রাধিয়া। রহস্যকাহিনি পড়তে ভাল, কিন্তু জীবনে রহস্য এসে ঢুকলে খুব সমস্যা হয়। বিশ্বাসটা নড়ে গেলে মানুষের সব বিষয়েই সন্দেহ হয়। এখন যেমন ওর মনে হচ্ছে। ওর কোথাও মনে হচ্ছে, বাবা ওকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে চাইছে! ও আছে বলে বোধহয় বাবার কিছু ব্যাপারে অসুবিধে হচ্ছে!
রাধিয়া সোজা হয়ে বসল। বাবার ব্যাপারটা মাথার ভেতর ঘুণপোকার মতো কাটছে ওকে। কাউকে না বলতে পারলে মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাবে! কিন্তু বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না। কাকে বলা যায়। ও বান্ধবীদের দেখল আর-একবার। নাঃ, এদের বলা যাবে না!
জয়তী বলল, “তোর কত সুবিধে রাধি। আমাদের মতো নয়। আমার মা তো এখনই বিয়ে দেবে বলে পাগল করে দিচ্ছে! রৌদ্রকে কতবার বলছি তাড়াতাড়ি কিছু করো! কিন্তু ও পাত্তাই দিচ্ছে না! আমিও যদি কিছু পড়তে চলে যেতে পারতাম!”
“তা বারণ করছে কে?” বুদা বিরক্ত গলায় বলল, “এমন করছিস! যা না কম্পিটিটিভ একজ়ামে বোস। চান্স নে। আমাদের তো বাপের জোর নেই! নিজের জোরেই যা করার করতে হবে!”
কথাটা আচমকা থাপ্পড়ের মতো এসে লাগল রাধিয়ার গালে! ও চমকে উঠে তাকাল বুদার দিকে! এটা কী বলল বুদা? ইচ্ছে করে বলল? মানে এসব কথা তা হলে ওর মনের মধ্যে ঘোরে! পড়াশোনায় রাধিয়া ওদের সবার চেয়ে ভাল! ইউনিভার্সিটিতে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকে। সেখানে বুদা এটা বলতে পারল! রাধিয়া পালটা কিছু বলতে পারে না বলেই কি সবাই ওকে এমন করে বলে?
আচমকা রাধিয়ার চোখে জল এসে গেল! ও ঠোঁট কামড়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। ভিক্টোরিয়ার ইস্ট গেটের সামনে দিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে গাড়ি। পরির মাথায় যেন মেঘ নেমে এসেছে! বাইরে গাছপালা দেখে বোঝা যাচ্ছে হাওয়া দিচ্ছে খুব। রাধিয়ার মনে হল, এত হাওয়া, পরিটা যদি ডানা মেলে উড়ে যায়!
জয়তী বলল, “বুদা, এটা ঠিক বলছিস না।”
“কেন?” বুদা হাসল, “সত্যি কথা বললাম তো! তোদেরও মনে হয় এটা, কিন্তু ভালমানুষির প্রিটেনশন নিয়ে থাকিস। আমি সোজা মেয়ে, যা ভাবি বলে দিই!”
“ও পরীক্ষা দিলেও চান্স পেয়ে যেত,” পলি কথাটা বলে আলতো করে রাধিয়ার হাতে চাপ দিল!
“কিন্তু সেটা কি দেবে? নিজে কি ওকে কিছু করতে হবে? আমার বাবা ব্যাঙ্কে আছে! পলি তোর বাবার শাড়ির ব্যাবসা। জয়তীর বাবা অলরেডি রিটায়ার্ড! আমাদের সবাইকে নিজের দমে কিছু করতে হবে! আমাদের মুখে তো সোনার চামচ নেই!”
রাধিয়া ভাবল কিছু বলে। বুদা সব ঠিক বলছে না। পলিদের অবস্থাও খুব ভাল। হ্যাঁ, ওদের মতো নয়, কিন্তু শাড়ির ব্যাবসাটা বেশ বড়! জয়তীরাও উচ্চ-মধ্যবিত্ত। কিন্তু তারপর মত বদলাল। এই পৃথিবীতে যারা এমন ঋণাত্মক কথা ভাবে আর বলে তাদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই! একটা বয়সের পর কারও মত ঝগড়া করে পালটানো যায় না। নিজে তো রাধিয়া জানে ও কেমন! ও কী চায়! সেটাই আসল। বাকি পৃথিবী যা বলে বলুক! ও আর-একবার পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে পরিটাকে দেখল। উড়ে যাবে কি?
অ্যাকাডেমির সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে গেল মধুদা। পার্কিং-এর জায়গা খুঁজতে হবে।
জায়গাটায় ভিড় হয়ে আছে। নানা খাবারের দোকান ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। ওরা হাঁটতে-হাঁটতে সামনের দিকে এগোল। রাধিয়া দেখল বুদা আর পলি এখনও তর্ক করে যাচ্ছে।
জয়তী ওর পাশে এসে চাপা গলায় বলল, “সরি রাধি, স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে! ইচ্ছে করে বলিনি! বুঝতে পারিনি এটা বুদা ইসু করে তুলবে! বুদার মনে এই ছিল আমি জানতাম না! আজকাল সারাক্ষণ ওর মুড শিফট করে!”
নন্দন চত্বরে ঢুকে ওরা এগিয়ে গেল বাংলা অ্যাকাডেমির গেটের দিকে। এখানেও বেশ ভিড়। বুদারা বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, দু’জনেই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে! আশ্চর্য লাগল রাধিয়ার! দু’জনে এই বিষয়টা নিয়ে এভাবে ঝগড়া করছে কেন?
রাধিয়াও এবার এগিয়ে গেল। অ্যাকাডেমির গেটের সামনে বড় করে ফ্লেক্স লাগানো আছে। এই অনুষ্ঠানেই এসেছে ওরা। কিন্তু সেদিকে দু’জনের কারওই হুঁশ নেই! গেটের সামনে দাঁড়িয়েই পলি আর বুদা উত্তেজিত হয়ে কথা বলে চলেছে!
রাধিয়া গিয়ে এবার দাঁড়াল দু’জনের মাঝখানে। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে! লোকজন বিনে পয়সায় সার্কাস দেখতে পারলে আর কিছু চায় না!
“তোরা থামবি?” রাধিয়া পলির দিকে তাকাল প্রথমে, “বুদা আমায় বলেছে! ওর নিশ্চয় কিছু খারাপ লেগেছে তাই এমন বলেছে! তুই চুপ কর।”
পলি কিছু বলতে গেল, কিন্তু রাধিয়া ওর কথা পাত্তা না দিয়ে এবার বুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো! কেমন? তোরা চুপ কর।”
