সেই বিষয়েই তো তোমার পরামর্শ চাইছি। হলুদ রাক্ষসের খিদে বা রক্তপানের তৃষ্ণা দিন দিন যেভাবে বেড়ে উঠছে, তাতে তার রসদ জোগানো আমার পক্ষে আর বেশিদিন সম্ভব হবে না। প্রথম প্রথম ব্যাঙ, গিরগিটি, ইঁদুর প্রভৃতি চার্লিয়েছি, এখন বোজ পাঁচ থেকে ছয়টি মুরগি দিচ্ছি, কিন্তু তাতে বোধহয় ওর তৃপ্তি বা পুষ্টি হয় না। খাদ্য ছাড়া বাসস্থানের সমস্যাও রয়েছে। যেভাবে ও বাড়ছে, তাতে বড়ো জোর বছর দুই ওই ঘরে ওকে রাখা যাবে। তারপর?
সরকারকে জানালে সরকার নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করবে। আরও একটা কথা মনে হচ্ছে আমার ইঁদুর, বেজি প্রভৃতি জীব মানুষের আহার্য শস্য প্রচুর পরিমাণে নষ্ট করে;— সে ক্ষেত্রে হলুদ রাক্ষসের বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে মনুষ্যজাতিরও উপকার করা যায়।
তা হয়তো করা যায়। কিন্তু আমি এখনই আমার আবিষ্কার সরকারের হাতে তুলে দিতে চাই না। হলুদ রাক্ষস রক্তপায়ী জীব হলেও ভালোবাসতে জানে। ও আমায় ভালোবাসে, আমার কথা বুঝতে পারে। ওকে নিয়ে আমি আরও পরীক্ষা করতে চাই।
-তোমার কথা বুঝতে পারে? তাহলে ডিকের মৃত্যু ঘটল কেন?
–ডিক আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি আমি অকুস্থলে উপস্থিত হতে পারতাম, তাহলে ডিকের মৃত্যু হত না। কিন্তু আমি যখন অকুস্থলে হাজির হয়েছিলাম, তখন হলুদ রাক্ষস রক্তপানে উন্মত্ত। তাছাড়া ডিক কিছু নিরীহ জীব নয়, সেও আঁচড়ে কামড়ে গাছটাকে আহত করেছিল। রক্তপায়ী হলেও হলুদ রাক্ষসের শরীর অন্যান্য গাছের মতো শক্ত নয়, প্রায় কলাগাছের মতো নরম। ওঁর শুঁড় বা বাহুগুলো শক্ত রবাবের মতো, তবে ডিক-এর মতো শক্তিশালী হাউন্ডের ধারাল দাঁত হলুদ রাক্ষসের শুঁড় বা দেহকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে জখম করতে সমর্থ। আহত হয়ে হলুদ রাক্ষস ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল, তার উপর সে তখন রক্তের নেশায় উন্মত্ত- ওই অবস্থায় তাকে নিবৃত্তি করে আমি ডিককে বাঁচাতে পারিনি।
ময়ুখ চৌধুরী বলছিলেন তুমি নাকি একটা পিচকারি হাতে ছুটে এসেছিলে?
হা, হলুদ রাক্ষসকে জব্দ করার জন্য আমি একটা নির্যাস আবিষ্কার করেছি। পিচকারিতে ওই তরল নির্যাস ভরা ছিল। পিচকারির সাহায্যে উক্ত তরল নির্যাস ছড়িয়ে দিলেই হলুদ রাক্ষস কাবু হয়ে পড়ে। গাছটা তখন অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে, তার পক্ষে সেই সময় আর শিকারকে আঁকড়ে রাখা সম্ভব হয় না। তবে আমাকেও সাবধান থাকতে হয়, নির্যাসের মাত্রা বেশি হলে রক্তপায়ী উদ্ভিদটির মৃত্যু হতে পারে তৎক্ষণাৎ। ডিক আমার আদরের কুকুর, তাকে বাঁচাতে ওই মারাত্মক ঔষুধ প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল, হলুদ রাক্ষস ডিককে ছেড়ে দিলেও তাকে আর বাঁচাতে পারলাম না। শ্বাসরোধ হয়ে কুকুরটার মৃত্যু হয়েছিল। উত্তেজিত অবস্থায় আমিও অতিরিক্ত নির্যাস ছড়িয়ে দিয়েছিলাম গাছটার উপর, ফলে গাছটাও বেশ কয়েকদিন নির্জীব হয়ে পড়েছিল। এক সপ্তাহ ধরে মুরগিরা তার চারপাশে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, তাদের স্পর্শ করতেও চায়নি হলুদ রাক্ষস। সবচেয়ে মজার কথা কি জানো? আমি যে তাকে আঘাত করেছি এটা বুঝলেও গাছটা আমার উপর কখনো প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করেনি। হলুদ রাক্ষস যে আমায় ভালোবাসে, অনেকবারই আমি তার অকাট্য প্রমাণ পেয়েছি।
হলুদ রাক্ষস যখন এতই বুদ্ধিমান আর তোমাকে সে যখন ভালোবাসে, তখন আমাকে অমন মারাত্মক ধাক্কা না মেরে রাক্ষসটাকেই তো আক্রমণ করতে নিষেধ করা উচিত ছিল তোমার।
নিষেধ বুঝতে তার সময় লাগত। ততক্ষণে রক্তলোলুপ শোষণযন্ত্রগুলো তোমার শরীরে ছোটো ছোটো চক্রাকার ক্ষতের সৃষ্টি করত। আমার উপস্থিতিতে সে তোমাকে কখনই হত্যা করতে পারত না। কিন্তু অনর্থক তোমাকে কয়েকটা কুৎসিত ক্ষত নিয়ে ভুগতে হত। সেই দুর্ভোগ যাতে তোমায় ভুগতে না হয়, সেইজন্যেই ধাক্কা মেরেছিলাম। বুঝেছ তিলু?
বুঝলাম। আমি অবশ্য হলুদ রাক্ষসের মতো সর্বভুক নই, তবে এই মুহূর্তে আমার উদরেও ক্ষুধার অগ্নি অতিশয় জ্বলন্ত। এখন প্রায় এগারোটা, কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত আমার পেটে এককাপ চা পর্যন্ত পড়েনি।
আরে ছি, ছি, সেকথা বলবে তো? আপাতত রুটি মাখন, ডিম আর চায়ের ব্যবস্থা করছি। তারপর দেখা যাক তোমার উদরের অগ্নিকে প্রশমিত করার জন্যে কোন কোন বস্তুর সমাবেশ ঘটানো যায়।
.
০৬. মৃত্যু আলিঙ্গন
মধ্যাহ্নভোজন বেশ গুরুতরই হয়েছিল। বরেনবাবুর ভৃত্য কয়েক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দেশে গিয়েছে, এখনও ফেরেনি। ঘরের অন্যান্য কাজের সঙ্গে রন্ধনকার্যের ভারও ছিল তার উপর, কিন্তু তার অনুপস্থিতি ত্রিবেদীকে অসুবিধায় ফেলল না; কারণ, বরেণবাবু ছিলেন রন্ধনবিদ্যায় অতিশয় দক্ষ।
খাওয়া-দাওয়ার পর দুই বৈজ্ঞানিক যখন গল্পগুজব করছেন, তখন ত্রিবেদীর মনে হল বন্ধুকে একেবারে অন্ধকারে রাখা উচিত হবে না– ডা. সাটিরা ও গজানন ওরফে গজুর কথাটা বরেনবাবুকে খুলে বললেন ত্রিবেদী। ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আশ্চর্য-পাতা সম্বন্ধেও মুখ খুলতে বাধ্য হলেন তিনি। কপাটি খেলায় অসামান্য নৈপুণ্য প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়ে ত্রিবেদীকে পূর্বোক্ত দুই সমাজবিরোধী সাগ্রহে দলে টানতে চেয়েছে এমন কথা বরেনবাবু কখনই বিশ্বাস করতেন না তাই আশ্চর্য-পাতার রহস্য বন্ধুর কাছে ব্যক্ত করেছেন ত্রিবেদী এবং বর্তমানে ওই পাতা আর পাওয়া যাচ্ছে না বলেই যে তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, সে কথাও বললেন। আগের রাতে যা ঘটেছে তার সম্পূর্ণ বিবরণ দিয়ে ত্রিবেদী বললেন, তাগড়া জোয়ান চেহারার চোর দুটোর দুরবস্থা দেখে গজু ব্যাটা ঘাবড়ে গেছে, আর সকলের মতো গজুও ভেবেছে ওদের ওই অবস্থার জন্য ত্রিবেদী স্যারই দায়ী। গজু আমাকে কপাটি প্রতিযোগিতার সময় ছয় সাতজন খেলোয়াড়কে ছিটকে ফেলে দিতে দেখেছে, কাজেই দুটো চোর যতই ষণ্ডা হোক, তাদের ঠেঙিয়ে আধমরা করার ঘটনা গজুর কাছে খুব অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়নি। তারপর পুলিশ অফিসার যখন বলে গেলেন মেজাজ সামলে না চললে ভবিষ্যতে আমায় খুনের দায়ে পড়তে হবে, তখন গজু বিলক্ষণ ভয় পেল। অবশ্য একমুঠো আশ্চর্য পাতা মুখে নিয়ে আমি যদি গজুর মহড়া নিতাম, তাহলে সে জীবনে কোনোদিন কোনো ভদ্র সন্তানকে ভয় দেখাতে সাহস পেত না, একথা আমি জোর গলায় বলতে পারি কিন্তু আশ্চর্য-পাতার সাহায্য ছাড়া আমি একেবারেই অসহায়। বুঝলে বরেন, তোমার এখানে পালিয়ে এসেছি কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকব বলে। তারপর এখানে থাকতে থাকতেই হানাবাড়িতে ঢুকে– মানে, এখন আর হানাবাড়ি নয়– সেই বাড়ির বাগানে ঢুকে কেমন করে কিছু আশ্চর্য পাতা হস্তগত করা যায় সেই ফন্দি আঁটতে হবে। ওখান থেকে কিছু পাতা নিয়ে এলে কেউ খেয়াল করত না, কিন্তু এখন যে-দারোয়ান পাহারা দেয়, তার চোখে ধুলো দিয়ে হানাবাড়ির বাগান থেকে আশ্চর্য-পাতা সংগ্রহ করা বেশ কঠিন কাজ। তোমার কাছে আসার পরিকল্পনা আগেই করেছিলাম, খুব ভোরে উঠে গজুর সতর্ক দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তোমার বাড়িতেই পালিয়ে আসব ভেবেছিলাম কিন্তু হঠাৎ ওই চোর দুটো এসে পড়ায় ঘটনার ধারা বদলে গেল। আমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে আসি, তখন খুব ভালো করে নজর রেখেছি গজু হতভাগাকে কোথাও দেখতে পাইনি। তোমার এখানে যে আমি এসেছি, এটা ওদের জানা নেই। বেশ কিছুদিন আমি ওদের চোখের আড়ালে থাকলে ওরা আমার সম্পর্কে হতাশ হয়ে এলাকা ছেড়ে সরে পড়বে। সেই কটা দিন আমি তোমার বাড়িতেই অজ্ঞাতবাস করব ভাবছি। বাগচি মশাই-এর বাড়িতে টেলিফোন আছে, তাকে ফোন করে জানিয়ে দেব উনি যেন আমার কাজের লোক সনাতনকে জানিয়ে দেন যে, আমি কিছুদিন বাড়ি থাকব না- সনাতন যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। সব কথাই তোমায় আমি খুলে বললাম বরেন, এখন তোমার মতামত জানাও। আমি যা ভেবেছি সেইভাবে চললে বোধহয় শয়তান দুটোকে ফাঁকি দিতে পারব–তুমি কী বলো?
