কোনোরকমে পতন থেকে আত্মরক্ষা করে ত্রিবেদী বন্ধুর দিকে ফিরলেন, ব্যাপার কী? আর একটু হলেই তো মাটিতে আছাড় খেতাম। কোনোমতে সামলে গেছি বটে, কিন্তু কনুইটা দরজায় লেগে এখনও টনটন করছে। তোমার কি হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে গেল বরেন?
আমার মাথা খারাপ হয়নি, ক্রুদ্ধস্বরে বরেনবাবু বললেন, তোমার নিজেরই মাথার ঠিক নেই। তোমাকে বেশি ভিতরে আসতে নিষেধ করেছিলাম, তবু তুমি রাক্ষসটার আওতার মধ্যে এগিয়ে আসছিলে কেন?
-রাক্ষস। এই গাছটা তাহলে মাংসভুক? হ্যাঁ, পোকামাকড় ধরে খায় এমন গাছ আছে। জানি। কিন্তু আস্ত একটা মানুষকে খেয়ে ফেলতে পারে, এমন গাছের কথা কোথাও শুনিনি। তাছাড়া তুমি তো একটু আগেই ওর পাশে দাঁড়িয়েছিলে, ওর ওই শুড় না শিকড়- তুমিই জানো ওগুলো কি–ওইগুলো চার্লিয়ে গাছটা তোমায় আদর করছিল বলেই আমার কৌতূহল হয়েছিল, আরও সামনে গিয়ে ব্যাপারটা ভালো করে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমায় এমন একটি ধাক্কা মারলে যে
ধাক্কা মেরেছিলাম বলেই বেঁচে গেলে তিলু, বরেনবাবু বললেন, একবার যদি ও তোমায় জড়িয়ে ধরতে পারত, তাহলে আজ তোমার নিস্তার ছিল না।
-তাই নাকি? কিন্তু তোমায় তো দেখলাম রাক্ষসটা আদর করছিল।
-হ্যাঁ, আমায় ও চেনে। হয়তো গেছো বুদ্ধি দিয়ে ভালোবাসতেও পারে। আমিই তো ওকে খেতে দিই। তবে আমি ছাড়া কেউ ওর কাছে নিরাপদ নয়। আমার চাকর নিধিরাম মাঝে মাঝে ওকে খেতে দেয় বটে, কিন্তু ওর নাগালের মধ্যে কখনো যায় না। এক রাতে দরজায় তালা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, তাই আমার কুকুর দরজা খোলা পেয়ে ওই ঘরে ঢুকেছিল। সে আর জীবন্ত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি।
ময়ূখবাবুর কাছে ডিকের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি। কিন্তু তার দেহটাকে তো নিটোল অবস্থাতেই দেখেছেন ময়ুখবাবু। কেউ কুকুরটার মাংস খেলে জন্তুটার দেহ হত ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত। সেরকম কিছু তো বলেননি ময়ুখবাবু।
–খুব নিটোল অবস্থায় দেখেছেন? তাহলে বলব ভদ্রলোকের পর্যবেক্ষণ-শক্তি নিতান্ত দুর্বল।
–না, না, ত্রিবেদী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, এবার মনে পড়েছে তিনি বলেছিলেন কুকুরটার মৃতদেহ দেখলে মনে হয় কেউ তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। এছাড়াও তার সর্বাঙ্গে ছোটো ছোটো ক্ষতচিহ্ন ময়ুখবাবুর চোখে পড়েছিল। কিন্তু গাছটা যদি মাংসভুক হত, তাহলে ডিকের শরীরে থাকত হাড়-পাঁজর বার করা গভীর ও রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু ময়ুখবাবু দেখেছিলেন চাকার মতো গোল গোল ক্ষত, সেগুলো তেমন সাংঘাতিক কিছু নয়। কাজেই তোমার হলুদ রাক্ষসকে মাংসলোলুপ বলে মনে হয় না।
-না, ও মাংসলোলুপ নয়, রক্তলোলুপ!
–রক্তলোলুপ! হলুদ রাক্ষস রক্ত পান করে?
হ্যাঁ। ওই শিকড়গুলোর তলায় অজস্র চক্রাকার শোষকযন্ত্র আছে। শিকড় বা বাহু দিয়ে জড়িয়ে ওই শোষণযন্ত্র দিয়ে সে শিকারের দেহ থেকে রক্ত চুষে নেয়। অবশ্য ওই সঙ্গে শিকারের গলায় বাহু জড়িয়ে তার শ্বাসরোধ করার চেষ্টাও চলে। আমার কুকুর ডিককে ওই ভাবে শ্বাসরোধ করেই বধ করেছিল রাক্ষস।
–এই ভয়াবহ জীবটিকে তুমি সংগ্রহ করলে কোথা থেকে?
–জাপানি প্রফেসর তাগাসাকি বুবুলোনা আমাজন নদীর অববাহিকা থেকে এই জাতের দুটি গাছ সংগ্রহ করেছিলেন। একটি গাছ তিনি আমায় উপহার দিয়েছেন, আর একটি আছে তাঁর নিজস্ব সংগ্রহে।
তাগাসাকি বুবুসোনা! জাপানি বৈজ্ঞানিক। তিনি তাঁর যাবতীয় আবিষ্কারের নমুনা কি জনে জনে বিতরণ করছেন নাকি?
অর্থাৎ? সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন বরেনবাবু, আমি জানি তুমি বুবুসোনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তোমাকেও কি তিনি কিছু উপহার দিয়েছেন?
না, না, বিব্রত হয়ে পড়লেন ত্রিবেদী, আশ্চর্য-পাতার বিষয়টা তিনি এখনই ভাঙতে চাইছিলেন না, তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আমাকে বুবুসোনা একটা নমুনা দেখিয়েছিলেন, কোনো কিছু উপহার দেননি। তবে বিজ্ঞানীরা কিছু আবিষ্কার করলে জনসাধারণের সামনে তা উপস্থিত করার আগে কারুকে বিশেষ কিছু জানাতে চান না, তাই বলছিলাম।
বাধা দিয়ে বরেনবাবু বললেন, হলুদ রাক্ষস আমার আবিষ্কার। আমার সৃষ্টি। বুবুসোনা নিমিত্ত মাত্র, কৃতিত্ব সম্পূর্ণ আমার।
-বুঝলাম না।
-বুঝিয়ে দিচ্ছি। তাগাসাকি বুবুসোনা আমাজন নদীর অববাহিকা থেকে দুটি নতুন ধরনের গাছ আবিষ্কার করেছিলেন। ওই দুটি গাছ পতঙ্গভুক গোষ্ঠীর অন্তর্গত, ইতিপূর্বে তার অস্তিত্ব ছিল মানুষের কাছে অজ্ঞাত। আগেই বলেছি একটি গাছ তিনি আমায় উপহার দিয়েছিলেন। আমি সেই গাছটি নিয়ে নানাধরনের পরীক্ষা চার্লিয়েছি। বুবুসোনার গাছ পূর্ণবয়স্ক হলে চারফুট লম্বা হয়। আমার হলুদ রাক্ষস পূর্ণবয়স্ক হয়নি, এখনই তার দৈর্ঘ্য পাক্কা আট ফুট। না-জানি সে আরও কত বড়ো হবে। এই অত্যাশ্চর্য দৈর্ঘ্য ও মানানসই প্রস্থ কিন্তু গাছটার জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়, আমার আবিষ্কৃত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ মেশানো তরল ও নিরেট খাদ্যের মহিমায় হলুদ রাক্ষস নামক এই দানবের জন্ম হয়েছে। অতএব আমি যদি নিজেকে এই বৃক্ষদানবের পিতা বলে দাবি করি, তাহলে দাবিটা বোধহয় নিতান্ত মিথ্যা বলা চলে না– তুমি কি বলো তিলু?
-ঠিক। এই রাক্ষসকে তুমিই জন্ম দিয়েছ, অতএব স্বচ্ছন্দে তুমি এর পিতৃত্ব দাবি করতে পারো। কিন্তু বরেন, এখন তুমি ওকে নিয়ে কি করতে চাও?
