এতক্ষণ নীরবে বন্ধুর বক্তব্য শুনছিলেন বরেনবাবু, এইবার তিনি মুখ খুললেন, তিলু, তোমার কথায় বুঝলাম চোর দুটোর অবস্থা দেখে গজু ওরফে গজানন ভীষণ ভয় পেয়েছে। তার কাছে সবকিছু শুনে ডা. সাটিরাও যদি ঘাবড়ে যায়, তাহলে তুমি বেঁচে গেলে। কিন্তু সাটিরা কি ভয় পাবে? তোমার কি মনে হয়? তুমি ওদের দুজনকেই দেখেছ, চিনেছ। ওদের মনস্তত্ত্ব আমার চেয়ে তুমিই ভালো বুঝবে।
সাটিরা ভয় পাবে কি না বুঝতে পারছি না, চিন্তিতভাবে ত্রিবেদী বললেন, তবে এটা বুঝেছি সাটিরা হচ্ছে দলের মাথা, তার বুদ্ধিতেই সকলে চলে। গজুটা ষাঁড়ের মতো জোয়ান, কিন্তু মগজে বুদ্ধি নেই একফোঁটা- যাকে বলে বোকার বেহদ্দ। আশ্চর্য-পাতা হাতের নাগালে এলে গজুকে আমি ঘোল খাওয়াতে পারব এই বিশ্বাস আমার আছে; ওর ছুরিসমেত হাতখানা আমি আশ্চর্য-পাতার গুণে এক মোচড়েই ভেঙে দিতে পারব, কিন্তু–
কিন্তু বলে থামলে কেন তিলু?
কিন্তু ডাক্তার সাটিরা দস্তুরমতো ধূর্ত, আর হাতের রিভলবার সে ব্যবহার করতে পারে বিদ্যুদ্বেগে। ভাবতে পারো, এক মুহূর্ত টিপ করার সময় না নিয়ে আমার ঘরের একটা বা সে গুলি চার্লিয়ে উড়িয়ে দিল! এত তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রিভলভার বার করে গুলি চার্লিয়ে আবার পকেটেই অস্ত্রটাকে সে চালান করে দিল যে, আমি রিভলভারটাকে ভালো করে দেখতেই পেলাম না। শুধু মুহূর্তের জন্য তার হাতে কালো রং-এর কী-একটা জিনিস যেন দেখলাম আর ওই খণ্ড মুহূর্তের অবকাশে বস্তুটার স্বরূপ নির্ণয় করতেও আমি পারিনি। লোকটার রিভলভারে আবার শব্দ হয় না, সে সাইলেন্সর ব্যবহার করে। আশ্চর্য-পাতার সহায়তা পেলেও এমন ধূর্ত আর লক্ষ্যভেদে সিদ্ধহস্ত দুবৃত্তের মোকাবিলা করা খুবই কঠিন। গজুটা নিরেট গাধা, কিন্তু সাটিরা দস্তুরমতো বিপজ্জনক। তবে ভরসার কথা যে, আমার বর্তমান ঠিকানা সে জানে না। এবার তার সঙ্গে শক্তি পরীক্ষার বদলে ধৈর্যের পরীক্ষাই আমায় দিতে হবে। আশা করি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি জয়লাভ করতে পারব।
আশা করা ভালো, কিন্তু আমি তোমায় আশ্বস্ত করতে পারছি না, তিলু। তুমি আমার পরামর্শ চেয়েছ বলেই বলছি, যে-কোনো সময়ে যে-কোনো জায়গায় সাটিরার সঙ্গে তোমার শুভদৃষ্টি ঘটতে পারে। গজুকে তুমি চেনো, কিন্তু গজু ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি যদি তোমাকে অনুসরণ করে তাহলে সেই লোকটিকে তুমি চিনবে কেমন করে? হয়তো আমার বাড়িতে তোমার উপস্থিতি গুপ্তচরের কল্যাণে সাটিরার অজানা নয়। এই মুহূর্তেই যে তার নিযুক্ত চর তোমার উপর নজর রাখছে না, এমন কথাও জোর করে বলা যায় না।
কী সর্বনাশ, আঁতকে উঠলেন ত্রিবেদী, তাহলে আমি কী করব? কোথায় যাব?
কোথাও যাওয়ার দরকার নেই,বরেনবাবু বললেন, সাটিরা যে তোমার বর্তমান আস্তানার খবর রাখে, এমন কোনো প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। তুমি বড়ো বেশি নিশ্চিন্ত হচ্ছিলে, তাই একটা বিপজ্জনক সম্ভাবনার কথা তোমাকে জানিয়ে দিলাম। হয়তো তোমাকে কেউ অনুসরণ করেনি, হয়তো সাটিরা বা গজু তোমার বর্তমান আশ্রয়ের খবর রাখে না, কিন্তু যদি তোমার খবর তারা পেয়ে থাকে, তবু
বরেনবাবু উঠে দাঁড়ালেন, তবু এই মুহূর্তে তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই। কাল থেকে তোমার উপর দিয়ে উত্তেজনার ঝড় ছুটছে, ক্লান্ত স্নায়ুকে এবার একটু বিশ্রাম দাও। তোমার আজ কর্তব্য হচ্ছে নিবিষ্টচিত্তে নিদ্রাদেবীর আরাধনা। সামনেই তোমার জন্য বিছানা প্রস্তুত রয়েছে, তোমাকে এই মুহূর্ত থেকেই শরীরের প্রতি কর্তব্য পালনের সুযোগ দিয়ে আমি চললাম আমার ঘরে কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণের জন্য।
বন্ধুকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বরেনবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ত্রিবেদী এবার বিছানার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুভব করলেন তাঁর সর্বশরীর এখন ওই বিছানায় আশ্রয়লাভের জন্য অধীর হয়ে উঠেছে- চেয়ার ছেড়ে উঠে তিনি পূর্বোক্ত শয্যার উপর শুয়ে পড়লেন এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল তার চেতনা…
সন্ধ্যার সময়ে ডাকাডাকি করে ত্রিবেদীর ঘুম ভাঙালেন বরেনবাবু। চা পান করতে করতে কিছুক্ষণ বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করলেন দুই বন্ধু, তারপর বরেনবাবু জানালেন বিশেষ কাজে তাকে একবার বাইরে যেতেই হবে। তবে রাত ন-টার মধ্যে নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরে আসবেন, ওই কয়েকঘণ্টার অনুপস্থিতির জন্য বন্ধুবর যেন তাকে ক্ষমা করেন। ত্রিবেদী জানালেন, তার কোনো অসুবিধা হবে না, বরেনবাবুর লাইব্রেরিতে বসে তিনি স্বচ্ছন্দে কয়েকঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন।
বর্ষাকাল। মাঝে মাঝে মৃদু গম্ভীর গর্জনে আকাশ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে-কোনো সময়ে বর্ষণ শুরু হতে পারে। কিন্তু ঝড়বৃষ্টির ভয়ে কাজের মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারে না, তাই আকাশের ক্রুদ্ধ সঙ্কেত তুচ্ছ করেই বেরিয়ে পড়লেন বরেনবাবু…
নটা, সাড়ে নটা নয়, প্রায় এগারোটার সময় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বরেনবাবু বাড়ি ফিরে এলেন। ত্রিবেদীর উদ্বিগ্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, তুমুল বর্ষণের ফলে শহরের বহু রাস্তাই এখন জলের তলায়। ওই সব রাস্তায় যানবাহন বন্ধ হয়ে গেছে। ওই রকম জলমগ্ন পথের উপর অবস্থিত একটি বাড়ির মধ্যে আটকে পড়েছিলেন বরেনবাবু। অবশেষে রাত বাড়ছে দেখে মরিয়া হয়ে তিনি বৃষ্টিপাতের মধ্যেই পথে নেমে পড়লেন এবং অনেকটা রাস্তা হাঁটুজল ভেঙে অগ্রসর হওয়ার পর অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির উপর একটা ট্যাক্সি পেয়ে তার সাহায্যেই বাড়ি এসে পৌঁছোতে পেরেছেন।
