শোনো গজু, ত্রিবেদী গজুর মুখের উপর তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, তোমাকে গজানন বলে আমি ডাকতে পারব না। অত বড়ো নাম উচ্চারণ করতেই আমার কষ্ট হয়। ডাক্তার সাটিরার মতো আমি তোমায় গজু বলেই ডাকব। তুমি কিন্তু রাগ করতে পারবে না।
-না, না, সে কি কথা! আপনার উপর কখনো রাগ করতে পারি?… আচ্ছা স্যার, অনেক রাত হল আজ চলি, পরে দেখা হবে।
.
০৫. হলুদ রাক্ষস
এসো তিলু, বরেনবাবু সাদর অভ্যর্থনা জানালেন, ময়ূখবাবুর হাতে যে চিঠিটা পাঠিয়েছিলাম, সেটা পেয়েই ছুটে এসেছ বোধহয়?
হ্যাঁ। কিন্তু চিঠি পড়ে কিছুই বুঝতে পারলাম না, ত্রিবেদী বললেন, চিঠিতে জানিয়েছ কোন এক হলুদ রাক্ষসকে নিয়ে তুমি নাকি মুশকিলে পড়েছ; অথচ হলুদ রাক্ষস নামক বস্তুটা যে কী, সেকথা পরিষ্কার করে জানাওনি। ময়ুখবাবুর মুখে দেখলাম ব্যান্ডেজ বাঁধা। প্রশ্ন করে জানলাম হলুদ রাক্ষসের স্পর্শে তার মুখে জায়গায় জায়গায় যেসব ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তুমি নাকি স্বহস্তে ওষুধ দিয়ে সেইসব ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে আর সাতদিন আগে ওই ব্যান্ডেজ খুলতে নিষেধ করেছ। অতএব ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে যে, আক্রমণকারীর স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা করব, সেই উপায়ও ছিল না। ময়ুখবাবু আরও জানালেন তোমার কুকুর ডিক মারা পড়েছে ওই হলুদ রাক্ষসের হাতে। সব শুনে চলে এলাম তোমার কাছে। এখন এই হলুদ রাক্ষস সম্পর্কে আমার দারুণ কৌতূহল জেগে উঠেছে তুমি তো আর কাউকে এই বস্তুটির চেহারা দেখাওনি, আশা করি আমায় দেখবে।
আরে দেখাব বলেই তো তোমায় ডেকে পাঠিয়েছি। এসো, আমার সঙ্গে।
দোতলা বাড়ি, বরেনবাবু ভাড়াটে নন, তিনি নিজেই বাড়ির মালিক। ভদ্রলোক বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু বিয়ের দু-বছর পরেই তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। আত্মীয়রা তাঁকে আবার বিবাহের পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রথম পক্ষের কোনো সন্তান ছিল না, বরেনবাবুর তৎকালীন বয়সও ছিল খুব কম, স্বচ্ছন্দে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে পারতেন। কিন্তু স্ত্রীর অকালমৃত্যু তাঁকে পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা এনে দিল– তিনি আর বিবাহ করলেন না, পূর্ণ উদ্যমে বিজ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করলেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসাবে বরেন্দ্রনাথ বস যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন। করেছিলেন, সুতরাং অধ্যাপক ব্রিলোকনাথ ত্রিবেদীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কিছুদিন পরেই তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠল বন্ধুত্বের বন্ধন। একজন বিপত্নীক, আরেকজন চিরকুমার- দুজনেই গবেষণা করেন উদ্ভিদ নিয়ে– অতএব বন্ধুত্বের বন্ধন দিনে দিনে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে উঠল। কোনো অসুবিধা বা সমস্যার উদ্ভব হলেই একজন আর-একজনকে স্মরণ করতেন। বর্তমানে ত্রিবেদী যে-বিপদে পড়েছিলেন, তা থেকে উদ্ধার লাভের জন্য বরেনবাবুর পরামর্শ গ্রহণ করার কথা ভাবছিলেন তিনি আর ঠিক সেই সময়েই তাঁকে ডেকে পাঠালেন বরেনবাবু।
বরেনবাবুর সঙ্গে দোতলার একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে উপস্থিত হলেন ত্রিবেদী। ঘরে তালা লাগিয়েছ কেন? ত্রিবেদী জানতে চাইলেন, এই ঘরেই বোধহয় হলুদ রাক্ষসকে বন্দি করে রেখেছ তুমি? কিন্তু দরজা খুললেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমায় আক্রমণ করবে না তো?
তালা খুলতে খুলতে বরেনবাবু বললেন, ঝাঁপিয়ে আক্রমণ করার ক্ষমতা হলুদ রাক্ষসের নেই। দরজার কাছে সে আসতে পারবে না। তুমি বেশি ভিতরে যেও না তিলু। দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকো।
দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন বরেনবাবু। ঘরের মধ্যে দুটি জানালার মধ্যে একটি বন্ধ, আর একটি আধখোলা। ওই আধখোলা জানলা দিয়ে সূর্যের আলো আসছে বটে, কিন্তু মস্ত বড়ো ঘরটা সেই স্বল্প আলোকে বিশেষ আলোকিত হয়নি। বদ্ধঘরে সূর্যকিরণের স্পর্শে অস্পষ্ট আলো-আঁধারির মাঝখানে একটি বৃক্ষজাতীয় বস্তুকে দেখতে পেলেন ত্রিবেদী। বৃক্ষ?–হ্যাঁ, গাছের গুঁড়ি আর বটের ঝুরির সঙ্গে ওই বস্তুটির সাদৃশ্য থাকলেও তার দেহকে জড়িয়ে পাতার বাহার কোথাও নেই। মেঝেতে বসানো একটা প্রকাণ্ড টবের ভিতর থেকে সটান ঘরের ছাতের দিকে উঠে গেছে প্রায় আট ফুট দীর্ঘ এক গাছের গুঁড়ি। সেই গাছের গুঁড়ির মাথা থেকে শাখা-প্রশাখা এবং পত্রপল্লবের পরিবর্তে নেমে এসেছে বটগাছের ঝুরির মতো অনেকগুলো ঝুরি বা শিকড়। পত্রপল্লবহীন ওই অদ্ভুত-দর্শন গাছটির রং উজ্জ্বল হলুদ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে গাছটিকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন অধ্যাপক ত্রিবেদী– এই তাহলে হলুদ রাক্ষস!
বরেনবাবু এগিয়ে গাছের সামনে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে অচল বৃক্ষ হঠাৎ অস্থির আন্দোলনে চঞ্চল হয়ে উঠল– দুটি দীর্ঘ বাহু বা শিকড় বরেনবাবুর দেহের উপর খেলে বেড়াতে শুরু করল– মনে হল গাছটি বরেনবাবুর সর্বাঙ্গে আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
ওই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন ত্রিবেদী, ভালো করে দেখার জন্যে আর একটু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বিদ্যুৎবেগে দুটি শিকড় এগিয়ে এল তার দিকে! শিকড় দুটি বোধহয় নবাগতকে অভ্যর্থনা জানাতে চেয়েছিল, কিন্তু বরেনবাবু বাদ সাধলেন চিৎকার করে বন্ধুকে, সাবধান করে এক প্রচণ্ড লম্ফত্যাগ করলেন তিনি এবং শিকড় দুটি ত্রিবেদীর কাছে পৌঁছনোর আগেই বন্ধুর কাছে পৌঁছে গেলেন- পরক্ষণেই বরেনবাবুর দুই হাতের ধাক্কা খেয়ে সশব্দে দরজার উপর ছিটকে পড়লেন ত্রিবেদী।
