ত্রিবেদী জানলা দিয়ে দৃশ্যটি উপভোগ করলেন, তারপর বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন। পাহারাদার ছেলেরা সারারাত পাহারা দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরবে, সুতরাং একসময়ে তারা এখানেও এসে পড়বে। উপরে খাওয়ার ঘরে যারা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, ভোরের আগে যে তাদের জ্ঞান ফিরবে না এ বিষয়ে ত্রিবেদী ছিলেন নিশ্চিত। তিনি ছেলেদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন.
একটু পরেই ছেলেরা এসে পড়ল। লোক দুটির অবস্থা দেখে তারা চমকে গেল। একজন তো বলেই ফেলল, আমরা সবাই মিলে ঠ্যাঙালেও এদের এমন অবস্থা করতে পারতাম না। আপনি তো স্যার দারুণ জিনিস দেখছি।
আর একজন বলল, ত্রিবেদী স্যারের গায়ে যে জোর আছে সেকথা কি তুই আজ জানলি? সেদিন কপাটি ম্যাচে দেখলি না গদাই-এর মতো জোয়ানকে স্যার কেমন পটকে দিলেন?
–আরে সেটা হল খেলা। আর এটা যে সাংঘাতিক কাণ্ড, খুনোখুনি ব্যাপার। এদের এক-একটার চেহারা দেখেছিস? গদাই আর বাঘা মুকুন্দ এদের কাছে ছেলেমানুষ।
ওহে তোমরা এদের হাত-পা বেঁধে পুলিশে খবর দাও, ত্রিবেদী বললেন, জ্ঞান ফিরে এলে এরা কি করবে বলা যায় না।
আমাদের লোক চলে গেছে, এখনই পুলিশ নিয়ে ফিরে আসবে। ওদের জ্ঞান ফিরে এলে আবার আমরাই ওদের অজ্ঞান করে দিতে পারব। এতগুলো ছেলের হাত এড়িয়ে ওরা পালাতে পারবে না। এখন বুঝলাম এরাই এতদিন বাড়ি বাড়ি চুরি করেছে। আপনি ছাড়া অন্য কোনো লোক কি এদের ধরতে পারত? পাঁচ-সাতজন একত্র হয়েও এদের ধরতে পারত না মাঝখান থেকে হয়তো দু-একটা লাশ পড়ে যেত। এদের পাকড়াও করে আপনি পাড়ার লোকের ধনপ্রাণ দুই-ই বাঁচিয়েছেন স্যার।
…খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশের ভ্যান উপস্থিত হল অকুস্থলে। তস্করযুগল তখনও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তাদের ধরাধরি করে ভ্যানে ভোলা হল। ত্রিবেদীর দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে পুলিশ অফিসার বললেন, শুনলাম আপনিই ওদের ধরেছেন? ভবিষ্যতে মেজাজটা একটু সংযত রাখবেন। লোকে দুটোকে তো প্রায় খুন করে ফেলেছেন।
ইয়ে, মানে, ত্রিবেদী আমতা আমতা করে বললেন, মেজাজ খারাপ হলে আমি নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারি না।
—ভবিষ্যতে সামলাতে চেষ্টা করবেন, নইলে একদিন খুনের দায়ে পড়ে যাবেন মশাই।
গাড়িতে ওঠার আগে পুলিশ অফিসার হঠাৎ ত্রিবেদীর দিকে ফিরলেন, তার গম্ভীর মুখে ফুটল হাসির আভাস, আপনাকে দেখলে কিন্তু মনেই হয় না আপনার শরীরে এমন ভীষণ শক্তি। আমরা পাঁচ-ছয় জন মিলেও এই ষণ্ডা দুটোকে এমনভাবে ঠ্যাঙাতে পারতাম না। আপনি বোধহয় মার্শাল আর্ট, অর্থাৎ ক্যারাটে, জুডো প্রভৃতি জানেন- তাই না?
ত্রিবেদী একটু হাসলেন, কথা কইলেন না।
অফিসারও হাসলেন, বুঝেছি, আচ্ছা চলি। আমার কথাটা মনে রাখবেন। আগেও বলেছি, আবারও বলছি– মেজাজ সামলে চলবেন, নয়তো একদিন নির্ঘাত খুনের দায়ে পড়বেন।
অফিসার লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠতেই পুলিশ-ভ্যান চলতে শুরু করল এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্তর্ধান করল। ছেলের দলও ত্রিবেদীকে অভিনন্দন জানিয়ে যে যার ঘরে ফিরে গেল। আজ রাতে যে আর পাহারা দেওয়ার দরকার হবে না, সেটা সকলেই বুঝেছিল।
ত্রিবেদী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এতক্ষণ পরে আবার তাঁর মস্তিষ্কে শুরু হয়েছে চিন্তার আলোড়ন, আমার নতুন আবিষ্কারটা আর পরীক্ষা করে দেখার দরকার হল না। চোর দুটোর উপরেই পরীক্ষা হয়ে গেল। মানুষের মন যখন বিষণ্ণ হয়, তখন সে ভেঙে পড়ে। আমি এমন কিছু আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম, যা মানুষকে শোক, দুঃখ, বিষাদ ভুলিয়ে আনন্দে মগ্ন করে দেবে। কিন্তু আমার আবিষ্কৃত এই নির্যাস দেখছি মানুষকে মত্ত করে দেয়, হিংস্র করে তোলে। নাঃ, আমার সব পরিশ্রমই ব্যর্থ হয়েছে, আবার নতুন করে গবেষণা শুরু করতে হবে। অনেক রাত হল, এবার শুয়ে পড়ি।
ত্রিবেদী দরজা বন্ধ করার উদ্যোগ করলেন, কিন্তু হঠাৎ তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল অন্ধকারে দণ্ডায়মান একটি লোকের দিকে তিনি দরজা খোলা রেখেই এগিয়ে গেলেন, কে? কে ওখানে?.. আরে গজু, না, না; গজানন যে! ওখানে দাঁড়িয়ে এত রাত্রে কি করছ তুমি?
না, মানে, গজানন সামনে এগিয়ে এল, এই আপনার যদি কোনো বিপদ হয়, তাই ভেবে
–আমার বিপদ হবে ভেবে রাত দুটোর সময়ে আমার বাড়ির কাছে এসেছে আমায় পাহারা দিতে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মানে সেইজন্যেই- যদি আপনি বিপদে পড়েন তাই সাহায্য করার জন্যই এসেছিলাম।
-ও।
আচ্ছা ত্রিবেদী স্যার, গজু একবার মাথা চুলকে নিল, তারপর ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করল, ওই লোক দুটোকে কি আপনিই পিটিয়েছেন স্যার?
-হ্যাঁ। তুমি তখন কি করছিলে?
-আপনি যখন ওদের পেটাচ্ছিলেন, তখন তো আমি এখানে ছিলাম না। আমি যখন এলাম, তখন লোক দুটোকে ভ্যানে তোলা হচ্ছিল। সেই সময় পুলিশ সার্জেন্ট আপনাকে মেজাজ সামলে চলতে বলছিল স্যার।
–এমনিতে আমার মেজাজ খুব ঠান্ডা। সহজে আমি রাগ করি না। কিন্তু হঠাৎ যদি কোনো কারণে মেজাজ বিগড়ে যায়, তখন আমার আর জ্ঞান থাকে না বুঝেছ?
-হ্যাঁ স্যার, বুঝেছি।
–আরও একটা কথা তোমায় বলে দিচ্ছি। আমার বিপদ নিয়ে যদি বেশি মাথা ঘামাও, তাহলে তুমিও বিপদে পড়বে। আমাকে কেউ সর্বদা চোখে চোখ রাখছে, একথা ভাবলেই আমার মাথায় খুন চেপে যায়- বুঝেছ?
–হ্যাঁ স্যার। না স্যার। মানে, আপনাকে আর কখনো পাহারা দেব না। ঠিক আছে স্যার; আপনি যা বলবেন তা-ই হবে।
