–তাই নাকি? ঢাল, তবে।
অতিশয় উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ত্রিবেদী দেখলেন সদ্য আবিষ্কৃত যে তরল পদার্থটি তিনি একটা ফাটা বোতলে ভরেছিলেন এবং বোতলটার দুরবস্থা দেখে একটা টম্যাটো সস-এর খালি বোতলে তরল পদার্থটি ঢেলে সেটাকে রেফ্রিজারেটরের শীতল গর্ভে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন– সেই নির্যাসপূর্ণ বোতলটি ঠাণ্ডা বাসকোর ভিতর থেকে বার করে দুই চোর এখন গলাধঃকরণের আয়োজন করছে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বোতলটাকে একটা প্লেটের উপর উপুড় করতেই খানিকটা রক্তবর্ণ তরল পদার্থ প্লেটের শূন্য স্থানকে পূর্ণ করে দিল। সে দিক তাকিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, এটা মোটেই টম্যাটো সস নয়। টম্যাটো সস এত পাতলা হয় না।
প্রথম ব্যক্তি বলল, ঠান্ডা বাসকোর মধ্যে যখন ছিল, তখন ওটা সস না হলেও খাবার জিনিস তো বটে। একটু চেখে দ্যাখ তো।
প্লেটটা তুলে একটা চুমুক দিয়েই দ্বিতীয় ব্যক্তি সোল্লাসে ঘোষণা করল, এ তো দারুণ জিনিস রে, পচা!
প্লেটটা এক চুমুকে খালি করে সে একটা গেলাস টেনে নিল, এটা গেলাসে ঢেলে খেতে হবে। সস-এর মতো ঘন আর আঠালো নয় জিনিসটা।.
পচা নামক ব্যক্তি বলে উঠল, তাহলে আর একটা গেলাসেও ঢাল। আমিও একটু চেখে দেখি কী-এমন দারুণ জিনিস।
তরল পদার্থটি আর একটি গেলাসে ঢালা হল। এক চুমুক খেয়েই টেবিল চাপড়ে পচা বলে উঠল, চুম্পী রে! এ তো জবর জিনিস! ঢাল ঢাল, ভালো করে ঢাল।…
গেলাসটা মুখ থেকে নামিয়ে হটাৎ সঙ্গীর দিকে তাকাল পচা তার ভুরু কুঁচকে গেছে, চোখ দুটো হয়ে উঠেছে লাল টকটকে,ওরে চুম্পী, খুব তো গিলছিস, সব গুছিয়ে নিয়েছিস তো?
ঘরের কোণে যে মস্ত মুখবাঁধা থলিটা পড়েছিল, তার ফুলে-ওঠা অবস্থা দেখলেই বোঝা যায় অনেক নিরেট বস্তু ওই থলির ভিতর ভরে দেওয়া হয়েছে। সেইদিকে আঙুল দেখিয়ে চুম্পী বলল, সব ঠিক আছে। ইচ্ছে হলে তুই বাঁধন খুলে দেখতে পারিস।
–ওগুলো আর কী দেখব? একগাদা বাসন, কয়েকটা ফুলদানি আর হাবি-জাবি বিক্রি করে কটা পয়সা পাব? আলমারিটা তত খুলতে পারলি না। সেটা খুললে হয়তো সত্যিকার কিছু মালকড়ি পাওয়া যেত। নগদ টাকা পয়সা তো কিছুই পেলাম না।
আলমারি খোলার চেষ্টা তো করেছি। যে-চাবিটা দিয়ে সব তালা খোলা যায়, সেটাও তো লাগালাম আলমারি তবু খুলল না, লাভের মধ্যে চাবিটাই গেল ভেঙে।
-তা তো ভাঙবেই। এ তো জুতোর চামড়ায় উঁচ ঢোকানোর কাজ নয়, এ হল লোহার আলমারি। এখানে বাবা, চালাকি চলবে না।
খবর্দার পচা, ঠকাস করে হাতের গেলাস টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল চুম্পী, তার চোখ দুটিও তখন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে, কী বলতে চাস তুই?
–আমি বলতে চাই যে আলমারিটা লোহার তৈরি, চামড়ার নয়। চামড়াতে ছুঁচ ঢোকানো যত সহজ, লোহার আলমারির চাবি খোলা অত সহজ নয়।
হঠাৎ চামড়ার কথা উঠল কেন? ছুঁচের কথাই বা আসে কেন?
–কি জানি, পচা মুখ টিপে হাসল, মনে হল তাই বললাম। তুই অত চটছিস কেন?
–ন্যাকামি হচ্ছে? কেন চটছি জানিস না? আমার বাবা মুচি, জুতো সেলাই করে। তার ব্যাটা আমি, চামড়ার জুতোয় ফোঁড় তুলে সেলাই দিতে পারব কিন্তু লোহার আলমারির তালা তোড়া আমার কম্ম নয়– এই কথাই তো বলতে চাস তুই?
–আমি এসব কথা বলিনি। আমি শুধু বলেছি লোহার আলমারির তালা ভাঙা সহজ নয়। জুতোর চামড়ায় ছুঁচের ফোঁড় দেওয়া তার চাইতে সহজ। তুই শুধু শুধু মেজাজ গরম করছিস। মেজাজ ঠাণ্ডা কর চুম্পী। কামকাজ করতে গেলে মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হয় বুঝলি? নে, আর এক পাত্তর চল্।
বোতল থেকে ত্রিবেদীর আবিষ্কৃত তরল নির্যাস আবার পরিবেশিত হল দুটি গেলাসে… দুই চোর নীরবে সেই তরল বস্তু পান করতে লাগল… হঠাৎ চুম্পীর ওষ্ঠাধরে ফুটল হাসির রেখা, ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে সেই মৃদু হাসি ফেটে পড়ল সশব্দ অট্টহাস্যে হা! হা! হা! হা!
ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ সঙ্গীকে তীব্র দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করল পচা, তারপর রূঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, হঠাৎ এত হাসির ঘটা কেন রে?
–একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল– হা! হা! হা!
–কোন ঘটনা? কী ঘটনা? শুনি তো একবার?
ব্যাপারটা হয়েছিল কি জানিস, চুম্পী হাসতে হাসতে হাতের গেলাসে চুমুক দিল, এক ব্যাটা পকেটমার পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়েছিল, তখন লোকে তাকে এমন ধোলাই দিল যে, তার একটা হাতই গেল ভেঙে। আমার বাপ মুচি, জুতো সেলাই করে হকের পয়সা খায়– কারও কোনোদিন ক্ষমতা হয়েছে আমার বাবার গায়ে হাত তোলার? সেটি আর বলতে হবে না, হ্যাঁ।
হাতের গেলাস এক চুমুকে খালি করে নামিয়ে রাখল পচা, তুই তো আমার বাবার কথা বলছিস? হ্যাঁ, বাবা পকেটমার ছিল। খুব ওস্তাদ পকেটমার। হঠাৎ একবার ধরা পড়ে গিয়েছিল। তাতে তোর কী? তোর বাপের পকেট মারতে গিয়ে তো ধরা পড়েনি।
আমার বাপের পকেট মারতে গেলে তোর বাপের হাত তত ভাঙতই, ঘাড়ও ভাঙত। আমার বাপ ছিল মস্ত জোয়ান। আমায় দেখে বুঝছিস না?
-হ্যাঁ, তোক দেখে তো বুঝতেই পারছি তোর বাপ কেমন জোয়ান ছিল। বন্ধু বলে কিছু বলি না, নইলে–
— নইলে কী করতি, বল?
–একটি থাপ্পড়ে তোর বদন বিগড়ে দিতাম।
–যা, যা। আর এক জন্ম ঘুরে আসতে হবে।
–তবে রে!
–তবে রে!
পরক্ষণেই শুরু হল শুম্ভ-নিশুম্ভের লড়াই!–টেবিল উলটে পড়ল, চেয়ার ভাঙল, গেলাস। আর কাঁচের বাসন ভেঙে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল ভাঙা কাঁচের গুঁড়ো!.. কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল চুম্পী আর পচা নামক দুটি জীবন্ত বিভীষিকা অচৈতন্য হয়ে শুয়ে পড়েছে ঘরের মেঝের উপর তাদের গালে, কপালে, মাথায় দেখা দিয়েছে অনেকগুলো ছোটো বড়ো আল, তাদের ঠোঁট গেছে ফেটে, থেঁতলে গেছে নাক, বন্ধ-হয়ে যাওয়া চোখের চারপাশে কালো হয়ে জমে গেছে রক্ত!
