–ও! শ্যামবাজারে তোর সেই পিসির কাছে যাচ্ছিস বুঝি? আচ্ছা যা, কাল বিকেলেই চলে আসবি কিন্তু।
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
ত্রিবেদী দ্রুত চিন্তা করতে লাগলেন, সনাতনের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে যাব। সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বাগচি মশাই-এর বাড়িতে দাবা খেলব। তারপর বাড়ি এসে খেয়ে ঘুম। ভোর পাঁচটায় উঠে বরেনের বাড়ি পালাব। অত সকালে বোধহয় গজু ব্যাটা পাহারা দেবে না।
সনাতনকে উদ্দেশ করে হাঁক দিলেন ত্রিবেদী, আমার রাতের খাবারটা তৈরি করছিস তো?
–নিশ্চয়। রান্না আর কিছুক্ষণের মধ্যি হয়ে যাবে।
–বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবিটা তোকে দিয়ে আমি বেরুব। তোর সময় হলে তালা বন্ধ করে যাবি। আর রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রাখতে ভুলবি না-বুঝেছিস? আমার আসতে বেশি রাত হতে পারে।
-আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু।
..অনেক রাত্রে বাগচি মশাই-এর বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির পথ ধরলেন ত্রিবেদী! দাবার নেশা বড়ো বিশ্রী, রাত বারোটার সময় দুজনের খেয়াল হল এইবার ক্ষান্ত হওয়া উচিত। খুব জোরে জোরে হাঁটতে লাগলেন ত্রিবেদী এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়লেন বাড়ির দরজায়…
কিন্তু ও কী! ত্রিবেদী বিস্মিত চক্ষে দেখলেন তাঁর বাড়ির দোতলার একটি ঘরে আলো জ্বলছে! ত্রিবেদী জানতেন তার অনুপস্থিতিতে পাড়ার ঠাকুর চাকরদের জুটিয়ে তাসের আড্ডা বসায় সনাতন। আগে একবার তাকে নিষেধ করেছেন তিনি। আজ তিনি বেশি রাতে ফিরবেন শুনে সে হয়তো আজ্ঞার লোভ সামলাতে পারেনি, শ্যামবাজারে পিসির বাড়ি না গিয়ে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে তাস খেলছে- ক্রুদ্ধ ত্রিবেদী মনে মনে স্থির করলেন সনাতনকে খুব একচোট বকাবকি করে তার বন্ধুদের এখনই তাড়িয়ে দেবেন, ত্রিবেদীর পদচালনা দ্রুত থেকে দ্রুততর হল।
দরজার কড়া ধরে নাড়তে গিয়ে ত্রিবেদী লক্ষ করলেন দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে রয়েছে। আস্তে ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল। ত্রিবেদী রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন- হতভাগা সনাতন ভেবেছে কী! আড্ডা দিতে এমন মত্ত যে সদর দরজা ভিতর থেকে খিল তুলে বন্ধ করতে ও ভুলে গেছে! ক্রুদ্ধ ত্রিবেদী ঠিক করলেন এমন অবাধ্য আর অমনোযোগী চাকরকে তিনি রাখবেন না। আড্ডাধারীদের হাতে নাতে ধরে ফেলার জন্য তিনি পা টিপে টিপে দোতলায় উঠতে লাগলেন…
আলো জ্বলছিল খাওয়ার ঘরে। অন্ধকার বারান্দা দিয়ে আলো লক্ষ্য করে চলতে চলতে ত্রিবেদী ভাবতে লাগলেন এ বাড়িতে ঘরের তো অভাব নেই, তবে খাওয়ার ঘরে ওরা আড্ডা জমাতে গেল কেন? তবে কি সনাতন ও তার বন্ধুবান্ধব তারই ডাইনিং টেবিল আর চেয়ার সাজিয়ে ভোজনপর্ব চালাচ্ছে? ব্যাপারটা অনুমান করেই তাঁর তপ্ত মেজাজ আরও তপ্ত হয়ে উঠল, সনাতনকে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্তটা মনে মনে একেবারে পাকা করে নিয়ে তিনি নিঃশব্দে ভোজনকক্ষের জানালায় উঁকি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলেন ভীষণভাবে
হ্যাঁ, ভোজনপর্বই চলছে বটে, ডাইনিং টেবিলে স্তূপাকার খাদ্য সাজিয়ে তৃপ্তি সহকারে যে দুই ব্যক্তি আহারে মনোনিবেশ করেছে, তাদের চেহারা দেখলে স্বয়ং গজাননও যে দস্তুরমতো ঘাবড়ে যাবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। দুজনের পোশাক একই রকম, কালো গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট। দুজনেই যেমন লম্বা তেমনই চওড়া, তাদের কাঁধ, বুক আর হাতের মাংসপেশী বহু ব্যায়ামবীরেরই ঈর্ষার উদ্রেক করতে পারে। তাদের পা দুটো টেবিলের তলায় দৃষ্টির অন্তরালে ছিল বলে তাদের পদযুগল পাদুকা-সজ্জিত অথবা নগ্ন, সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না কিন্তু পুরাতন রীতি-নীতি ত্যাগ করে চেহারাও যে বর্তমান পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথেষ্ট আধুনিক মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে, তাদের সাজসজ্জা দেখে সেকথা অনুমান করতে পারলেন ত্রিবেদী। পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে বেপরোয়া চুরির ঘটনায় গৃহস্থদের মধ্যে যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে এবং যার ফলে পাড়ার ছেলেরা সারারাত ঘুরে ঘুরে পাহারা দেওয়ার সঙ্কল্প করেছে এরাই যে সেইসব চুরির জন্য দায়ী তা-ও বুঝতে পারলেন অধ্যাপক মশাই। আশ্চর্য-পাতা হাতের কাছে মজুত থাকলে ত্রিবেদী কি করতেন বলা যায় না, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় দুই নরদানবকে বাধা দিতে গেলে সেটা যে আত্মহত্যারই নামান্তর হবে, তা বঝেই সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট রইলেন ত্রিবেদী। তারা যদি পরিতোষ সহকারে ভোজ শেষ করে তারই চোখের সামনে তার জিনিসপত্র নিয়ে সরে পড়ে, তাহলে তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। একমাত্র ভরসা পাড়ার ভ্রাম্যমাণ রক্ষীদল ঘুরতে ঘুরতে তারা এদিকে এসে পড়লে ত্রিবেদীর পক্ষে চোরদের অগোচরে পাহারাদার দলটিকে দুই তস্করের খবর সরবরাহ করা কঠিন হবে না কিন্তু তস্করযুগল যে বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করবে না এবং রক্ষীদলের পক্ষেও যে অক্ষত দেহে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে না, এ বিষয়ে ত্রিবেদী ছিলেন নিশ্চিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রিবেদীর পক্ষে যা করা উচিত, তিনি তা-ই করলেন, অর্থাৎ চোরদের অগোচরে জানালার ফাঁক দিয়ে তাদের উপর নজর রাখতে লাগলেন…।
মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে এক ব্যক্তি বলল, কাজ করতে এসে খাওয়াটা উপরি পাওনা হল। মুরগির মাংসটা খাসা বেঁধেছে রে!… ও কী রে! তুই আবার কিসের বোতল নিয়ে এলি?
অপর ব্যক্তি বলল, ঠান্ডা বাসকোর মধ্যে একটা টম্যাটো সস-এর বোতল ছিল। মাংসের সঙ্গে টম্যাটো সস তোফা জমবে।
