বরেনবাবুর প্রস্তাবে আপত্তি করলাম না। ভদ্রলোক বিপত্নীক, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। ছেলেমেয়েও নেই। বিজ্ঞান চর্চা করেই দিন কাটাচ্ছেন পরমানন্দে। অতএব আমার দিক থেকেও সঙ্কোচ করার কারণ ছিল না। খাওয়ার পর অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলাম দুজনে, তারপর শুয়ে পড়লাম। শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করার আগে অবশ্য ডিক একবার আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছিল। কুকুরটাকে আমি ভালোবাসতাম। সে বোধহয় আমার মনোভাব বুঝতে পারত। সুযোগ পেলেই আমার কাছে এসে আদর কাড়ার চেষ্টা করত। সেই রাত্রেও বেশ কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে খেলা করে ডিক চলে গেল তার নিজস্ব জায়গায় আর আমিও বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম কিছুক্ষণের মধ্যে।
গভীর রাত্রে হঠাৎ কুকুরের তীব্র আর্ত চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বাইরে আসতেই বরেনবাবুর সঙ্গে দেখা হল। তিনি আমাকে ঘরে ফিরে যেতে বললেন। আমি বরেনবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার হাতে রয়েছে একটা প্রকাণ্ড পিচকারি! আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বরেনবাবু আবার আমাকে নিজের ঘরে যেতে বললেন। আমি ইতস্তত করছি, হঠাৎ আবার ভেসে এল সেই আর্তনাদ! কুকুরের এমন যাতনাকাতর আর্ত চিৎকার আগে কখনো শুনিনি। ডিক-এর সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল, আর আর্তনাদ শুনে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। যে-ঘর থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছিল, সেই ঘরটার দিকে ছুটে গেলাম। অন্ধকার ঘরে ঢুকে আনে টিপতে গেলাম, কিন্তু তার আগেই আমার মুখের উপর চাবুকের মতো কী-যেন একটা আছড়ে পড়ল, আর ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের উপর ছিটকে পড়লাম আমি। শক্ত মেঝেতে মাথা ঠুকে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফিরে আসতে দেখলাম বরেনবাবু আমার মুখে কপালে ঔষধ দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। সকালবেলা তার কাছ থেকে চিঠি নিয়ে চলে এলাম আপনার এই বাড়িতে চলে আসার আগে বরেনবাবুর কাছে শুনেছিলাম আমায় নাকি আক্রমণ করেছিল হলুদ রাক্ষস। মুখে আর কপালে ক্ষতচিহ্নগুলো তারই স্মৃতিচিহ্ন।
–আর ডিক? মানে বরেনের কুকুরের কি হল?
–ত্রিবেদী মশাই, ডিক-এর মৃতদেহ আমি দেখেছি। কুকুরটার চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, জিভটাও প্রায় আধ হাত বেরিয়ে এসেছিল মখের ভিতর থেকে মনে হয় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে। আরও একটা আশ্চর্য ব্যাপার। তার সর্বাঙ্গে ছোটো ছোটো চক্রাকার ক্ষতচিহ্ন দেখেছি আমি। সমস্ত ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়।
-আপনার মুখে ব্যান্ডেজটা একবার খুলে দেখব ময়ূখবাবু? ভয় নেই, আবার ঠিক করে বেঁধে দেব।
-উঁহু, সাতদিনের আগে বরেনবাবু আমায় ব্যান্ডেজ খুলতে নিষেধ করেছেন। সাতদিন পরে ওঁর কাছে গেলে উনি নিজের হাতে আমার ব্যান্ডেজ খুলে দেবেন। বরেনবাবু বলেছেন সাতদিন বাদে নিশ্চয়ই ঘা শুকিয়ে যাবে। যদি না শুকায়, তাহলে যা ব্যবস্থা করা উচিত, তিনি তা করবেন। কিন্তু অন্য কারও সামনে তিনি আমায় ব্যান্ডেজ খুলতে নিষেধ করেছেন।
-ওঃ, তা সে যখন নিষেধ করেছে, তখন আমি আপনাকে ব্যান্ডেজ খুলতে অনুরোধ করব।
বরেনবাবু কিন্তু আমায় একটি অনুরোধ করেছেন। তার হলুদ রাক্ষসের কথা যেন আমি কোথাও না লিখি। আমি যে অধ্যাপক ত্রিবেদীর বিচিত্র কীর্তি নিয়ে একটি বই লিখছি সেকথা বরেনবাবু জানেন। তিনি বলেছেন অধ্যাপক মশাই যদি তার বাড়ি গিয়ে হলুদ রাক্ষসকে নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি থাকেন, তাহলে হলুদ রাক্ষসকে নিয়ে আমি কিছু লিখলে তিনি আপত্তি করবেন না।
–হলুদ রাক্ষসকে তো আপনি চোখেই দেখেননি। তাকে নিয়ে আর কী লিখবেন?
তাকে আমি দেখতে চাই না। শুধু তার স্পর্শের মহিমা অনুভব করেই আমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেছে। আপনি তার সঙ্গে দেখা করলে সেই সাক্ষাতের বিবরণ ও পরিণাম আমি পাঠকদের সামনে উপস্থিত করতে পারি। আচ্ছা, আজ আমি চলি ত্রিবেদী মশাই। আপনি বোধহয় দু-এক দিনের মধ্যেই বরেনবাবুর বাড়ি যাচ্ছেন?
-যাওয়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু একটা বিপদের ভয় রয়েছে।
–বিপদ? ওঃ, হলুদ রাক্ষসের কথা ভাবছেন বুঝি?
–না, মশাই। হলুদ রাক্ষস কেমন বস্তু জানি না। তবে সে বোধহয় ডাঃ সাটিরা আর গজাননের চাইতে বেশি ভয়ানক নয়।
–ডাঃ সাটিরা! গজানন! তারা আবার কারা? একটু আগেই গজাননের কথা বলছিলেন না আপনি? যার গেঞ্জি আর প্যান্টের রং ঠিক আমার মতো!
হ্যাঁ। কিন্তু তার পোশাকের সঙ্গে আপনার পোশাকের মিল থাকলেও মানুষ হিসাবে তার সঙ্গে আপনার যথেষ্ট তফাত। লোকটা ভয়ংকর, মানুষ খুন করতে পারে হাসতে হাসতে।
-ও বাবা! আর ডাঃ সাটিরা?
–সে আরও সাংঘাতিক। ওদের কথা আর একদিন বলব ময়ূখবাবু।
–আচ্ছা, আজ তাহলে চলি ত্রিবেদী মশাই। নমস্কার।
–নমস্কার।
ময়ুখ চৌধুরীকে বিদায় দিয়ে ত্রিবেদী আবার আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বন্ধুবর বরেনের ওখানে যাওয়া যায় কিন্তু গজুর চোখে ধুলো দিয়ে তিনি কি ওখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারবেন? ত্রিবেদী একটু আগেই বুঝেছিলেন তাঁর অজ্ঞাতসারে তাকে সর্বদা নজরে রেখেছে গজু তার শ্যেনদৃষ্টিকে কি ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হবে?
বাবু, ত্রিবেদীর চিন্তাস্রোতে বাধা দিল সনাতনের কণ্ঠস্বর, আজ আমাকে ছুটি দিতে হবে। আমি একবার শ্যামবাজারে যাব, কাল বিকেলে ফিরব।
