একটু আগেই তার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেছে গজু অন্য একটা রাস্তা ধরে। যে রাস্তা দিয়ে গজু চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরেও তাঁর বাড়িতে আসা যায় তবে তাতে অনেক বেশি সময় লাগার কথা। অথচ দেখা যাচ্ছে তার অনেক আগেই গজু পৌঁছে গেছে তার বাড়িতে! ত্রিবেদী বুঝলেন অন্য পথ ধরে খুব দ্রুত হেঁটে সে তাঁর আগেই এই বাড়িতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সনাতন তো বিশেষ পরিচিত না হলে কোনো লোককে মনিবের অনুপস্থিতিতে ঘরে বসায় না, তাকেই বা কোন মন্ত্রে বশ করল গজু? গজুকে দেখে কখনই খুব বইয়ের ভক্ত মনে হয়নি ত্রিবেদীর, সে হঠাৎ তার বৈঠকখানায় বসে পুস্তক পাঠে মনোনিবেশ করল কেন?
ত্রিবেদী একবার গলা খাঁকারি দিলেন, গজু বই থেকে মুখ সরাল না। একটু ইতস্তত করে ত্রিবেদী বললেন, এই যে গজু না, না, গজানন, তুমি যে এত বই ভালোবাসো তাতে জানতাম না। তা ইয়ে গজু না, না, গজানন বইটা বুঝি খুব ভালো? তাই ইয়ে, ওই বইটা মুখ থেকে সরিয়ে কথা কইতে কি তোমার খুব বেশি অসুবিধা হবে?
একটুও অসুবিধা হবে না। আপনি ছিলেন না বলে সদ্য কিনে-আনা ইংরেজি উপন্যাসটা পড়ছিলাম। পাঠকের মুখের উপর থেকে বই সরে এল কোলের উপর। আপনার সঙ্গে কথা কইতেই তো এসেছি।
ত্রিবেদী সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, এ কী! এ তো গজু নয়! এ তো দেখছি
–আপনি যাকে দেখছেন তার নাম গজু অথবা গজানন নয়, আমার একথা বোধ হয় আপনি বিশ্বাস করতে পারেন ত্রিবেদী মশাই।
-নিশ্চয় বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু আমি ভাবতেই পারিনি যে, মুখে আর কপালের ব্যান্ডেজ বেঁধে আমার ঘরে অসময়ে উপস্থিত হয়েছেন ময়ুখ চৌধুরী!… ব্যাপারটা কি বলুন তো? কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল নিশ্চয় ব্যান্ডেজের ঘটা দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ ভালোরকম জখম হয়েছেন। কি হয়েছিল ময়ুখবাবু?
-বলছি। তার আগে বলুন তো হঠাৎ আমাকে আপনি গজু বা গজানন নামক ব্যক্তি বলে ভুল করছিলেন কেন?
-ওই লোকটার পরনে ছিল আপনারই মতে ভোরাকাটা গেঞ্জি আর রংচটা জিনসের প্যান্ট! নিতান্তই কাকতালীয় ব্যাপার, ময়ুখ চৌধুরী বললেন, এইরকম ডোরাকাটা গেঞ্জি আর রংচটা জিনসের প্যান্ট দুর্লভ নয়। বহুলোক এগুলো পরে থাকে। দৈবাৎ আপনার গজু বা গজানন আর আমি এই পোশাক পরেছি পরস্পরের অজ্ঞাতসারে। এখন বুঝছি আমার মুখ ঢাকা ছিল বলেই আপনি আমাকে গজু বলে ভুল করেছেন।
শুধু মুখ নয়, আপনার দুই পা ছিল সেন্টার টেবিলের তলায়, ত্রিবেদী বললেন, পা দেখলেও বুঝতে পারতাম বৈঠকখানায় যিনি বসে আছেন, তিনি যে-ই হোন, অন্তত গজানন সরখেল নন।
পা দেখলে বুঝতেন কেমন করে? বলার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের তলা থেকে পা টেনে এনে সোফার উপর সোজা হয়ে বসলেন ময়ূখ চৌধুরী।
ওই যে আপনার পায়ে রয়েছে একজোড়া মোকাসিন, ওই দুটো দেখেই বুঝতাম মোকাসিনের মালিক গজানন নয়, ত্রিবেদী বললেন, কারণ একটু আগেই তার সঙ্গে যখন আমার দেখা হয়েছিল, সেইসময় তার পায়ে ছিল কোলাপুরী চটি। তার পায়ে চটি দেখতেই আমি অভ্যস্ত। হঠাৎ পায়াভারি হয়ে চটির পরিবর্তে মোকাসিন চড়িয়ে আমার বাড়িতে হানা দেবে কেন গজু–না, না, গজানন? তাই বলছি গেঞ্জি আর প্যান্ট এক ধরনের বলেই ভুল হয়েছে, কিন্ত আপনার শ্রীচরণ দর্শন করলেই বুঝতে পারতাম গজুর পরিবর্তে অন্য কোনো ব্যক্তি আমার বৈঠকখানা অলঙ্কৃত করেছেন। যাক গে, এবার বলুন আপনার কপালে আর গালে এতবড়ো ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছিল?
–এমন কিছু নয়। একটু স্নেহের পরশ দিয়েছে হলুদ রাক্ষস।
–হলুদ রাক্ষস! সেটা আবার কেমন বস্তু?
–হলুদ রাক্ষস যে কেমন বস্তু তা আমিও জানি না। তবে তার স্পর্শসুখ আমি অনুভব করেছি।
-আপনার কথায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। ব্যাপারটা খুলে বলুন।
–বলছি। প্রফেসর বরেন্দ্রনাথ বসুকে আপনি নিশ্চয়ই জানেন?
–জানি মানে? বরেন তো আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে গবেষণাও করেছি।
–জানি। আপনার মত নাম-ডাক না থাকলেও উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হিসাবে বরেন্দ্রনাথ বসুর যথেষ্ট খ্যাতি আছে। তিনি আপনাকে একটি চিঠি দিয়েছেন। আমি সেই চিঠি নিয়ে এসেছি। এই সেই চিঠি।
ময়ুখ চৌধুরীর হাত থেকে একটা খাম নিলেন ত্রিবেদী। খামের মুখ আঠা দিয়ে আটকানো এবং খামের উপর লেখা আছে অধ্যাপক ত্রিলোকনাথ ত্রিবেদী।
ত্রিবেদী খামটা ছিঁড়ে চিঠি পড়লেন, তারপর ময়ুখ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, শুনুন, বরেন কি লিখেছে- ভাই তিলু, চিঠি পাওয়া মাত্র চলে আসবে। হলুদ রাক্ষসকে নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছি। ইতি বরেন।
চিঠি নামিয়ে রেখে ত্রিবেদী বললেন, যেতে পারলে তো ভালো হয়। কিন্তু বরেন যে একটা বাঘের মতো কুকুর পুষেছে, সেটার কথা মনে হলেই আর ওদিকে যেতে সাহস হয় না।
মাভৈঃ! ত্রিবেদী মশাই, মাভৈঃ! ময়ূখ চৌধুরী বললেন, বাঘের মতো কুকুর মানে, ডিকের কথা বলছেন তো? ডিক আর নেই। আপনি নির্ভয়ে বরেনবাবুর বাড়ি যেতে পারেন।
নেই। নেই মানে?
–নেই! মানে, নেই। হলুদ রাক্ষস তাকে খতম করে দিয়েছে।
–য়্যাঁ?
–হ্য, মশাই। ভয়ানক কাণ্ড। তবে শুনুন, গত বুধবার সন্ধের পর বরেনবাবুর বাড়ি গেছি আড্ডা দিতে। হঠাৎ শুরু হল ভীষণ বৃষ্টি। বরেনবাবু বললেন, এই বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি যাবেন কি করে? তার চেয়ে ময়ুখবাবু, আপনি এখানেই খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়ুন। কাল সকালে বাড়ি যাবেন।
