ডন-বৈঠক?
হ্যাঁ, তিনশো ডন আউর পানশো বৈঠক লাগান রোজ। আপনার বাত জরুর সারিয়ে যাবে।
তিনশো ডন আর পাঁচশো বৈঠক! ত্রিবেদী দারোয়ানের মুখের দিকে চাইলেন, তিনশো ডন আর পাঁচশো বৈঠক দিতে গেলে বাত তো সেরে যাবেই, আমাকেও সরে যেতে হবে দুনিয়া থেকে।
কেয়া?
কিছু না, জোর করে মুখে হাসি টেনে আনলেন ত্রিবেদী, আমি বলছিলাম কি ইয়ে, দারোয়ানজি– তোমাকে দশটা টাকা পান খেতে দিচ্ছি, তুমি আমাকে ওই গাছটা থেকে কয়েকটা পাতা তুলে নিতে দাও।
সীতারাম! সীতারাম! দারোয়ান লাঠি বগলে চেপে দুই হাতে দুই কান স্পর্শ করল, তারপর জিভ কেটে বলল, হামি পান খায় না। আর উ তো ঘুষ আছে। হামার পিতাজি বলিয়েসেন, দেখো হনুমান, তুম্ কভি ঘুষ লিবে না। উ মহাপাপ আছে। ওহি লিয়ে আমি কাভি ঘুষ খায় না– হাঁ।
হতাশ ত্রিবেদী পিছু ফিরলেন, মনে মনে বললেন, এ তো দেখছি পিতৃভক্ত হনুমান। বলে ঘুষ খাব না। কিন্তু দারোয়ানজি ঘুষ না খেলে আমাকে যে খাবি খেতে হবে… ওঃ! ভালো কথা মনে পড়েছে–
ত্রিবেদীর মুখ আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তার মনে পড়ল যেখানে কপাটি খেলা হয়েছিল, সেইখানে মাঠের ধারে ঝোপের মধ্যে তিনি একটা আশ্চর্য পাতার গাছ দেখেছিলেন– যে-গাছটা অত্যন্ত সঙ্গীন মুহূর্তে তার ইজ্জত বাঁচিয়ে দিয়েছিল–
অভীষ্ট স্থানের উদ্দেশ্যে দ্রুতবেগে পা চালালেন তিনি…
কিন্তু জায়গাটায় পৌঁছে অবাক হয়ে গেলেন ত্রিবেদী। ঝোঁপ-জঙ্গল সব সাফ, কিছু নেই ওই সঙ্গে উধাও হয়েছে আশ্চর্য পাতার গাছ!… কিন্তু ব্যাপারটা কী হল? কয়েকদিন আগেও তো ত্রিবেদী এখানে প্রচুর ঝোঁপঝাড় আর আশ্চর্য-পাতার গাছটাকে দেখতে পেয়েছিলেন- এখন সব কিছু পরিষ্কার ঝোঁপঝাড়ের জায়গায় দেখা যাচ্ছে ঘাসে-ভরা একটা জমি আর সেই জমির উপর বসে আড্ডা দিচ্ছে একদল ছেলে-ছোকরা। ত্রিবেদী তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন; প্রশ্ন করলেন, জায়গাটা খুব পরিষ্কার দেখছি। এখানে বাড়ি উঠবে নাকি?
না, না, একটি ছেলে উত্তর দিল, বাড়ি-টাড়ি কিছু হবে না। জায়গাটা আমরাই পরিষ্কার করেছি, মানে–
তাকে বাধা দিয়ে আর একটি ছেলে বলে উঠল, তুই থাম। আমি বলছি। মানে আমরা একটা পল্লী সংস্কার সমিতি করেছি। প্রথমে এখানকার ঝোঁপ-জঙ্গল সাফ করে আমাদের কাজ শুরু হয়েছে। ঝোপঝাড়ে মশা হয়, সাপ থাকে–
ত্রিবেদী বললেন, বলা যায় না, দু-একটা বাঘও হঠাৎ এসে বাসা বাঁধতে পারে।
ঠাট্টা করছেন স্যার?
পাগল! পল্লী সংস্কার অতিশয় মহৎ কার্য। তা নিয়ে ঠাট্টা চলে? ত্রিবেদী হাসলেন, আচ্ছা ভাই, চলি। তোমরা পল্লীসংস্কার চার্লিয়ে যাও।…
বাড়ির পথে চলতে চলতে চিন্তা করছিলেন ত্রিবেদী, ভালো বিপদেই পড়লাম তো! দারোয়ানটা ধর্মপুত্তর যুধিষ্ঠির, বলে ঘুষ খাব না। পাড়ার ছেলেগুলো হয়েছে তেমনি কেন রে বাবা, দুদিন বাদে পল্লীসংস্কার করলে ক্ষতি কী ছিল? আমারই কপাল খারাপ। তবে তিনদিন সময় পাওয়া গেছে। ডা. সাটিরার সাগরেদ গজু আমার বাড়িতে হানা দেবে তিনদিন পরে তার আগেই আমি এখান থেকে সরে পড়ব।
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল হেঁড়ে গলার চিৎকার, এই যে ত্রিবেদী স্যার?
চমকে পিছন ফিরলেন অধ্যাপক, পরক্ষণেই তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল, আরে! গজু যে! কোথায় গিয়েছিলে?
কোথাও যাইনি, স্যার। আসছিলাম।
আসছিলে? কোথা থেকে?
আজ্ঞে, আপনি যেদিক থেকে আসছেন, আমিও সেই দিক থেকে আসছি।
তার মানে?
মানে, আপনি যদি কোন বিপদে পড়েন, তাই দূর থেকে আপনার দিকে নজর রাখছিলাম। আপনি তো আমাদের দলে আসছেন, তাই হঠাৎ আপনি যাতে বিপদে না পড়েন, সেটাও তো। আমাদের দেখা উচিত।
কিন্তু হঠাৎ আমি বিপদে পড়ব কেন?
বিপদ-আপদের কথা কী বলা যায়, চোখ টিপে হাসল গজু, দু-দিন বাদেই তো আপনি আমাদের দলে আসছেন, তাই একটা কথা আপনাকে বলে যাই– ডা. সাটিরা আমায় গজু বলে ডাকে, কিন্তু ওই নামে ডাকা আমি পছন্দ করি না। আমার নাম গজানন সরখেল। আপনি আমায় গজানন বলেই ডাকবেন। আচ্ছা, চললাম।
লম্বা লম্বা পা ফেলে অদৃশ্য হল গজানন সরখেল। তার গমনপথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ত্রিবেদী, তারপর আবার বাড়ির পথ ধরলেন তার মাথার মধ্যে চিন্তার যন্ত্রটা আবার চলতে শুরু করল পালানো মুশকিল। সাটিরার হুকুমে গজু- না, না, গজানন- আমার উপর নজর রাখছে… ওর নজর এড়িয়ে পালাব কেমন করে? …নাঃ, আর ভাবতে পারছি না.. এই তো বাড়ি এসে পড়েছি। আগে একটু বিশ্রাম করি, তারপর বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটা উপায় বার করতেই হবে…।
দরজার সামনে এসে চমকে গেলো ত্রিবেদী, দরজাটা হাঁকরে খোলা! সনাতনকে একহাত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে সশব্দে গৃহপ্রবেশ করলেন তিনি আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ের চমক! সোফায় বসে মুখের উপর বই তুলে যে-লোকটা বই পড়ছে, বই-এর আড়ালে তার মুখ ঢাকা পড়লেও রঙিন ডোরাকাটা গেঞ্জি আর রং-চটা জিনসের প্যান্ট দেখেই অতিথির স্বরূপ নির্ণয় করতে ত্রিবেদীর দেরি হল না।
চশমার ভিতর থেকে দুই চোখের দৃষ্টি যথাসাধ্য তীব্র করে চাইলেন ত্রিবেদী– ভুল হচ্ছে না তো?… নাঃ, সেই ডোরাকাটা গেঞ্জি আর জিনসের প্যান্ট। পা দুটো সেন্টার টেবিলের তলায় বলে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ত্রিবেদী জানেন ওই পা দুটোতে রয়েছে দুটো কোলাপুরী চটি।
