অত্যন্ত লজ্জিতভাবে ডাঃ সাটিরা বললেন, কিন্তু মিঃ ত্রিবেদী, আপনাকে তো আমরা রিভলভার তুলে ভয় দেখাইনি। পুলিশ তো বটেই, তাছাড়া আর দু-একটা ডাকাতের দল আমাদের শত্রু– কাজেই আত্মরক্ষার জন্য আমাকে রিভলভার রাখতে হয়।
খুব ভয়ে ভয়ে থেমে থেমে ত্রিবেদী বললেন, কিন্তু যাঁর কাছে আপনারা চাবি চেয়েছিলেন, সেই ভদ্রলোক তো ইচ্ছে করলেই আপনাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে পারতেন। তিনি রিভলভার বার করার পরে আপনি তাকে গুলি করেছিলেন। ভদ্রলোকের মধ্যে নিশ্চয় একটা ইতস্তত ভাবছিল। তিনি ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন, গুলি চার্লিয়ে আপনাদের আহত বা নিহত করতে চাননি।
ত্রিবেদী স্যার, আপনি ডাক্তার সাহেবকে চেনেন না, গজু একগাল হাসল,লোকটার চোখ দেখেই আমরা বুঝেছিলাম ও আমাদের গুলি করবে। কিন্তু সে আমাদের দিকে রিভলভার তা করার আগেই ডাঃ সাহেব পকেট থেকে নিজের রিভলবার বার করে লোকটার ডান হাতের কবজি ফুটো করে দিলেন, ওর হাত থেক অস্ত্রটা পড়ে গেল আর আমরাও বেঁচে গেলাম… ত্রিবেদী স্যার, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না মনে হচ্ছে… ডাক্তার সাব, একবার আপনার কেরামতিটা ত্রিবেদী স্যারকে দেখিয়ে দিন তো।
পরক্ষণেই যা ঘটল, তার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না ত্রিবেদী, ডাঃ সাটিরার দক্ষিণ হস্ত একবার শূন্যে আন্দোলিত হয়েই আবার পকেটে ঢুকে গেল, সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল কাঁচের গুঁড়ো! ত্রিবেদী দেখলেন মাথার উপর অবস্থিত দুটি বাহু-এর মধ্যে যথাস্থানে বিরাজ করছে একটিমাত্র বাহু, দ্বিতীয়টির হোল্ডার থেকে ঝুলছে অনুপস্থিত বালএর ভগ্নাংশ!
গজু দন্তবিকাশ করল, দেখছেন ডাক্তার সাহেবের হাতের টিপ? আপনি তো রিভলভারটাও দেখতে পাননি, ত্রিবেদী স্যার?
না, কালো মতো কি-যেন একটা দেখেছিলাম মুহূর্তের জন্য, তারপরই সেটা আবার ঢুকে গেল ডাঃ সাটিরার পকেটের মধ্যে, হতবুদ্ধি হয়ে বিভ্রান্ত ত্রিবেদী বললেন, কিন্তু কোনো আওয়াজ তো পেলাম না। বাশ্বটাকে যদি রিভলভার ছুঁড়ে ভাঙা হয়ে থাকে, তবে গুলির শব্দ পেলাম না কেন?
ওটাতে সাইলেন্সার লাগানো ছিল, তাই আওয়াজ হয়নি, উঠে দাঁড়ালেন ডাঃ সাটিরা, আজ আমরা চলি। তিনদিন পর গজুকে আপনার কাছে পাঠাব। এই তিনদিন আপনি চিন্তা করার সময় পাবেন। আমি অবশ্য নিশ্চিত জানি আপনি আমার প্রস্তাবে সায় দেবেন। নমস্কার। চল গজু।
.
০৪. বিপদের বেড়াজাল
দুই মূর্তি স্থানত্যাগ করার পরেও স্থির হয়ে বসে রইলেন অধ্যাপক ত্রিবেদী। একেই বোধহয় বজ্রাহত অবস্থা বলা হয়। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন ত্রিবেদী। তাঁর মাথার মধ্যে তখন চিন্তার আবর্ত
ডাঃ সাটিরা আমাকে একরকম হুমকি দিয়েই গেল। খুব কায়দা করে ডাব খাওয়া আর গল্প বলার ছল করে ছুরি আর রিভলভার দেখিয়ে গেল আমাকে। অর্থাৎ ওর প্রস্তাবে রাজি না হলে ওরা আমায় খুন করবে… আচ্ছা, গোলাপ কলোনি আর বাগনান ক্লাবের ছেলেদের কাছে সাহায্য চাইলে কেমন হয়?… না, ওরা ভাববে ত্রিবেদী স্যার ভয় পেয়েছে.. আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে… তাছাড়া ওরা তো সবসময় আমাকে পাহারা দিতে পারবে না, কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে সাটিরা আর গজু নির্ঘাত আমাকে পাকড়াও করে ফেলবে। ছুরি বা রিভলবার দরকার হবে না। গজু ব্যাটা যদি আস্তে গলা টিপে দেয়, তাহলেই আমি মারা পড়ব!… মহাবিপদে পড়লাম তো… এখন কী করা যায়?…
হঠাৎ ত্রিবেদীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আশ্চর্য-পাতা! ঠিক আশ্চর্য পাতা দিয়েই দুই শয়তানকে ঘায়েল করব। ছুরি ভোলার আগেই এক রদ্দায় গজুকে শুইয়ে দিয়ে ঝাঁপ দেব সাটিরার ঘাড়ে। রিভলভারে হাত দেওয়ার সুযোগই ডাক্তার পাবে না। আশ্চর্য-পাতার আশ্চর্য ক্ষমতা আমার দেহে আনবে অমানুষিক শক্তি আর বিদ্যুতের গতি।
বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতের এক ঘুসি বসিয়ে আপন মনেই হেসে উঠলেন ত্রিবেদী, বাড়িতে আর আশ্চর্য-পাতা নেই। হানাবাড়ি থেকে কয়েকটা পাতা আগে নিয়ে আসি, তারপর দেখে নেব দুই শয়তানকে…
হানাবাড়ির ফটকে এসেই থমকে দাঁড়ালেন ত্রিবেদী। বাড়ির ফটক আজ অরক্ষিত নয়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক দারোয়ান! দারোয়ানের দেহ দারোয়ানসদৃশ হৃষ্টপুষ্ট, গোঁফজোড়া দস্তুর মতো জমকালো এবং তার হাতে রয়েছে এমন একখানা লাঠি, যার আঘাত মাথায় পড়লে সুন্দরবনের বাঘও অক্কা পাবে- নিতান্তই যদি সে মারা না পড়ে, তাহলেও চিরজীবন তাকে মাথাধরার অসুখে ভুগতে হবে।
ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ত্রিবেদীকে ইতস্তত করতে দেখে দারোয়ান বলল, এ বাবু, আপনি কুথায় যাইবেন?
ত্রিবেদী শুকনো ঠোঁটের উপর জিভ বুলিয়ে নিলেন, এই বাড়িতে কেউ তো থাকত না। তোমরা বুঝি ভাড়া নিয়েছ?
ভাড়া কেন লিবে? এ বাড়ি অনেকদিন পড়িয়ে আসে। এখনো বাবুর লেড়কার শাদি হয়েসেন। তাই ছোটোবাবু বহুজীকে লিয়ে এখানে থাকবেন। তা আপনি এখোন কুথায় যাইতেসেন?
-ইয়ে, আমি, মানে আমি কয়েকটা গাছের পাতা নিতে চাই।
–পাতা! পাতা লিয়ে কী হোবে?
ত্রিবেদী ঢোক গিললেন, ইয়ে কি বলে, ওই পাতার রস খেলে বাত সেরে যায়। আমার আবার বাতের ব্যথা আছে কিনা।
দারোয়ান একগাল হাসল।ছোঃ! উ পাতা-উতা খেয়ে কী হোবে? হামার কথা শোনেন। ডন আউর বৈঠক লাগান, বাত-ফাৎ কুছু থাকবে না– হাঁ।
