ত্রিবেদী অপেক্ষা করতে লাগলেন, মুখে মুখে এখনই নিশ্চয় ডাঃ সাটিরা আবার তার ধারাভাষ্য শুরু করবেন। কিন্তু রুমালটা পকেটে রেখে ডাক্তার যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখনই ত্রিবেদী বুঝলেন এইবার তিনি প্রস্থানের উদ্যোগ করছেন ধারাভাষ্য অসমাপ্ত রেখে!
অসমাপ্ত ধারাভাষ্য ত্রিবেদীর মনে আতঙ্কের সঞ্চার করেছিল, তিনি বলে উঠলেন, আপনি বলছিলেন খুনোখুনি পছন্দ না করলেও অবস্থা বিশেষে কখনো কখনো আপনারা অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। একবার একটা মা- পর্যন্ত বলেই হাঁচির ধাক্কায় আপনি থেমে গেলেন। আপনি কি বলতে চাইছিলেন ইচ্ছার বিরুদ্ধেই একবার একটা মানুষকে খুন করতে আপনারা বাধ্য হয়েছিলেন?
ইচ্ছার বিরুদ্ধেই অবশ্য খুনটা করতে বাধ্য হয়েছিল গজু, ডাঃ সাটিরা বললেন, তবে মানুষ নয়, মাসটিফ।
-মাসটিফ!
হ্যাঁ মাসটিফ। আপনি কি কখনো মাসটি কুকুর দেখেননি, মিঃ ত্রিবেদী?
কুকুর! প্রথমে ডাঃ সাটিরার বক্তব্য বুঝতে পারেননি ত্রিবেদী, তারপর তার বোপোদয় হল, বলেন কি ডাঃ সাটিরা! মাসটিফ কুকুর দেখেছি বৈকি! সে তো বাঘের ছোটোখাটো সংস্করণ! অ্যালসেশিয়ন বা ডোবারম্যান তো মাসটিফ-এর তুলনায় দুগ্ধপোষ্য শিশু!
-আপনি ঠিকই বলেছেন মিঃ ত্রিবেদী। ওই মাসটিফ কুকুরটা তেড়ে কামড়াতে এসেছিল আমাদের। তাই গজু নিতান্ত বাধ্য হয়েই ছুরি চার্লিয়েছিল। কুকুরটাকে মেরে ফেলার ইচ্ছা আমাদের ছিল না তাই না গজু?
-আজ্ঞে হ্যাঁ, গজু বলল, কুকুরটা যখন তেড়ে এল, তখন নিজেকে আর ডাক্তারকে বাঁচাতেই ছুরি চার্লিয়েছিলাম। কুকুরটার গলা এত নরম ছিল যে, আস্তে ছুরি চালাতেই তার গলা একেবারে দুর্ফাক হয়ে গেল। বিশ্বাস করুন ত্রিবেদী স্যার, কুকুরটাকে মেরে ফেলার ইচ্ছে আমার ছিল না।
কাঁচুমাচু হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে গজু বুঝিয়ে দিল মাসটিফ কুকুরের অপমৃত্যুতে সে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত।
কিন্তু ত্রিবেদী এমন আধখানা বিবরণ শুনে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, তিনি প্রশ্ন করলেন, কিন্তু মাসটিফ কুকুরটা হঠাৎ আপনাদের আক্রমণ করল কেন?
–আর বলবেন না। বিরক্তভাবে কাঁধ নাচিয়ে ডাঃ সাটিরা বললেন, কুকুরের মালিক মাসটিফকে লেলিয়ে দিয়েছিল যে!
লেলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কেন? বিনা কারণে কেউ কখনো কুকুর লেলিয়ে দেয়? বিশেষ করে মাসটিফ-এর মতো হিংস্র কুকুরকে?
আর বলবেন না মশাই। মাসটিফ-এর মালিকটা ছিল পাজির পাঝাড়া! আমরা খুব বিনীতভাবে তার আলমারির চাবিটা চেয়েচিলুম। চাবি তো দিলই না, উলটে কুকুর লেলিয়ে দিল। এরা কি ভদ্রলোক? ছ্যা, ছ্যা, ছ্যা!
ভদ্রলোকের ভদ্রতাবোধ নিয়ে ত্রিবেদী সংশয় প্রকাশ করলেন না, তিনি জানতে চাইলেন, কুকুরটাকে মারার পরে ভদ্রলোক চাবি দিতে নিশ্চয়ই রাজি হয়েছিলেন?
–না, মশাই। এক-একটা লোক ভারি তাঁদোড় হয়। এই যে চাবি দিচ্ছি বলেই ভদ্রলোক দেরাজ খুলে রিভলভার বার করলেন। কী অসভ্য মানুষ বুঝুন আমরা দু-দুজন ভদ্রলোক অতিশয় বিনীতভাবে তার আলমারির চাবি চাইলুম আর সে কিনা কুকুর লেলিয়ে দিল। তাতে সুবিধা হল না দেখে বার করল রিভলভার! আমরা তো তাকে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখাইনি, আমাদের সঙ্গে লোকটা কীরকম দুর্ব্যবহার করল, ভেবে দেখুন।
লোকটা খুব দুর্ব্যবহার করেছে, একথা মানতে রাজি হলেন না ত্রিবেদী, আপনারা তার কুকুরটাকে ছুরি মেরে খুন করলেন। তারপর তার আলমারি খুলে তাঁকে সর্বস্বান্ত করতে চাইলেন, তখন যদি ভদ্রলোক রিভলভার বার করেন তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। যাই হোক, তিনি তো আপনাদের গুলি করেননি বা পুলিশে দেননি, তাহলে এই মুহূর্তে আপনারা আমার সামনে বহাল তবিয়তে উপস্থিত থাকতে পারতেন না।
কী যে বলেন স্যার, গজু হাসল, লোকটা নির্ঘাত আমাদের গুলি করত। ছুরি দিয়ে তো আর রিভলভারের মোকাবিলা করা যায় না। সেদিন আর একটু হলেই মারা পড়তাম।
বাঁচলে কি করে?
–ডাক্তার সাহেবই বাঁচালেন। ঝট করে পকেট থেকে নিজের রিভলভার বার করে এত তাড়াতাড়ি গুলি করলেন যে, ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার আগেই লোকটার হয়ে গেল।
–হয়ে গেল, তার মানে? লোকটাকে গুলি চার্লিয়ে মারলেন নাকি ডাঃ সাটিরা?
না, মিঃ ত্রিবেদী, ডাঃ সাটিরা হাসলেন, আমি মনে-প্রাণে অহিংস সহজে গুলি চালাই না। লোকটা যখন রিভলভার বার করল, তখন আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয়েই তার কবজিতে একটা ফুটো করে দিলাম।
ত্রিবেদীর চোখে মুখে আতঙ্কের আভাস দেখে তাড়াতাড়ি তাকে সান্ত্বনা দিতে সচেষ্ট হলেন ডাঃ সাটিরা, ভেবে দেখুন, লোকটাকে খুন করে আমরা চাবিটা হাতিয়ে নিতে পারতুম, কিন্তু আমরা তা করিনি। ঘরের ভেতর খোঁজাখুঁজি করে চাবিটা বার করে কাজ হাসিল করলুম। চলে যাওয়ার সময়ে লোকটা চিৎকার করে তোক জমিয়ে ফেলতে পারে ভেবে শ্রীমান গজু তাকে গলা টিপে অজ্ঞান করতে বাধ্য হয়েছিল।
গজু তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ জানাল, আমি খুব আস্তে গলা টিপেছিলাম এ কথাটা তো আপনি বললেন না, ডাক্তার!
–-হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব আস্তে গলা টিপেছিল গজু।
ডাঃ সাটিরা ও গজুর উদারতায় খুব মুগ্ধ হলেন না ত্রিবেদী। তিনি সভয়ে প্রশ্ন করলেন, ডাঃ সাটিরা, আপনি কি সবসময় পকেটে রিভলভার নিয়ে ঘোরেন? আমার সঙ্গেও কি আপনি রিভলভার নিয়ে দেখা করতে এসেছেন?
