ডাবটাকে ডাঃ সাটিরার দিকে এগিয়ে দিয়ে গজু বলল, জল খেয়ে ডাব ফেলে দেবেন না ডাক্তার। শাঁসটা আমি খাব।
এক নিঃশ্বাসে জল পান করে ডাবটা গজুর প্রসারিত হস্তে সমর্পণ করলেন সাটিরা।
ত্রিবেদী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ডাবের খোলা কি ছুরি দিয়েই কাটবে?
না, না, গজুর তুরন্ত জবাব, ওতে ছুরির ধার নষ্ট হয়ে যায়। আমি ঘুষি মেরে ডাব ফাটাব।
–আজ্ঞে হ্যাঁ, বিগলিত হাস্যে ডাঃ সাটিরা জানালেন, গজু তো ঘুসি মেরেই ডাব ফাটায়।
ডাঃ সাটিরার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই শ্রীমান গজুর বদ্ধমুষ্টি পড়ল ডাবের উপর, সশব্দে ভেঙে গেল ডাবের খোলা! ছুরিটা এইবার চামচের স্থান গ্রহণ করল, ভোলা থেকে শাঁস ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে গজু মুখে ফেলতে লাগল ছুরির সাহায্যে।
ত্রিবেদীর মুখ দেখে তার মনের ভাব আন্দাজ করতে পারলেন ডাঃ সাটিরা, আপনি অবাক হচ্ছেন মিঃ ত্রিবেদী? হাঃ! হাঃ! গজু ছুরি দিয়ে কতরকম কাজ করে ভাবতে পারবেন না। শাক-সবজি ফলমূল কাটে, মাংস খেতে হলেও ওই ছুরি দিয়ে কেটে ফর্ক অর্থাৎ কাটার বদলে ওইটা দিয়েই মাংসের টুকরো বিধে মুখে তোলে– এমনকি মাছের কাঁটা ছাড়িয়ে মাছ খায় গজু ওই ছুরির সাহায্যে। তাছাড়া আত্মরক্ষার জন্যেও ওটা দরকার হয় মাঝে মাঝে।
–আত্মরক্ষার জন্য ছুরি? কারও সঙ্গে ঝগড়া হলে গজু বুঝি ছুরি চার্লিয়ে দেয়?
-আরে, না, জিভ কাটলেন ডাঃ সাটিরা, গজু খুব শান্তিপ্রিয় মানুষ। কারও সঙ্গে যদি ঝগড়া হয়, কেউ যদি ওর গায়ে হাত তোলে, তাহলেও গজু পালটা মার দিতে চায় না, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মারমুখো লোকটাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। তবে
-তবে? তবে কী? ত্রিবেদীর উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন।
–তবে সব কিছুরই তো শেষ আছে। গজুর ধৈর্যও অসীম নয়। তাই দু-এক সময় হাত চালাতে হয় নিতান্ত আত্মরক্ষার জন্য। এই তো কয়েকদিন আগে নটার শোতে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরছি, হঠাৎ কোথা থেকে এসে তিনটে গুণ্ডা রাস্তার মধ্যেই আমাদের ঘেরাও করে জানাল কয়েকদিন আগে যে কাজটা করে আমরা মাত্র লাখ পাঁচেক টাকা হাতে পেরেছিলাম, সেখান থেকে তিন লাখ টাকা তাদের সেলামি দিতে হবে। আবদারটা শুনুন– আমরা মাথা খাঁটিয়ে কাজ করলুম, পুলিশ আর জনগণের ঠ্যাঙানির ঝুঁকি নিয়ে প্রাণ বিপন্ন করলুম–আর ওরা কিছু না করেই ফোকটে তিন লাখ টাকা মেরে দেবে? বলুন, এটা অন্যায় নয়?
অবাক হয়ে ত্রিবেদী বললেন, এরকম হয় নাকি?
–হয়। একে বলে গুণ্ডা-সেলামি। ওদের এলাকায় কাজ করলেই নাকি সেলামি দিতে হবে। ওদের এলাকা মানে? এলাকা তো সরকারের, অন্যায় হলে সরকার দেখবে- তোমরা কে?
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ত্রিবেদী ডাক্তারের ধারাবিবরণীতে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন, তারপর কী হল? গজু ছুরি বার করে ভয় দেখাতেই ওরা সরে পড়ল বুঝি?
না, না, প্রশান্ত হাস্যে বিস্তৃত হল ডাক্তারের ওষ্ঠাধর, গজু শুধু দুটো গুণ্ডাকে খুব আস্তে আস্তে ঘুসি মেরেছিল। আর একটা গুণ্ডা ছুরি বার করেছিল বলে তার হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়েছিল। বলব কি মশাই, তাতেই দুটো গুণ্ডা পাঁজর-টাজর ভেঙে অজ্ঞান। আর ছুরি হাতে গুণ্ডাটার নাকি হাত ভেঙে গিয়েছিল।
ছুরি দিয়ে ডাবের শাঁস মুখে ফেলে খুব দুঃখিত মুখে গজু বলল, আমি একহাতে কব্জিটা চেপে ধরেছিলাম, তাতেই লোকটার হাত থেকে ছুরি খসে পড়েছিল। আমি সেই ছুরিটা একবারও তুলে নিতে চেষ্টা করিনি। ডাক্তার সাহেব ভুল বলেছে, আমি ছুরি কেড়ে নিই নি।
ঠিক কথা, ডাক্তার মাথা নেড়ে গজুর কথায় সায় দিলেন, আমারই ভুল হয়েছে। ছুরিটা ওই লোকটার হাত থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু–
শঙ্কিতস্বরে ত্রিবেদী বললেন, কিন্তু? আবার কিন্তু কীসের? থামলেন কেন ডাঃ সাটিরা? দুজন অজ্ঞান, একজনের হাত ভেঙে ছুরি মাটিতে পড়ে গেছে, আপনারা নিশ্চয়ই চটপট জায়গাটা থেকে চলে এলেন?
কাঁচুমাচু হয়ে খুব বিনীত ভাবে ডাঃ সাটিরা বললেন, সেইরকমই আমাদের ইচ্ছে ছিল। কিন্তু যে-লোকটার হাত ভেঙে গিয়েছিল সেব্যাটা হাত চেপে ধরে এমন চাঁচাতে শুরু করল যে, আমাদের ভয় হল এখনই সেখানে লোকজন ছুটে আসবে, এমনকি পুলিশও উপস্থিত হতে পারে, তাই–
–তাই কী?
এবার আর ডাক্তার নয়, তাঁর সুযোগ্য সাগরেদ গজু বলে উঠল, তাই খুব আস্তে করে গলা টিপে লোকটাকে চুপ করিয়ে দিলাম।
বলো কি গজু! লোকটাকে গলা টিপে চুপ করিয়ে দিলে! তার মানে লোকটার দম বন্ধ হয়ে সে মারা পড়েছিল?
না, বোধহয়, গজুর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, ছুরিটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে বলল, খুব আস্তে গলা টিপেছিলাম তো, বোধহয় মারা যায়নি।
হ্যাঁ, মিঃ ত্রিবেদী, ডাঃ সাটিরা বললেন, খুনোখুনি আমরা পছন্দ করি না। তবে পরিস্থিতি সবসময় তো আমাদের অনুকূলে থাকে না। অবস্থা বিশেষে নিতান্ত বাধ্য হয়েই আমাদের কখনও কখনও অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একবার একটা মা
এই পর্যন্ত বলেই হঠাৎ এক দারুণ হাঁচি দিলেন ডাঃ সাটিরা। হাঁচির ধাক্কা সামলে সবে তিনি মুখ তুলে কথা বলতে যাবেন, এমন সময়ে আবার হল হাঁচির আক্রমণ! পর পর পাঁচটি হাঁচি দিয়ে ম্রিয়মাণ ডাক্তার পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, হাঁচি বড়ো সাংঘাতিক জিনিস, বুঝলেন মিঃ ত্রিবেদী– কিছুতেই সামলানো যায় না।
