পাড়ায় ভীষণ চুরি হচ্ছে স্যার। আমরা অর্থাৎ পাড়ার ছেলেরা ঠিক করেছি সারারাত ধরে রোজই পাহারা দেব। রোজ-রোজ রাত জেগে পাহারা দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়; তাই আমরা ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে পালা করে পাহারা দেব বলে ঠিক করেছি। আজ যে দল পাহারা দেবে, সেই দলটার পরিচালনা করার ভার পড়েছে আমার উপর। আপনি স্যার, রাতে একটু সজাগ থাকবেন। যদি চোর আসে তাহলে চিৎকার করবেন। পাড়ায় বলা আছে কোনো বাড়ি থেকে বিপদের আভাস পেলে অন্যান্য বাড়ি থেকে চিৎকার করে সাড়া দেবে তাদের গলার আওয়াজ যাদের কানে যাবে, তারাও চাঁচাবে। আমরা যদি কাছাকাছি না-ও থাকি, তাহলেও চিৎকার শুনতে পাব। কারণ বাড়ি থেকে বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে একসময় আওয়াজটা সারা পাড়াতেই ছড়িয়ে পড়বে। আর সেই সতর্কবার্তা শুনতে পেলেই আমরা ছুটে এসে সমস্ত এলাকা ঘিরে ফেলব। আমাদের সঙ্গে অনেকগুলো সাইকেল রয়েছে, কাজেই চোর কোনো বাড়িতে ঢুকে সহজে কাজ হাসিল করে সরে পড়তে পারবে বলে মনে হয় না। আচ্ছা স্যার, এখন চলি। আবারও বলে যাচ্ছি সাবধানে থাকবেন।
ঘোঁতন প্রস্থান করল। ডাঃ সাটিরা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন, এইবার মন্তব্য করলেন, যত সব উটকো ঝামেলা। হ্যাঁ, মিঃ ত্রিবেদী, আমি তাহলে আমার বক্তব্য শুরু করতে পারি?
দয়া করে সংক্ষেপে বলবেন।
–সংক্ষেপেই বলছি। যাদের প্রচুর অর্থ আছে, তাদের সম্পদের পরিমাণ কমিয়ে আমি আমার এবং দলের লোকের শ্রীবৃদ্ধি করতে চাই। মন্দ লোকে অবশ্য আমাদের সমাজবিরোধী, ডাকাত প্রভৃতি বিশেষণে ভূষিত করে, কিন্তু বাজে লোকের বাজে কথায় আমরা কান দিই না। উপযুক্ত কর্মীকে আমরা প্রচুর পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি। আপনি আমাদের দলে এলে দলের শক্তি বাড়বে। লুঠের মাল বিক্রি করে যে-টাকা পাওয়া যাবে, তার চারভাগের এক ভাগ আপনাকে দেওয়া হবে। ভাগ্য যদি সদয় থাকে, আর আপনি যদি মন দিয়ে কাজ করেন, তাহলে তিন-চার মাসের মধ্যেই আপনি লাখ টাকা কামিয়ে নিতে পারবেন।
কিন্তু আমি, ইয়ে, মানে… কী বলে. আমি তো এসব কাজ জীবনে কখনো করিনি, ত্রিবেদী সভয়ে বলে উঠলেন, আর ইয়ে হয়েচে… মানে টাকা পয়সার উপর আমার তেমন লোভ নেই। আমায় মাপ করুন ডাঃ সাটিরা।
ডাঃ সাটিরার চোখে ভেসে উঠল নির্দয় হিংসার কুটিল ছায়া, কিন্তু কণ্ঠস্বর শিষ্টাচারে মার্জিত মধুর, মিঃ ত্রিবেদী, আপনি কি পারবেন আর না-পারবেন, সেই বিষয়ে আমার ধারণা খুবই স্পষ্ট… ওঃ! ওই যে ডাবওয়ালা যাচ্ছে, গজ ডাব নিয়ে আয়। বড়ো তেষ্টা পেয়েছে। দাঁড়া, দাঁড়া- মিঃ ত্রিবেদী, ডাব খাবেন নাকি?
দুর্বল স্বরে ত্রিবেদী বললেন, আজ্ঞে না।
অবশ্য এই মুহূর্তে ডাবের জল অথবা ঠান্ডা পানীয় জলের প্রয়োজন তিনি অনুভব করছিলেন, কিন্তু ডাঃ সাটিরার হাত থেকে খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করার প্রবৃত্তি তার ছিল না।
গজু গেল ডাব আনতে। একবার সেইদিকে তাকিয়ে আবার ত্রিবেদীর উপর দৃষ্টিপাত করলেন সাটিরা, গজু ডাব নিয়ে ফিরে আসুক। ডাবের জল পান করে আমি চলে যাব। আপনার মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করব না। আমার মনে হয় ডাবের জল পান করতে আমার যেটুকু সময় লাগবে, সেই সামান্য সময়ের মধ্যেই আপনার বর্তমান সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন আপনি অনুভব করবেন।
ত্রিবেদী স্খলিতস্বরে বললেন, কিছু যদি মনে করেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
-অবশ্যই, একটা ছেড়ে হাজারটা প্রশ্ন করুন, আমি কিছু মনে করব না।
–মানে, ইয়ে, ডাঃ সাটিরা
-বলুন, বলুন, অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? দলে আসার আগে আপনি অনেক কিছুই জানতে চাইতে পারেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। বলুন, কী জানতে চান?
–পাড়ার ব্যাপারগুলো বোধহয় আপনাদেরই কীর্তি?
–আপনি পাগল হয়েছেন, মিঃ ত্রিবেদী? এমন তুচ্ছ কাজে আমি এনার্জি নষ্ট করি না। আমার কথা হচ্ছে মারি তো গণ্ডার, লুঠি তো ভাণ্ডার। পাড়ার চুরি-টুরি হচ্ছে ছ্যাচড়াদের কাজ। এইসব কাজের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
ডাক্তার, খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল গজু, হাতে তার একটা বড়োসড়ো ডাব, ডাব এনেছি, এখনই খাবেন তো?
–হ্যাঁ। কেটে দে।
ত্রিবেদী দেখলেন ডাবের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা বোঁটা, অর্থাৎ ডাবের মুখ অক্ষত। তিনি বললেন, ডাবওয়ালাকে দিয়ে ডাবের মুখ কাটিয়ে আনা উচিত ছিল। এখন ডাব কাটবে কি করে? দেখি, বাড়ির ভিতরে যদি একটা কাটারি পাওয়া যায়।
কাটারি আনার জন্য সনাতনের উদ্দেশে বাড়ির ভিতর যাওয়ার উপক্রম করলেন ত্রিবেদী, কিন্তু তাঁকে বাধা দিয়ে ডাঃ সাটিরা বলে উঠলেন, আপনি ব্যস্ত হবেন না, মিঃ ত্রিবেদী। গজুর কাছে ছুরি আছে।
ছুরি! ছুরি কি হবে? ছুরি দিয়ে কি ডাব কাটা যায়?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, গজু বলল, ছুরি দিয়ে সব কিছুই কাটা যায়। মানুষ পর্যন্ত কাটা যায়, আর ডাব কাটা যাবে না?
-তার মানে? তুমি কি মানুষও কাটো নাকি?
–হে! হে! আপনি স্যার দারুণ মজার কথা বলতে পারেন। হে! হে! হে!
ত্রিবেদীর বিস্ফারিত দৃষ্টির সম্মুখে পকেট থেকে একটা চ্যাপ্টা বস্তু বার করল গজু খ করে একটা মৃদু শব্দ- পরক্ষণেই সেই চ্যাপ্টা জিনিসটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল শাণিত ইস্পাতের ফলা! স্প্রিং-এর ছুরি!
ছুরিটার দিকে তাকিয়ে ত্রিবেদী ভাবতে লাগলেন তার কথার মধ্যে মজা কোথায় পেল গজু? নাকি, মানুষ কাটার ব্যাপারটাই তার কাছে মজার ব্যাপার! ত্রিবেদীর সর্বাঙ্গ হল ঘর্মাক্ত, ভীত দৃষ্টি মেলে তিনি দেখলেন ছুরি দিয়ে কচাকচ ডাবের মুখ উড়িয়ে দিল গজু, তারপর মুচকি হেসে ত্রিবেদীর দিকে তাকিয়ে ছুরিটাকে সজোরে বসিয়ে দিল ডাবের মুখে, ছিটকে পড়ল খানিকটা জল সদ্যছিন্ন ডাবের ছিদ্র থেকে।
