-ঠিক! ঠিক!
ডাক্তার সাটিরা! ত্রিবেদী সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, আমি ভেবেছিলাম আপনি বাঙালি!
আলবৎ বাঙালি, ডাঃ সাটিরা নামক ব্যক্তি দন্তবিকাশ করলেন, আমার পিতৃদত্ত নাম বিনয়ভূষণ সাঁতরা। হোপলেস! রট! একেবারে বাজে নাম। ওই নাম নিয়ে আর করে খেতে হত না। তাই ওটা বদলে নাম নিলাম ডাঃ বি.বি. সাটিরা, সংক্ষেপে ডাঃ সাটিরা।
আমতা আমতা করে ত্রিবেদী বললেন, ইয়ে কী বলে ডাঃ সাটিরা, দয়া করে অল্প কথায় আপনার বক্তব্য শেষ করুন। আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত।
নিশ্চয়, নিশ্চয় ডাঃ সাটিরা সহাস্যে বললেন, আমিও অল্প কথার মানুষ, অল্প কথায় আমার বক্তব্য রাখব। যারা বেশি কথা বলে, তারা বাজে কথা বলে-যারা বাজে কথা বলে, তারা কাজের মানুষ নয়- যারা কাজের মানুষ নয়, তারা অমানুষ। আর অমানুষদের আমি ঘৃণা করি। আপনি যদি–
-প্লিজ ডাঃ সাটিরা। অনুগ্রহ করে খুব অল্প কথায় আপনার বক্তব্য শেষ করুন।
খুব অল্প কথা? ডাঃ সাটিরাকে কিঞ্চিৎ ভাবিত মনে হল, আচ্ছা, আমি খুউব অল্প কথায় আপনাকে সব বুঝিযে বলছি। আপনি যদি আমার কথা বুঝতে না পারেন, তাহলে আপনি আমায় বুঝিয়ে বলবেন যে আমার কথা আপনি বুঝতে পারেননি– আপনি যদি আমায় বুঝিয়ে না বলেন যে আমার কথা আপনি বুঝতে পারেননি, তাহলে আমি কী করে বুঝব যে আমার কথা আপনি বুঝতে পারেননি? বুঝেছেন? হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? যদি আমার কথা আপনার বুঝতে অসুবিধা হয়, তাহলে আবার গোড়া থেকে- কী হল?
দুই চোখ কপালে তুলে গজু বলল, কী হল ডাঃ সাটিরা? ত্রিবেদী স্যার হঠাৎ মাটিতে বসে পড়লেন কেন?
সত্যিই তাই। এতক্ষণ অতিথিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন ত্রিবেদী। ভদ্রতাবশত তাদের আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা উচিত ছিল, অতিথি অনাহূত এবং অবাঞ্ছিত হলেও তাদের দাঁড় করিয়ে রাখা অভদ্রতা। কিন্তু ইচ্ছা করে অভদ্রতা করেননি ত্রিবেদী, অতিথিদের তাড়াতাড়ি বিদায় দিয়ে অসমাপ্ত গবেষণাকার্যে মনোনিবেশ করার জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বলেই তিনি তাদের বসতে অনুরোধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন, আর নিজেও দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন কিন্তু হঠাৎ তিনি ধপাস করে বসে পড়লেন মেঝের উপর।
এগিয়ে এসে উদ্বিগ্নকণ্ঠে ডাঃ সাটিরা বললেন, আপনি হঠাৎ মাটিতে বসে পড়লেন কেন? অসুস্থ বোধ করছেন নাকি? ডাক্তার ডাকব?
না, না, উপবিষ্ট অবস্থাতেই জড়িতকণ্ঠে ত্রিবেদী বললেন, ডাক্তার ডাকার দরকার নেই।
–তাহলে হঠাৎ মেঝের উপর চোখ উলটে বসে পড়লেন কেন?
–আপনার কথা শুনতে শুনতে মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল।
-ওটা সাময়িক দুর্বলতা। আপনি সোফায় উঠে বসুন… হ্যাঁ, এই তো সুস্থ হয়ে উঠেছেন। অতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা কইছিলেন বলেই আপনার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। এবার আরাম করে সোফায় বসে আমার কথা শুনুন। যেকথা বুঝিয়ে বলছি তা বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে–
বাধা দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন ত্রিবেদী, ডাঃ সাটিরা! প্লিজ! ওভাবে কথা বললে আমি এবার নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যাব।
–ও! আচ্ছা! তবে শুনুন, মিঃ ত্রিবেদী- সেদিন কপাটি প্রতিযোগিতায় আপনার খেলা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি, চমকিত হয়েছি। খ্যাংরা কাঠির মতো আপনার চেহারা, কিন্তু সাত-সাতটা জোয়ান ছেলে আপনাকে ধরে রাখতে পারে না। শুধু কি গায়ের জোর? যেমন ছোটার ক্ষমতা, তেমনি অফুরন্ত দম! শুনুন মশাই, এমন অদ্ভুত ক্ষমতাকে কপাটির মাঠে অপচয় করা অন্যায়, তাই—
-তাই কী?
–তাই আমি আপনাকে একটি চমৎকার সুযোগ দিতে এসেছি।
–সুযোগ? কিসের সুযোগ?
ডাঃ সাটিরার মুখে ফুটল দুর্বোধ্য রহস্যময় হাসি, তাঁর দুই চোখ জ্বলে উঠল, সামনে ঝুঁকে পড়ে গম্ভীর অথচ মৃদুস্বরে তিনি বললেন, কীসের সুযোগ? লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জনের দুর্লভ সুযোগ!
.
০৩. চক্রান্ত
কিছুক্ষণ কথা কইতে পারলেন না ত্রিবেদী। ডাঃ সাটিরার অভাবিত এবং কল্পনাতীত অদ্ভুত আচরণ তাঁকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ত্রিবেদী বললেন, টাকার লোভ আমার নেই। আমি বিজ্ঞান ভবনে অধ্যাপনা করে যে অর্থ উপার্জন করি, তাতে আমার ভালো ভাবেই চলে যায়। তবে অনেক বেশি টাকা পেলে গবেষণার সুযোগ হয় বটে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে হলে আমাকে তো এখন যা করছি, সেসব ছেড়ে দিয়ে টাকার পিছনেই ছুটতে হবে। আপনি যে আমাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা অথবা বিজ্ঞান-বিষয়ক অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত করে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগারের সুযোগ করে দিতে পারবেন এমন তো মনে হয় না। তবে আপনার প্রস্তাব না শুনে আমি কোনো মতামত
হঠাৎ দরজার কাছ থেকে ভেসে এল কণ্ঠস্বর, ভিতরে আসতে পারি?
কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে চোখ তুলতেই যাকে দেখতে পেলেন ত্রিবেদী, সেই ছেলেটি তাঁর পরিচিত, এই পাড়ারই বাসিন্দা। কপাটি প্রতিযোগিতায় ত্রিবেদীর অদ্ভুত কার্যকলাপে মুগ্ধ হয়ে গোলাপ কলোনির অধিকাংশ কিশোর ও যুবক তাঁর অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল- আগন্তুক যুবক অধ্যাপকের অনুরাগী ভক্তদের মধ্যে অন্যতম।
আগন্তুককে উদ্দেশ করে ত্রিবেদী বললেন, আরে, ঘোঁতন যে! কী মনে করে?… ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, ভিতরে এস।
-না স্যার, ভিতরে যাব না। অনেক কাজ আছে। আপনাকে সাবধান করতে এলাম।
সাবধান করতে এসেছ? কেন? কী জন্য? হঠাৎ সাবধান হওয়ার প্রশ্নই বা উঠছে কেন?
