আচম্বিতে সনাতনের তীব্র কণ্ঠস্বর অধ্যাপকের চিন্তার জাল ছিঁড়ে দিল, বাবু, আপনাকে দুজন লোক ডাকতিসে- ঈসস!
গভীর চিন্তায় মগ্ন অধ্যাপক এমন চমকে উঠলেন যে, তাঁর হাত থেকে টেবিলের উপর পাত্রটা ছিটকে পড়ে উলটে গেল। ভীষণ বিরক্ত হয়ে ত্রিবেদী ধমকে উঠলেন, এমন হঠাৎ করে কানের কাছে ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলি কেন? তোর গলা শুনে হাতের পাত্রটা টেবিলের উপর ফেলে দিলাম। ভাগ্যিস এটার মধ্যে যা ছিল তার সবটাই বোতলে ঢেলে ফেলেছি– নইলে সমস্ত জিনিসটা গড়িয়ে পড়ে পনের দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম পণ্ড করে দিত।
খুব দুঃখ-দুঃখ মুখ করে সনাতন ভুরু কুঁচকে বলে উঠল, ঈসস!
অধ্যাপক ত্রিবেদী খুব রগচটা মানুষ নন, সনাতনের মুখের ভাব দেখে আর তার কণ্ঠনিঃসৃত অব্যয় শব্দটি শ্রবণ করে তার মনে হল সনাতন বোধহয় যৎপরোনাস্তি দুঃখিত ও অনুতপ্ত, অতএব তার উত্তপ্ত মেজাজ তখনই ঠান্ডা হয়ে গেল এবং তিনি অনুভব করলেন অনুতপ্ত সনাতনকে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। অতএব গলার স্বর খুব নামিয়ে যথাসম্ভব কোমল-স্বরে ত্রিবেদী বললেন, যাক গে, তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। তবে জিনিসটা যদি বোতলের মধ্যে আগেই ভরে না ফেলতাম, তাহলে জিনিসটা বাইরে পড়ে গিয়ে আমার সব খাটুনি নষ্ট হত।
সনাতনের ভাবভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না, অত্যন্ত দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে সে আবার বলল, ঈস!
ত্রিবেদীর ভ্রূ কুঁচকে গেল, তখন থেকে ঈস, ঈস করছিস কেন? বললাম তো জিনিসটা বেঁচে গেছে, বিশেষ ক্ষতি হয়নি।
-কিন্তু জিনিসটা তো বাঁচলোনি বাবু।
–কী পাগলের মতো বকছিস? পাত্রটা ছিটকে পড়ে উলটে গেছে বটে, কিন্তু ওটার মধ্যে আর কোনো পদার্থ নেই। সব জিনিসটাই আগে-ভাগে আমি বোতলে ঢেলে রেখেছি।
আজ্ঞে, সেই কথাই তো বলছি। বোতলটা যে ফাটা!
য়্যাঁ! বলে কী! টেবিলের উপর বোতলটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন ত্রিবেদী- কী। সর্বনাশ! তার আবিষ্কৃত রক্তবর্ণ নির্যাসের একটি তরল স্রোত বোতলের গা বেয়ে টেবিলের কিছু অংশ লালে লাল করে দিয়েছে!
সনাতন এগিয়ে এসে বোতলটা তুলে ধরতেই ফাটা জায়গাটা নজরে এল। ফোঁটা ফোঁটা করে ফাটা জায়গা দিয়ে গড়িয়ে নামছে অধ্যাপক ত্রিবেদীর তরল আবিষ্কার। এই অভাবিত দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন অধ্যাপক, কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেকে সামলে এই মুহূর্তে যা করা উচিত সেটা ভেবে নিয়ে সনাতনকে কিছু বলতে গেলেন তিনি। কিন্তু তার নীরব কণ্ঠ সরব হওয়ার আগেই একতলা থেকে একটি উচ্চকণ্ঠের অভিযোগ ভেসে এল দোতলার গবেষণা কক্ষেওহে, কী-যেন নাম তোমার? মিঃ ত্রিবেদীকে ডেকে দাও। কতক্ষণ আর বসে থাকব?
আবার একবার চমকালেন ত্রিবেদী, এখন আবার কে ডাকতে এল?
–ওই যে দুজন লোক এসেছে, তারাই তো ডাকতিছে।
লোক এসেছে সেকথা বলবি তো হতভাগা, মুখ্যু কোথাকার!
আমি তো বলতেই এনু। তা আপনি বলতে দিলেন কই?
–যাক গে, যাক কি কাজ কর সনাতন। টমেটো সস-এর খালি বোতলের মধ্যে ফাটা বোতলের জিনিসটা ঢেলে রেখে ভর্তি বোতলটা ফ্রিজ-এর মধ্যে রেখে দে। আমি একবার বাইরের ঘরে গিয়ে দেখি এই অসময়ে কে জ্বালাতে এল।
.
০২. সুযোগ? না, দুর্যোগ?
বাইরের ঘরে প্রবেশ করে ত্রিবেদী দেখলেন সেখানে সোফায় বসে তার জন্যে অপেক্ষা করছে দুই মূর্তি। তাদের মধ্যে একজনের পরনে নিখুঁত সাহেবি পোশাক, অপর ব্যক্তির দেহে রয়েছে একটি ডোরাকাটা রঙিন গেঞ্জি ও জি-এর রংচটা প্যান্ট। প্রথম ব্যক্তির নেকটাই ও স্যুট-এর সঙ্গে রং মিলিয়ে চরণের শোভা বর্ধন করছে একজোড়া চকচকে বুট জুতো। দ্বিতীয় ব্যক্তির পায়ে রয়েছে একজোড়া অযত্নে বিবর্ণ কোলাপুরি চটি। একনজর তাকালেই বোঝা যায় দুই ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষা ও রুচিতে প্রচুর প্রভেদ। সাহেবি পোশাকে সজ্জিত ব্যক্তির চোখে-মুখে শিক্ষিত মানুষের বুদ্ধিমত্তার ছাপ সুস্পষ্ট। তার সঙ্গীর কেশহীন মস্তক, চোখ মুখ আর শরীরের উপর দৃষ্টিপাত করার সঙ্গে সঙ্গেই অনুমান হয় লোকটির মস্তিষ্কে শিক্ষা ও বুদ্ধির যথেষ্ট অভাব থাকলেও তার অত্যন্ত বেঁটে অথচ নিরেট পেশীপুষ্ট শরীরে রয়েছে আসুরিক শক্তি।
নির্বোধ মস্তিষ্ক আর শক্তিমান দেহ, ত্রিবেদী মনে মনে বললেন, দেহ আর মস্তিষ্কের এমন বিপরীতধর্মী সংমিশ্রণ খুবই বিপজ্জনক। এই লোকটি সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে।
ইতিমধ্যে ত্রিবেদীকে দেখে করজোড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সাহেবি পোশাক; তার সঙ্গী ডোরাকাটা গেঞ্জি প্রথমে আসন ত্যাগ করা দরকার মনে করেনি, কিন্তু প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে। করজোড়ে দণ্ডায়মান দেখে তড়াক করে একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে সে হাতজোড় করল।
প্রথাগতভাবে অভিবাদন জানিয়ে ত্রিবেদী বললেন, নমস্কার, নমস্কার। আপনারা কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?
সাহেবি পোশাক বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি মিঃ ত্রিবেদী।
-কিন্তু আমি তো আপনাদের ঠিক চিনতে পারছি না।
–আপনি আমাদের চেনেন না বটে, কিন্তু আমরা আপনাকে চিনি। তাই না গজু? ডোরাকাটা গেঞ্জি আর রংচটা জিনস্ পরিহিত গজু নামক খর্বাকৃতি দৈত্য একগাল হাসল,হে। হে! হে! আমাদের আপনি না চিনলেও আমরা আপনাকে চিনি। আর চেনাশুনাটা যাতে ভালো করে হয়, সেইজন্যই তো এলাম তাই না ডাঃ সাটিরা?
