গোলাপ কলোনির ছেলেরা ভীতু নয়, যদিও গদাইকে তারা যথেষ্ট সমীহ করে, তবু মনে মনে আসন্ন লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হল তারা, মুছে গেল তাদের মুখের হাসি, চোয়াল হয়ে উঠল শক্ত ও আড়ষ্ট, সম্ভাব্য হামলা রুখতে নিঃশব্দে প্রস্তুত হল গোলাপ কলোনির খেলুড়ের দল…
সেই ত্রস্ত স্তব্ধতাকে ভঙ্গ করে বেজে উঠল মুকুন্দের সুগম্ভীর কণ্ঠ। কেন? চুপ করব কেন? কী বলতে চাস তুই? মনে রাখিস গদাই, বাঘা মুকুন্দ এখনও মরেনি।
মরিসনি বটে, তবে তোর মরাই উচিত, চেঁচিয়ে উঠল গদাই, বলি কপাটি খেলা কি বিদেশি খেলা? স্বদেশি খেলায় জিতে বিদেশী ভাষায় জিগির দিতে লজ্জা করে না তোদের? আমাদের বাংলা ভাষা কি এতই গরিব?
হকচকিয়ে গেল মুকুন্দ, না, মানে, ইয়ে ব্যাপারটা হচ্ছে–
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জে উঠল খেলোয়াড় গদাই, বলো ভাই– জয়, অধ্যাপক ত্রিবেদী কী জয়!
মুহূর্ত পরেই ফেটে পড়ল বহু কণ্ঠের গর্জিত উল্লাস, জয়, অধ্যাপক ত্রিবেদীকী জয়!
গদাই-এর কাঁধে হাত রাখল বাগনান ক্লাবের ক্যাপ্টেন বিজয় চৌধুরি, তোর কি মাথা খারাপ হল গদাই? ওদের দলের খেলুড়ের নামে জিগির দিতে তোর লজ্জা করল না?
লজ্জা করবে কেন? গদাই সপ্রতিভ, আমি খেলোয়াড়, তাই ভালো খেলোয়াড়কে সম্মান জানাতে কখনো লজ্জা পাই না। তোমার মধ্যেই বরং খেলোয়াড়ি মনোভাব নেই, লজ্জা তোমারই পাওয়া উচিত, বিজয়।
মাঠের উপর থেকে জনতার অধিকাংশ মানুষই যখন অন্তর্ধান করেছে বা করছে, সেই সময় দেখা গেল দর্শকরা যেখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল, সেইখানে তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি কী-যেন ভাবছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আর একটি লোক পূর্বোক্ত ব্যক্তির মুখের দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করছে।
প্রথম ব্যক্তি দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে ও উচ্চতায় খুবই সাধারণ, গায়ের রং নাফর্সা, নাকালো, তবে খুব ভালোভাবে লক্ষ করলে তার চোখে-মুখে একটা ধূর্ত নিষ্ঠুরতার আভাস ধরা পড়ে। কিন্তু সেটা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নয়। তবে হ্যাঁ, এই শহরতলিতে কোট-প্যান্ট, নেকটাই ও বুটজুতোয় সজ্জিত নিখুঁত সাহেবি পোশাক-পরা মানুষ বড় একটা চোখে পড়ে না– সেদিক থেকে বিচার করলে প্রথমোক্ত ব্যক্তি নিশ্চয়ই কিছুটা বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারে। পরবর্তীকালে আমাদের কাহিনিতে সে যখন আবার আত্মপ্রকাশ করবে, তখন আমরা দেখতে পাব তার চলনেবলনে এমন এক ভয়াবহ বন্য ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়েছে, যাকে তুচ্ছ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
বহু মানুষের ভিড়ের মধ্যে প্রথম ব্যক্তির চেহারা কারও নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু তার সঙ্গীর কেশহীন মসৃণ মস্তক, অত্যন্ত খর্ব ও অত্যন্ত পেশীবহুল দুই বাহু ও বিস্তৃত বক্ষপট ভিড়ের মধ্যেও মানুষের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। তার গায়ের রং বেশ ফর্সা, আর যে গেঞ্জিটা তার অতি-খর্ব, অতিবলিষ্ঠ গৌরবর্ণ দেহের শোভা বৃদ্ধি করছে, সেই ডোরাকাটা গেঞ্জিটাও রং-এর বাহারে দস্তুরমতো দ্রষ্টব্য বস্তু।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর খর্বকায় দৈত্য সাহেবি পোশাকে সজ্জিত সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, ডাক্তার! আমরা তো দিনের আলো থাকতে থাকতে ভালো করে এই এলাকাটাকে একনজরে মেপে নিতে এসেছিলাম, এখন যে বেলা পড়ে গেল, একটু পরেই সব আঁধারে ঢেকে যাবে। কেন যে পথ চলতে চলতে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে ঢুকে এতক্ষণ কপাটি-খেলা দেখে সময় নষ্ট করলেন, তা বুঝলাম না।
ডাক্তার নামে অভিহিত ব্যক্তির মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল, বৎস গজু, কেন যে আমি সময় নষ্ট করলাম, সেটা বুঝলে আমার বদলে তুমিই লিডার হতে। জেনে রাখো বোকারাম আমি অকারণে সময় নষ্ট করি না…।
কে এই ডাক্তার? চেহারা দেখে আর যাই হোক, মানুষটিকে চিকিৎসক বলে তো মনে হয় না। আর ডাক্তারের সঙ্গী গজু নামক জীবন্ত বিভীষিকাকে কোনো চিকিৎসকের অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা সহকারী বলে কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। কপাটি-খেলার দর্শকের ভূমিকায় ডাক্তার নামে অভিহিত ব্যক্তির চালচলন দস্তুরমতো রহস্যজনক বলে মনে হলেও রহস্য সমাধানের জন্যে আমাদের পরবর্তী কাহিনির জন্যে অপেক্ষা করতে হবে, যার নাম অধ্যাপক ত্রিবেদী ও ডাঃ সাটিরা!
৪. অধ্যাপক ত্রিবেদী ও ডা. সাটিরা
অধ্যাপক ত্রিবেদী ও ডা. সাটিরা
০১. অনাহুত অতিথি
উদ্ভিদবিজ্ঞানী ত্রিলোকনাথ ত্রিবেদী কলকাতার কাছে গোলাপ কলোনি নামে শহরতলিতে ভুতুড়ে। বাড়ি বা হানাবাড়ি বলে অপবাদগ্রস্ত একটি পরিত্যক্ত অট্টালিকার উদ্যানের মধ্যে দৈবক্রমে আশ্চর্য-পাতা আবিষ্কার করেন। ওই গাছের পাতা চিবিয়ে খেলে অবিশ্বাস্য দৈহিক শক্তি লাভ করা যায়। কিন্তু সেই শক্তি সাময়িক, চিরস্থায়ী নয়। আশ্চর্য-পাতা আবিষ্কার করার পর থেকে ত্রিবেদী মশাই ক্রমাগত বিপদে পড়েছেন, তবে শেষ পর্যন্ত ওই সব বিপদ কাটিয়ে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়েছেন। এই গ্রন্থে লিখিত পূর্ববর্তী কাহিনিগুলি যে-সব পাঠকের পড়া আছে, তাদের কাছে অধ্যাপক ত্রিবেদীর দুর্ভোগের ইতিহাস অজানা নয়। এখন দেখা যাক অধ্যাপক মশাই-এর জন্যে আবার কোন্ নতুন বিপদ অপেক্ষা করছে…।
গবেষণাগারের মধ্যে একটি খালি বোতলের ভিতর অন্য একটি পাত্র থেকে রক্তবর্ণ তরল নির্যাস ঢালতে ঢালতে ত্রিবেদী আপনমনেই বলে উঠলেন, বিভিন্ন গাছের শিকড় ও লতা মিশিয়ে যে তরল পদার্থটি প্রস্তুত করেছি, গবেষণার ক্ষেত্রে এটিকে অত্যাশ্চর্য বিশেষণ দিলে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হয় না। তবে মনুষ্যসমাজের পক্ষে আমার এই আবিষ্কার শুভ হবে কি অশুভ হবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। যদি বুঝতে পারি আমার এই আবিষ্কার মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণকেই ডেকে আনবে, তাহলে অবশ্য এই বস্তুটি যাতে জনসাধারণের হস্তগত না হয় সেই ব্যবস্থাই করব।
