হঠাৎ পিছন থেকে আক্রান্ত হয়ে চমকে গেলেন ত্রিবেদী। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন বিপক্ষের খেলোয়াড়দের সমবেত শক্তিও তাকে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারবে না, তাই ইচ্ছা করেই তিনি বিরোধীদলের খেলোয়াড়দের আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছিলেন। কপাটির নিয়ম অনুসারে বিপক্ষের যে কয়টি খেলুড়েকে ছুঁয়ে খেলোয়াড় আবার সীমানার মধ্যে দম নিতে নিতে ফিরে আসতে পারবে, সেই কয়জন ছোঁয়া লাগা খেলুড়েকেই মোড় হয়ে বসে পড়তে হবে।
বাগনান ক্লাবের প্রত্যেক খেলোয়াড়ই তাকে পাকড়াও করার আশায় জড়িয়ে ধরেছিল, এখন তিনি যদি নিরাপদে স্বস্থানে প্রস্থান করতে পারেন, তাহলে বিপক্ষের সব খেলোয়াডকেই মোড় হয়ে বসে পড়তে হবে এবং গোলাপ কলোনি লাভ করবে বিজয়লক্ষ্মীর জয়মাল্য! মনে মনে পরিকল্পনাটি সাজিয়ে নিয়ে ধরা পড়ার অভিনয় করেছিলেন অধ্যাপক ত্রিবেদী, তার পরিকল্পনায় ভুলও হয়নি কিন্তু বিশাল শরীর আর প্রচণ্ড দৈহিক শক্তি দিয়ে খেলোয়াড় গদাই অধ্যাপক ত্রিবেদীর সমস্ত উদ্যম আর পরিকল্পনা ব্যর্থ করার উপক্রম করল..
দুই হাতে প্রাণপণে ত্রিবেদীকে চেপে ধরেছিল গদাই, হঠাৎ সে অনুভব করল লোহার সাঁড়াশির মতো পাঁচ-পাঁচ দশটি আঙুল তার হাত চেপে ধরেছে, আর সেই আঙুলের চাপে তার হাত দুটি ক্রমশ অবশ হয়ে পড়ছে।
দাঁতে দাঁত চেপে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও সে নাছোড়বান্দার মতো আঁকড়ে ধরে রইল ত্রিবেদীকে, কিছুতেই হাতের বাঁধন আগা করতে রাজি হল না।
ত্রিবেদী বুঝতে পারছিলেন আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বাহুবন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করতে পারবেন, গদাই-এর হাত তার আঙুলের চাপে অসাড় হয়ে আসছে। কিন্তু আড়-চোখে তাকিয়ে তিনি দেখলেন ধরাশায়ী খেলোয়াড়দের মধ্যে কয়েকজন উঠে বসেছে। তারা সবাই মিলে যদি আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে, তাহলে আশ্চর্য-পাতার আশ্চর্য ক্ষমতাও তাকে রক্ষা করতে পারবে না। তাঁর দেহের শক্তি এখনও অক্ষুণ্ণ আছে বটে, কিন্তু দম ফুরিয়ে আসছে। অতগুলো খেলুড়ের হাত ছাড়িয়ে নিতে যে সময় লাগবে, সেই সময়টুকু পর্যন্ত দম ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁর থাকবে না– সুতরাং যা করার তা এখনই করতে হবে…
জন দুই আহত খেলুড়ে তখন নিজেদের সামলে নিয়ে ত্রিবেদীর দিকে ছুটে আসার উপক্রম করছে; ত্রিবেদী বুঝতে পারছেন তার দেহের উপর গদাই-এর হাতের বাঁধন আগ্ধ হয়ে এলেও আরও কয়েকটি মুহূর্ত তাকে বন্দি থাকতেই হবে। ইতিমধ্যে অন্য দুই খেলোয়াড়ের উদ্যম ও ধরাশায়ী অন্যান্য সকলের শায়িত অবস্থা থেকে দণ্ডায়মান হওয়ার প্রচেষ্টা সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ করেছেন ত্রিবেদী এবং সেইসঙ্গে অনুভব করছেন ফুরিয়ে আসছে তার দম, অতএব Now or Never, যা করণীয় করতে হবে এই মুহূর্তে–
পরক্ষণেই শত্ৰুমিত্র উভয় পক্ষের খেলোয়াড়দের চোখগুলো উঠল কপালে, আর বাগনান ক্লাবের সমর্থকদের কোলাহল হল স্তব্ধ- সমবেত জনতাকে স্তম্ভিত করে একটি প্রচণ্ড লক্ষে ত্রিবেদী পৌঁছে গেলেন গোলাপ কলোনির সীমানার মধ্যে; তাকে আঁকড়ে ধরে তখনও ঝুলছে নাছোড়বান্দা গদাই! ত্রিবেদী যখন বুঝলেন গদাই-এর হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার আগেই অন্য খেলোয়াড়রা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাদের প্রতিরোধ করে নিজেদের ঘরে ফিরে আসার আগেই ফুরিয়ে যাবে তার দম। তখনই আর গদাই-এর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা না করে একটি সুবৃহৎ লক্ষত্যাগ করেছেন তিনি এবং গদাই-এর গুরুভার বিপুল বপুকে অবলীলাক্রমে বহন করে ফিরে এসেছেন স্বপক্ষের সীমানার মধ্যে।
কয়েকটি নীরব মুহূর্ত– তারপরই বিস্ময়মিশ্রিত তীব্র কোলাহলে ত্রিবেদীকে অভিনন্দন জানাল সমবেত জনতা! সেই কোলাহলে গোলাপ কলোনির সমর্থকদের সঙ্গে সমানভাবে গলা মিলিয়েছিল বাগনান ক্লাবের সমর্থকবৃন্দ! ত্রিবেদীর কল্পনাতীত কার্যকলাপ এবং অমানুষিক শক্তির পরিচয়ে মুগ্ধ জনতার এই অভিনন্দন স্বতঃস্ফূর্ত, সেখানে মুছে গেছে রেষারেষি আর ভেদাভেদ জ্ঞান! উভয় পক্ষের সমর্থকদের সঙ্গে গোলাপ কলোনির খেলুড়ের দলও গলা মিলিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল, কিন্তু বাগনান ক্লাবের খেলোয়াড়রা ছিল নির্বাক, স্তব্ধ।
হঠাৎ বাগনান ক্লাবের দল থেকে এক দৈত্যাকৃতি পুরুষ এগিয়ে এল সেই দিকে, যেখানে অধ্যাপক ত্রিবেদীকে কাঁধে তুলে আনন্দে মত্ত হয়ে উঠেছে গোলাপ কলোনির খেলোয়াড়ের দল। একজন হঠাৎ চিৎকার করে উন্মত্ত আনন্দধ্বনিকে ভাষায় রূপান্তরিত করল, থ্রি চিয়ার্স ফর–
কিন্তু অন্য সকলে ধুয়া ধরে ত্রিবেদীর নাম উচ্চারণ করার আগেই সকলের কণ্ঠস্বর ডুবিয়ে জাগল এক ষণ্ড কণ্ঠের ভৈরব গর্জন চুপ! চুপ! চুপ।
মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল গোলাপ কলোনির খেলোয়াড়ের দল। তাদের আনন্দ-উৎসবে বাধা দিতে এগিয়ে এসেছে খেলোয়াড় গদাই! কিন্তু কেন? সে কি ঝগড়া করতে চায়? খুবই অবাক ব্যাপার প্রকাণ্ড দেহ আর প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হলেও গদাই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। খেলার মাঠ ও ব্যায়ামাগার ছাড়া অন্য কোথাও সে তার আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করে শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে আতঙ্কের সঞ্চার করেনি। এমন ভদ্র আর শান্ত মানুষটা হঠাৎ খেপে গেল কেন? নাকি, এই অভাবিত বিপর্যয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে হামলা করতে চাইছে বাগনান ক্লাব? গদাই কি আক্রমণকারীদের অগ্রদূত হতে চাইছে?..
