হ্যাঁ অস্বস্তি-আশঙ্কা মেশানো স্বরে বলল সারিকা।
এর একটা বিশেষ অর্থ আছে, ম্যাডাম, হাসল লোকটি : যে-লোকের ঊরুতে এই বেড়ালের ছবি উল্কি দিয়ে আঁকা থাকে, তার চলাফেরার সময় কোনওরকম শব্দ হয় না। আর যার হাতে এই উল্কি থাকে, তার নখের আঁচড় হয় গভীর। কখনও সে-আঁচড়ের দাগ মিলিয়ে যায় না।
সারিকার মনে পড়ল, লোকটি যখন ওর টেবিলে এসে হাজির হয়, তখন কোনওরকম পায়ের শব্দ ও পায়নি। ও চুপ করে রইল। বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডের ঢিপঢিপ শব্দ ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠছে।
লোকটি হঠাৎই উঠে দাঁড়াল।
চলি, ম্যাডাম। একজনের এখানে আসবার কথা ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে বোধহয় আর দেখা হল না। হয়তো ভবিষ্যতে আপনার সঙ্গেই আর-একবার দেখা হয়ে যাবে। মৃদু হাসল সে।
এবার বিরক্ত হল সারিকা। বলল, সেরকম কোনও চান্স নেই।
ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, ম্যাডাম। কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না লোকটি। ক্ষিপ্র নিঃশব্দ পদক্ষেপে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। অবাক চোখে তার দিকে চেয়ে রইল সারিকা।
হঠাৎই ও দেখতে পেল নিশীথকে।
বাদশার দরজায় একটা ট্যাক্সি এসে থেমেছে। সেটা থেকে নেমে দাঁড়াল নিশীথ। ইশারায় ট্যাক্সি-ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বলে রেস্তরাঁর ভেতরে ঢুকল ও। ঢোকার মুখে অচেনা আগন্তুকের সঙ্গে সামান্য ধাক্কা লাগল নিশীথের।
সরি বলে পাশ কাটিয়ে গেল আগন্তুক।
বেয়ারা ইতিমধ্যে টেবিলে চিকেন রোল সার্ভ করে গেছে। নিশীথ হন্তদন্তভাবে এসে দাঁড়াল টেবিলের কাছে।
সারিকা নির্বিকার মুখে অভিমান ভরা চোখে চুপচাপ বসে ছিল। নিশীথ বলল, রাগ কোরো না, সু, প্লিজ। ট্যাক্সি করে এক বন্ধুকে এগিয়ে দিয়ে এক্ষুনি আসছি। পাঁচ মিনিট। তুমি দেখো-।
ঝড়ের মতোই আবার বেরিয়ে গেল নিশীথ।
প্রথমবার ও না হয় ট্যাক্সি ডাকতে গিয়েছিল, কিন্তু এখন কোথায় যাচ্ছে? ভাবল সারিকা। তারপর বেয়ারাকে ডেকে নিজেই বিল মিটিয়ে দিল।
আশ্চর্য, ওকে এভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে নিশীথ সান্যালের লজ্জা করল না! সারিকার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু তবুও অপেক্ষায় রইল ও।
মিনিটদশেক পর হঠাৎই সারিকার নজরে পড়ল টেবিলে হারের বাক্সটা নেই।
কোথায় গেল? নীচু হয়ে টেবিলের তলায় দেখল সারিকা।
নেই।
আশেপাশে কোথাও পড়ে যায়নি তো! খোঁজাখুঁজি করে বুঝল, না পড়ে যায়নি। তবে কি কেউ নিয়ে গেছে বাক্সটা? ওর মধ্যে যে সারিকার সাদা পুঁতির মালাটা রয়েছে। এ পর্যন্ত টেবিলের কাছে এসেছে তিনজন।
বাদশার বেয়ারা। সেই আগন্তুক। এবং নিশীথ।
প্রথমজনকে সহজেই বাদ দেওয়া যায়। দ্বিতীয়জন টেবিল ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও বাক্সটা যে টেবিলে ছিল সেটা সারিকার স্পষ্ট মনে আছে। তা হলে কি…?
দ্বিধাগ্রস্ত বহু মুহূর্তের পর সিদ্ধান্তে এল সারিকা। বাক্সটা নিশীথই হাতে করে নিয়ে গেছে। কিন্তু কেন?
আরও দশ মিনিট কেটে গেল, নিশীথ এল না।
এতক্ষণ ধরে করছে কী ও?
চিন্তিতভাবে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল সারিকা। খাওয়ার ইচ্ছে আর নেই। পলিথিনের ব্যাগটা গুছিয়ে হাতে নিল। এগিয়ে গেল রেস্তরাঁর ক্যাশ কাউন্টারের দিকে। চকিত দৃষ্টিতে বাদশার বাইরের ফুটপাতে বারকয়েক নজর রাখল ও। না, নিশীথের চিহ্নমাত্রও সেখানে নেই। যে-ট্যাক্সি করে নিশীথ ফিরে এসেছিল সে-ট্যাক্সিটাও নেই।
কাউন্টারের ভদ্রলোককে সংক্ষেপে সব ঘটনা জানিয়ে ও বলল, তিনি যদি ফিরে আসেন, তা হলে বলে দেবেন আমি বাড়ি চলে গেছি। এই যে ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা।
একটা সাদা প্যাডের কাগজে নিশীথের নাম-ঠিকানা স্পষ্ট করে লিখে দিল ও। তারপর সৌজন্যের মিষ্টি হাসি হেসে বেরিয়ে এল বাদশা থেকে।
নিশীথ বলে গেল, এক্ষুনি আসছি। তা হলে এতক্ষণেও ফিরে এল না কেন? হারের বাক্সটাই বা ও নিয়ে গেল কেন? কোনও বিপদে পড়েনি তো নিশীথ!
সারিকার বুক কেঁপে উঠল। সব কিছু কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে ধরল ও। কিন্তু কোনও লাভ হল না।
অবশেষে চিন্তিত মুখে ও রওনা দিল বাড়ির দিকে। নিশীথের ওপর রাগ আর অভিমান কেটে গিয়ে এখন দুশ্চিন্তা ক্রমশ ওর মনে জায়গা করে নিচ্ছে।
ভিড়ে ঠাসা ফুটপাত ধরে হেঁটে চলল সারিকা। নিজের অন্যমনস্কতায় আর চারদিকের কলগুঞ্জনে একটা বিশেষ শব্দ ওর কান এড়িয়ে গেল।
সারিকা যদি কান পেতে শুনত, তা হলে শুনতে পেত মর্স কোডে ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষরের নিটোল ছন্দঃ ডটড্যাশ.. ডট-ড্যাশ…।
যেন কেউ খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাটছে, পা টেনে এগিয়ে চলেছে জনবহুল ফুটপাত ধরে– ঠিক সারিকার পিছু পিছু।
.
০৩.
সাতচল্লিশের এ বাস থেকে এলগিন রোডে ভবানীপুর কলেজের কাছে নামল সারিকা। পিসেমশাইয়ের কাছে শুনেছে কলেজটা অ্যাংলো গুজরাট সোসাইটির পুরোভাগে আছেন বিড়লা এবং মাত্র বছরদশেকের পুরোনো। এঁদেরই অ্যাংলো গুজরাট স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে সম্রাট। ওকে স্কুল পালটে সেন্ট জেভিয়ার্সে দেওয়ার কথা ভাবছেন পিসেমশাই, কিন্তু স্কুলটা দূরে বলে পিসিমার আপত্তি।
এখন এলগিন রোড নির্জন। কারণ সময় প্রায় সাড়ে সাতটা, তার ওপর শীতকাল। এই নির্জনতা সারিকার চেনা। দিল্লি যাওয়ার আগে ওরা কলকাতার সি.আই.টি. রোডে থাকত। সেখানেও নির্জনতা। আর দিল্লি তো নির্জনতার জ্বলন্ত উদাহরণ! এখন, অবশেষে, এই এলগিন রোড অ্যালেনবি রোড অঞ্চল।
