হ্যাঁ, একটা কালো রঙের শেভ্রলে গাড়ি।
ভিড় সরিয়ে বাইরে এল নিশীথ। পা দুটো কেমন অসম্ভব ভারি ঠেকছে। ওর চোখে পড়ল, সামনেই একটা পানের দোকানের সামনে গোলাপী গাউন পরা একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটা সাদা ঠোঙা, মাথার চুল ধবধবে সাদা, সঙ্গে একটা পিকিনিজ কুকুর। তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে কী যেন আলোচনা করছেন। ভদ্রলোকের চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা, হাতে ব্রিফকেস।
সারিকার পাশে এসে দাঁড়াল নিশীথ। বলল, চলো, ওখানে একটা লোক গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে।
গাড়িটাকে পুলিশ ধরতে পারেনি? জানতে চাইল সারিকা।
না, সু, পালিয়ে গেছে। অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল নিশীথ।
নিশীথকে আজ যেন ভীষণ অচেনা লাগছে। ভাবল সারিকা। অবশ্য নিশীথকে ও কখনও ওর মনের কথা বুঝতে দেয়নি। আসা-যাওয়ার পথে ওর সঙ্গে দেখা হলে নিশীথ যেসব কথা বলে তা নিতান্তই মামুলি। তার মধ্যে কোনওরকম দুর্বলতা কখনও সারিকা টের পায়নি। কিন্তু নিশীথ কি সারিকার মনের কথা আঁচ করতে পারে না? এতই সরল ও! তা হলে ওকে আজ হঠাৎ ছোট্ট নতুন নামে ডাকছে কেন?
লিন্ডসে স্ট্রিট ধরে ওরা চৌরঙ্গী রোডের দিকে এগোতে শুরু করল। ওদের পাশ কাটিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর একটা নীল রঙের পুলিশ-ভ্যান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে ছুটে গেল।
হটাৎই সারিকা প্রশ্ন করল, বাড়ি ফিরবেন তো?
এ-প্রশ্নের উত্তর থেকেই নিশীথের মনের আসল ইচ্ছেটা জানা যাবে। বোঝা যাবে সারিকার সঙ্গ ওর ভালো লাগছে কি না। সারিকার মুখে কিশোরীর আগ্রহ কি ও খুঁজে পাচ্ছে না? লাজুক ছেলেদের নিয়ে এই এক মুশকিল! মনে-মনে হাসল সারিকা। নাকি ও নিজেই বড় বাড়াবাড়ি করছে?
বাড়ি? ভীষণভাবে চমকে উঠল নিশীথ। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, বাড়ি কেন? চলো, কোথাও একটু বসা যাক। একটু চা-টা খাওয়া যাক। একটু থেমে তারপর ও আপত্তি নেই তো?
চলুন– বেশি আগ্রহ দেখানোটা ঠিক হবে না। নিশীথের কাছ থেকে এ ধরনের আমন্ত্রণ এই প্রথম। মনের খুশিকে অতি কষ্টে চেপে রাখল সারিকা।
গ্লোব, দেজ মেডিকেল পার হয়ে বাদশায় পৌঁছোল ওরা।
ভেতরে ম্লান আলোর খেলা। ফ্রাই ও রোলের সুগন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারছে।
দু-পাশের কাচের দেওয়ালের মাঝে সরু প্যাসেজে পা রাখল নিশীথ। সারিকা ওকে অনুসরণ করল।
একটা চারজনের টেবিল সৌভাগ্যবশত খালি পাওয়া গেল। ওরা বসল।
সারিকা নিশীথকে লক্ষ করতে লাগল।
নিশীথের গায়ে ফুলহাতা হলুদ সোয়েটার। তার ওপরে কালো কাজ করা।
এই সোয়েটারটা আগে কখনও ওকে পরতে দেখিনি। ভাবল সারিকা, ওকে যেন বড় বেশি অস্থির মনে হচ্ছে।
হাতের পলিথিন ব্যাগটা নিশীথ টেবিলের এক পাশে নামিয়ে রাখল। দেখাদেখি সারিকাও লকেটের বাক্সটা তার পাশে রাখল। এমন সময় বেয়ারা এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল। খাবারের অর্ডার দিল নিশীথ। অবশ্য দেওয়ার আগে সারিকার পছন্দ জেনে নিতে ভুলল না। চিকেন রোল আর কফি।
দুজনেই চুপচাপ। যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে। হঠাৎই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নিশীথ। বলল, এক মিনিট, সু, আমি এক্ষুনি আসছি।
সারিকার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ও বেরিয়ে গেল। অবাক হয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল সারিকা।
মিনিটপাঁচেক কেটে গেল, নিশীথের ফিরে আসার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না।
এটা-ওটা ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ মালার বাক্সটা খুলল সারিকা। ভেতর থেকে বের করল লাল পাথর বসানো হারটা।
এই অল্প আলোতেও পাথরটা হায়নার চোখের মতো ধকধক করে জ্বলছে। এরপর সব মেয়েই যেটা করত সেই কাজই করে বসল সারিকা। মালাটা গলায় পরল। আর ওর গলার সাদা পুঁতির হারটা খুলে ভরে রাখল বাক্সে। নিশীথ এলে জিগ্যেস করবে ওকে কেমন মানিয়েছে।
সারিকার পরনে সবুজ প্রিন্টের শাড়ি, তার ওপর কালচে ফারের কোট। দিল্লিতে যাওয়ার পর বড়মামা কিনে দিয়েছিলেন। কলকাতার শীতে হয়তো সামান্য বাহুল্য।
কোটটা পরতেই জ্বলন্ত লাল পাথরটা হারিয়ে গেল ওর ফারের কলারের আড়ালে। বুকের কাছে পাথরটার ঠান্ডা পরশ অনুভব করল ও। আর বুকের ভেতরে নিশীথের জন্য চিন্তা।
বসতে পারি?
কানের কাছে আচমকা সম্বোধনে চমকে উঠল সারিকা। চোখ ফেরাতেই দেখল ওর টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একজন বেঁটেখাটো বলিষ্ঠ পুরুষ। গায়ের রঙ টকটকে ফরসা। পরনে ফুলহাতা শার্ট, কালো সোয়েটার, গরম প্যান্ট। চোখ দুটো অস্বাভাবিকরকম ছোট। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা। মুখে এক অদ্ভুত সবজান্তা হাসি।
সারিকা-নিশীথের টেবিলটা চারজনের। রেস্তরাঁর অন্যান্য টেবিলও খালি নেই। সুতরাং ঘাড় নেড়ে আগন্তুককে বসতে বলল সারিকা।
সারিকার অনুমতি পেয়ে নিখুঁত ভঙ্গিতে গুছিয়ে বসল লোকটি। দু-হাত টেবিলে রাখল।
ম্যাডাম কি একাই আছেন? ভাঙা বাংলায় প্রশ্ন করল লোকটি। তার কণ্ঠস্বর কেমন অদ্ভুত ফিসফিসে।
না, সঙ্গে আমার এক বন্ধু আছেন। এখুনি এসে পড়বেন। নিজের বিব্রত ভাবটা কাটিয়ে মনে সাহস আনতে চেষ্টা করল সারিকা। এমন সময় ওর চোখ পড়ল আগন্তুকের ডান হাতের উলটোপিঠে। ফরসা হাতে অদ্ভুত স্পষ্টভাবে উল্কি দিয়ে আঁকা রয়েছে একটা আক্রমণোদ্যত বেড়ালের ছবি।
জীবন্ত ছবিটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিল সারিকার খেয়াল নেই। চমক ভাঙল লোকটির কথায়, জীবন্ত ছবি, তাই না?
