রাস্তা পার হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল সারিকা। নতুন তৈরি হওয়া একটা বাড়ি পার হয়ে বাঁদিকে অ্যালেনবি রোডে ঢুকল। দুটো বাড়ি পরেই দাঁড়িয়ে আছে পাতিল ম্যানসন।
সাদা রং করা বিশাল লোহার দরজা। সেখান থেকে সিমেন্ট বাঁধানো ফুটপাত ঢালু হয়ে এসে মিশেছে রাস্তায় গাড়ি ঢোকা-বেরোনোর জন্য। লোহার দরজার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে বিরাট ড্রাইভওয়ে। তার একপাশে সবুজ ঘাসে ছাওয়া বড় লন। লনের পরিসীমায় মরসুমি ফুলের বাহার। এবং ঠিক মাঝখানে নিঃসঙ্গ চোখের মতো সিমেন্ট বাঁধানো একটা ছোট্ট আইল্যান্ড। তার মাঝে এক বিশাল পলাশ গাছ, ডান দিকে, ড্রাইভওয়ের পাশে, দাঁড়িয়ে রয়েছে সাততলা পাতিল ম্যানসন। তার বিভিন্ন ফ্ল্যাটের আলো কাচের জানলা দিয়ে চোখে পড়ছে। সে-আলো এসে মিশেছে লনের লাইটপোস্ট দুটোর আলোর সঙ্গে। তারপর তারা অন্ধকার-অভিযানে বেরিয়ে মিলিত হয়েছে সদর দরজার ওপরে ঘষা প্লাস্টিকের মুখোশ পরা প্রহরী বাবের সঙ্গে।
লোহার দরজা কিছুটা ভোলা–যেমনটা রোজই থাকে। সুতরাং ভেতরে ঢুকল সারিকা। দারোয়ানগুলোর একটাকেও নজরে পড়ল না। বোধহয় কোনও সান্ধ্য মজলিসে ফুর্তি করতে গেছে।
সহজ পায়ে ড্রাইভওয়ে পার হয়ে পাতিল ম্যানসনে ঢুকল সারিকা। পালিশ করা ভারী কাঠের সদর দরজা অতিক্রম করেই দু-ধাপ সিঁড়ি। তারপর বাঁ-দিকে অটোমেটিক এলিভেটর। এলিভেটরে ঢুকে বোতাম টিপতেই স্বয়ংক্রিয় রবারের লাইনিং দেওয়া দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। তারপর পাঁচ নম্বর সুইচ টিপল সারিকা। একটা আচমকা মৃদু ঝাঁকুনি। ধাতব দরজায় বসানো একটুকরো চৌকো কাচের জানলা দিয়ে চোখে পড়ল সরীসৃপের মতো নীচে নেমে যাওয়া দেওয়াল। তার গায়ে বিভিন্ন তলায় ইংরাজিতে এক, দুই…লেখা।
নিশীথের কথা ভাবতে-ভাবতেই মাথার ওপরে তাকাল সারিকা। একটা উজ্জ্বল বা ঘোলাটে সিলিংয়ের গায়ে দপদপ করে জ্বলছে। কিন্তু কোথাও কোনও ভেন্টিলেটার নজরে পড়ছে না তো! শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস কোনদিক দিয়ে ঢুকবে? ভেতরে যা বাতাস আছে তা এইটুকু সময়ের জন্য যথেষ্ট তো? মনে পড়ল, নিশীথ বলেছিল, মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, যন্ত্র করে না। না করলেই ভালো।
কিন্তু নিশীথ হঠাৎ উধাও হল কোথায়? ও কি বাড়িতে ফিরে এসেছে? হয়তো সেই বন্ধু ওকে ছাড়তে চায়নি। আর দেরি হওয়ায় নিশীথ ভেবেছে, সারিকা নিশ্চয়ই বাড়ি চলে গেছে।
হঠাৎই খুব গরম মনে হল এলিভেটরের আবহাওয়া। সারিকা গা থেকে কোটটা খুলে হাতে নিল। চোখ বোলাল এলিভেটরের চারপাশে। যদি মাঝপথেই আচমকা এই যন্ত্রযান বন্ধ হয়ে যায়! একটা অদ্ভুত আতঙ্ক ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে চাইল।
অবশেষে লিফট যখন ছতলায় এসে থামল, তখন স্বস্তির একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল সারিকার বুক ঠেলে। লিফটের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল। বাইরের করিডরে এসে দাঁড়াল ও। এগিয়ে চলল নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজা লক্ষ্য করে। তারপর দরজার কলিংবেল টিপল।
এ-বাড়িতে প্রতি তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট। ডানদিকের ফ্ল্যাটে থাকেন এক মহিলা। নাম জারিন আগরওয়াল। একটা নামকরা গারমেন্ট কোম্পানির ডিজাইনার। সারিকার সঙ্গে ওর আলাপ মোটামুটি পুরোনোই বলা চলে।
নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোনোর সময় সারিকা লক্ষ করল জারিনের দরজার নীচ দিয়ে আলোর রেশ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, জারিন ফ্ল্যাটেই আছে।
দরজা খুলে দিল মা। মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল সারিকা। মা দরজা আবার বন্ধ করে দিল।
কী রে, ফিরতে এত দেরি হল! মা উদ্বেগের গলায় জিগ্যেস করল।
সারিকা বসবার ঘরের টেবিলের ওপরে পলিথিনের ব্যাগটা রাখল।
মাকে কি সব কথা বলা যায়? বলা যায়, নিশীথ কীরকম আশ্চর্যভাবে উধাও হয়ে গেল!
উঁহু, বললে পরে মা অনর্থক দুশ্চিন্তা করবে। রাতে হয়তো ঘুমোতেই পারবে না।
তাই ও পলিথিনের ব্যাগের জিনিসগুলো একে একে বের করে টেবিলে রাখল, বলল, এসব কেনাকাটা করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল। দ্যাখো, এই টুপিটা সম্রাটের–ও কোথায়?
ভেতরের ঘরে–পড়ছে–দিদিমণি এসেছে?
তুমি এগুলো পিসিমাদের দেখাও। আমি জামাকাপড় ছেড়ে নিই। সম্রাটের পড়া হয়ে গেলে ওকে টুপিটা দেব।
সারিকা ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াল। যেতে-যেতে শুনতে পেল রান্নার শব্দ। রান্নাঘরে পিসিমা রান্না করছেন।
পিসেমশাইয়ের শোওয়ার ঘরটায় উঁকি মারল সারিকা। পিসেমশাই বিছানায় জমিদারি কায়দায় আধশোওয়া হয়ে রেডিয়োতে খবর শুনছেন।
সারিকাকে দেখে হেসে বললেন, কী, গোটা নিউ মার্কেটটা কেনা হল?
হ্যাঁ–প্রায় সেইরকমই, হেসে বলল সারিকা, ক্রিসমাসের জন্যে যা ভিড়!
মাকে নিয়ে সারিকা যে-ঘরটায় শোয় সেটা একেবারে কোনার দিকে। তার পাশের ঘরটায় সম্রাট পড়তে বসেছে। দিদিমণি ওকে পড়াচ্ছে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়ে গেলেও সম্রাটের ছুটি মেলেনি। অঙ্কে ও ভীষণ কঁচা। এখন পিসিমার হুকুমে তারই মেরামতি চলছে।
সম্রাটের পড়ার ঘরের দিকে একপলক চোখ বুলিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়ল সারিকা।
তাড়াতাড়ি জামাকাপড় ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাছে গিয়ে বসে পড়ল ও।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল সারিকা। লক্ষ্য গলার চুনিটা। এটা মাকে দেখাতে ও ভুলে গেছে।
